রাজকীয় ওয়েব সিরিজ ‘জ্যাজ সিটি’ থেকে চোখের পলক সরানো যায় না!
এই যুগে যা পরম সত্যি, অতীতেও তাই ছিল। দশক ছুঁয়ে দশক পিছিয়ে যেতে হবে। নজর রাখতে হবে ১৯৭১-এ। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সময়টায়। ১৯৭১-এর এই মুক্তিযুদ্ধের পাঠ অল্প-বিস্তর আমাদের সকলেরই আছে। তবে ঠিক কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল, তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারেননি আজও অনেকে। পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে তাক লাগিয়ে দেওয়া ওয়েব সিরিজের নাম 'জ্যাজ সিটি'।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের আবহাওয়া। বিদেশে অস্ত্রের বর্ষণ, এই মুহূর্তে কোথাও বাংলায় অশান্তি বয়ে আনছে। আসলে মানুষের আমরা-ওরা হয় না। পৃথিবীতে এক প্রান্তের মানুষ কাঁদলে, অন্য প্রান্তের মানুষের মুখের উজ্জ্বল হাসি, সামান্য হলেও ম্লান হয়ে যায়।
এই যুগে যা পরম সত্যি, অতীতেও তাই ছিল। দশক ছুঁয়ে দশক পিছিয়ে যেতে হবে। নজর রাখতে হবে ১৯৭১-এ। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের সময়টায়। ১৯৭১-এর এই মুক্তিযুদ্ধের পাঠ অল্প-বিস্তর আমাদের সকলেরই আছে। তবে ঠিক কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল, তার মধ্যে প্রবেশ করতে পারেননি আজও অনেকে। পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে তাক লাগিয়ে দেওয়া ওয়েব সিরিজের নাম ‘জ্যাজ সিটি’।
এই ওয়েব সিরিজের কেন্দ্রে জিমি রায়। মনের মধ্যে তোলপাড় ফেলে দেওয়া এক চরিত্র। সাহেব পাড়ার এক জ্যাজ ক্লাবের দায়িত্ব তার কাছে। জিমি সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শীলা। এই দুই চরিত্রের চলনের পথে শহরের সঙ্গীত, কোলাহল সবটুকু মিশে যায়। প্রেম হয় নাকি ভেঙে যায়, সে স্পয়লার দেওয়া যাবে না। এটুকু বলতে পারি, তাদের প্রেমের পরিণতি দর্শকও খুঁজতে শুরু করবেন একটা সময়ে। তাদের মতো আমি বা আপনি ডুবে যেতে পারি, জিমি-শীলার প্রেমে।
‘দিল সে’ ছবির শাহরুখ খান-মণীষা কৈরালার হাত ধরে দৌড়ের কথা সিনেমাপ্রেমীরা আজও ভোলেননি। তারা রয়েছেন প্রেমে। অথচ রাস্তায় আগুন। দু’ জনে হাত ধরে ছুটছেন। প্রেমে পুড়ছেন নাকি তাদের প্রেম পুড়ছে, সেই উত্তর আজও খোঁজে দর্শক। জ্যাজ ক্লাবে জিমি আর শীলার রসায়ন অনেকটা সেরকম। তাদের ঘিরে বহু চরিত্র। এক সুড়ঙ্গ তৈরির গল্প রয়েছে। সব কিছুর শুরু হয়তো প্রেমে। তারপর উত্থান রাজনীতির ময়দানে।
ভারত-বাংলাদেশের যোগসূত্র কীভাবে হয়ে ওঠে এই শহরের এক জ্যাজ ক্লাব, কীভাবে বিভিন্ন চরিত্রের কেউ ছটফট করে, কেউ ঠিক করে, কেউ ভুল করে, কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কাছে হার শিকার করে, তা নিয়েই এই ওয়েব সিরিজ। স্টুডিয়ো নাইন-এর হেঁশেলে তৈরি এই ওয়েব সিরিজের স্রষ্টা সৌমিক সেন। এর আগে জাতীয় স্তরে চর্চিত ওয়েব সিরিজ ‘জুবিলি’-র কলম ছিল তাঁর। তবে এই ওয়েব সিরিজ দেখার পর বলা যায়, সৌমিকের সেরা কাজ এটাই।
বাংলায় তৈরি এই ওয়েব সিরিজকে শুধু বাংলা ওয়েব সিরিজ বলা সম্ভব নয়। এটি জাতীয় স্তরের কাজ। যদি ভাষার কথা ওঠে, হিন্দি-ইংরাজির মিশেল রয়েছে। ভাষা যে পরিধি গড়তে পারে না, সেটা হয়তো মজ্জাগত করে দেবে এই ওয়েব সিরিজ। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, নির্মাণ পর্বে বাঙালি কাস্ট আর ক্রুদের ভূমিকা অগ্রণী। তাই বাঙালির গর্বের কারণ হবে এই ওয়েব সিরিজ। গল্প, চিত্রনাট্য, চিত্রগ্রহণ, কস্টিউম ডিজাইনে যেসব খুঁটিনাটি তুলে ধরা হয়েছে, তাতে বোঝা যায়, কতটা যত্ন করে তৈরি করা হয়েছে এটি।
সৌমিক সব অভিনেতাকেই তাঁদের জীবনের অন্যতম সেরা চরিত্র উপহার দিয়েছেন। আরিফিন শুভকে তাঁর অনুরাগীরা এই চরিত্রটি করার জন্য আজীবন মনে রাখবেন। সৌরসেনী মৈত্র বাংলা এবং হিন্দি প্রজেক্টে বহু চরিত্র করেছেন। তবে শীলাই তাঁর জীবনের সেরা পারফরম্যান্স। এমন চরিত্র এর আগে সত্যিই তাঁর কাছে আসেনি! অনিরুদ্ধ গুপ্ত, শ্রেয়া ভট্টাচার্য, তানিকা বসু, আলেকজান্দ্রা টেলর, শান্তনু ঘটক সকলের চরিত্রেই বিভিন্ন স্তর, তাঁদের তুলে ধরা টানাপোড়েনগুলো দর্শকের মধ্যে শিহরণ তৈরি করে। শতাফ ফিগারের অভিনয় নজরকাড়া।
শুধু প্রেক্ষাপটের জন্য এই ওয়েব সিরিজ চুম্বক হতে পারে, তা নয়। প্রতিটি পর্বের থ্রিলার এলিমেন্ট দর্শককে মাতিয়ে দেয়। মানুষের ধৈর্য্য কমছে। এক মিনিটের রিলে ভেসে যাচ্ছে জীবন। সেখানে এই ওয়েব সিরিজের এক-একটি পর্ব দেখতে ৪৫ মিনিটের বেশি সময় দিতে হয়। এবং নিশ্চিত করে বলতে পারি, চোখের পলক ফেলার উপায় নেই। সৌমিক নিজেই বলেছিলেন, একটা কাজ করতে তাঁর তুলনায় বেশি সময় লাগে। তিনি ম্যাগি বানাতে পারেন না, বিরিয়ানি তৈরিতে বিশ্বাস করেন।
এই ওয়েব সিরিজও ম্যাগি নয়। বিরিয়ানির মতো রাজকীয়। বাংলায় তৈরি এমন এক ওয়েব সিরিজ আসলে স্টেটমেন্ট। যা শুধু দেখার নয়, দেখার পর ভাবনার সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার। হারিয়ে যাওয়া জীবনবোধ ফিরিয়ে দিতে সক্ষম।
