
আমেরিকার সঙ্গে টানটান উত্তেজনার আবহেই ইরানকে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর। ‘ইরানকে এমন মারব যে কল্পনাও করতে পারবে না।’ সরাসরি ইরানের সুপ্রিম লিডার খামেনেইকে সতর্ক করলেন নেতানিয়াহু। ইজরায়েলি সংসদে ‘নেসেট’-এ দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ইরানে খামেনেই-বিরোধী আন্দোলনের উপর প্রতি মুহূর্তে নজর রাখছে তেল অভিভ।’ এদিকে, ইরানি সশস্ত্র সেনা বা IRGC ও পুলিশের মদতে কড়া হাতে আন্দোলনকারীদের দমনের চেষ্টা চালাচ্ছে তেহরান। তাদের হুঁশিয়ারি, ‘দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে আমেরিকা বা ইজরায়েল হস্তক্ষেপ করলে ফল ভুগতে হবে।’ পাল্টা নেতানিয়াহু এদিন বলেছেন, ‘ইরান যদি একটাও ভুল পদক্ষেপ করে, তাহলে ইজরায়েল সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে। এমন মারব যে ইরান কোনওদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।’
তেহরানে সরকার উল্টানো বা ‘তখ্তাপলট’ এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা বলেও মনে করেন নেতানিয়াহু। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সেকথা স্বীকার করে বলেন, ইরান যেদিকে এগোচ্ছে, আর পিছন ফিরে কোনওদিনও তাকাবে না। তাঁর কথাতেই স্পষ্ট, খামেনেই ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের হাত থেকে ক্ষমতার রাশ যে ক্রমশ আলগা হচ্ছে, তা দেখে ইজরায়েল মহাখুশি। ওদিকে, আমেরিকায় বেজায় খাপ্পা এখন ইরানের উপর। ট্রাম্প তো ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনেইকে নিকেশের ছক-ও প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। ইরানে মার্কিন সেনার অভিযান এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা। পেন্টাগনকে ইতিমধ্যেই ট্রাম্প বলে দিয়েছেন, ইরানে অভিযান চালালে এমন নিখুঁতভাবে চালাতে হবে, যাতে যুদ্ধ বেশিদিন না টানতে হয়। দ্রুত, নির্ভুল অভিযান চালাতে মার্কিন সেনাও তৈরি, সেকথা জানানো হয়েছে ট্রাম্পকে।
ট্রাম্পের নির্দেশ পেয়েই আমেরিকার পরমাণু জ্বালানি চালিত ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন রণতরী মধ্যপ্রাচ্যে রওনা দিয়েছে। ইরানের সরকার আর একজন আন্দোলনকারীকে গুলি করলে বা একজনকেও ফাঁসি দিলে খামেনেই-কে তার উপযুক্ত মূল্য চোকাতে হবে বলেও শুনিয়ে রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ইরানে ইতিমধ্যেই ৪০০০-এরও বেশি সরকারি-বিরোধী আন্দোলনকারীকে মেরে-পুড়িয়ে-গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে খামেনেই-এর বিশেষ সেনা। যদিও বেসরকারি মতে, নিহতের সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি। গ্রেফতার করে ইরানের বিভিন্ন কুখ্যাত জেলে ঢোকানো হয়েছে প্রায় ২৬ হাজার বিক্ষোভকারীকে। পাল্টা আন্দোলনকারীদের হাতে ২০০-র উপরে পুলিশ ও সেনার মৃত্যু হয়েছে বলে ইরানি রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার দাবি। আন্দোলন দমাতে, ২৮০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট ও টেলিফোন লাইন সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে রেখেছে সরকার। ইরানি হাসপাতালগুলিতে মৃতদেহে উপচে পড়ছে বলে ভিডিও ছড়িয়েছে সমাজমাধ্যমে। আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনেক মহিলা সে দেশের সুপ্রিম লিডার খামেনেইয়ের ছবিতে আগুন ধরাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে দাভোসে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক সামিটে যোগ দিচ্ছে না ইরান।
ইরানে সরকারি-বিরোধী আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প বলেছেন, প্রত্যেক ইরানি নাগরিক যেন নিজেদের এলাকার দখল নেন। তাঁদের জন্য সাহায্য দ্রুতই আসবে, আমেরিকা পাঠাবে। কী সাহায্য় পাঠাবেন ট্রাম্প? সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই দক্ষিণ চিন সাগর থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে মালাক্কা প্রণালী ধরে এগোচ্ছে একাধিক বড় মার্কিন রণতরী। ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের মতো বড় রণতরী ছাড়াও ইউএসএস ফ্র্যাঙ্ক পিটারসন, ইউএসএস মাইকেল মারফি-র মতো বার্ক ক্লাস গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার-ও মধ্য প্রাচ্যের দিকে এগোচ্ছে। ইরানের কাছেই রয়েছে জলের নিচ থেকে টোমাহক মিসাইল ছুড়তে পারে এমন অন্তত একটি মার্কিন সাবমেরিন। কাতারে আল উদেইদ মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে ‘প্যাট্রিয়ট’ ও ‘থাড’ মিসাইল ডিফেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রস্তুত ইরানের ড্রোনকে নাস্তানাবুদ করতে ‘ঈগল’ অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেমও।
তবে শুধু ট্রাম্প না, নেতানিয়াহু-ও জানেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ খুব সহজ হবে না। কারণ, চিনও নাকি এই পরিস্থিতিতে সেনা, অত্যাধুনিক অস্ত্র বোঝাই অন্তত ১৬টি কার্গো এয়ারক্রাফট গত তিনদিনে ইরানে পাঠিয়েছে। ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইলের জন্য জরুরি রাসায়নিক সোডিয়াম পারক্লোরেট এত পরিমাণে পাঠানো হয়েছে যাতে ৫০০টি মিসাইলে জ্বালানি ভরা যাবে। হজ কাসিম ও খাইবার শেকানের মতো মিসাইলের জন্যও জরুরি রাসায়নিক পাঠানো হয়েছে প্রায় ১০০০ টন। ১৫ জানুয়ারি থেকে চিনের গুয়াংজু ও শেনজেন থেকে তেহরানের এয়ারস্পেসে ‘মহান এয়ার’-এর বিমান ওঠানামা দ্বিগুণ হয়েছে। এই বিমান সংস্থার সঙ্গে ইরানের সেনার বিশেষ সমঝোতা রয়েছে অনেকদিন ধরেই। অন্যদিকে, ইরানি মিডিয়ার দাবি, রাশিয়ার সাহায্য ও অনুমতিতে তেহরান তাদের প্রথম ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইলের সফল পরীক্ষা করে ফেলেছে। মিসাইলের পাল্লা তেহরান থেকে রাশিয়ার সাইবেরিয়া পর্যন্ত। খামেনেইকে লাগাতার যেভাবে মৌখিক আক্রমণ করে চলেছেন ট্রাম্প, এই মিসাইল পরীক্ষা তারই জবাব বলে দাবি ইরানের। সবমিলিয়ে মধ্য প্রাচ্যের আকাশে এখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো মেঘ আরও ঘন হচ্ছে ক্রমশ।