AQI
Sign In

By signing in or creating an account, you agree with Associated Broadcasting Company's Terms & Conditions and Privacy Policy.

চিরতরে থামল শংকরের কলম, ‘জন অরণ্য’ ছেড়ে ‘কত অজানারে’র দেশে পাড়ি দিলেন ‘চৌরঙ্গী’র পথিক

সেই সময় তিনি ব্যারিস্টার নোয়েল বারওয়েলের ক্লার্ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই বারওয়েল সাহেবই ছিলেন শঙ্করের জীবনের প্রথম 'আইকন'। তাঁর প্রয়াণের পর শঙ্কর কলম ধরেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’ লিখতে। আর সেই প্রথম লেখাতেই বাঙালির ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নেন তিনি।

চিরতরে থামল শংকরের কলম, 'জন অরণ্য' ছেড়ে ‘কত অজানারে’র দেশে পাড়ি দিলেন ‘চৌরঙ্গী’র পথিক
| Updated on: Feb 20, 2026 | 2:50 PM
Share

তিনি একাই এক শহর, একাই এক চলমান ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম ও প্রভাবশালী লেখকদের একজন মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় ওরফে শংকর। জীবনের শেষ জীবন পর্যন্ত যাঁর কলম ঝড় তুলেছিল বাঙালি মননে, তবে শুক্রবার থামল সেই ঝড়। বাঙালি হারালেন তাঁর অন্যতম প্রিয় লেখক শংকরকে। মৃত্যকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩।

শঙ্করের সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছিল কোনও আকাশকুসুম কল্পনা থেকে নয়, বরং রূঢ় বাস্তবের মাটি থেকে। হাওড়ার এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই তরুণ একসময় কলকাতার রাজপথে ঘুরেছেন কাজের খোঁজে। সেই সময় তিনি ব্যারিস্টার নোয়েল বারওয়েলের ক্লার্ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেই বারওয়েল সাহেবই ছিলেন শঙ্করের জীবনের প্রথম ‘আইকন’। তাঁর প্রয়াণের পর শঙ্কর কলম ধরেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’ লিখতে। আর সেই প্রথম লেখাতেই বাঙালির ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নেন তিনি।

বাঙালি পাঠকের কাছে শংকর মানেই এক অদ্ভুত জাদুর পৃথিবী। তাঁর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘চৌরঙ্গী’ কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি একটি যুগসন্ধিক্ষণের দলিল। গ্র্যান্ড হোটেলের আদলে গড়া ‘শাহজাহান হোটেল’ এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাটা বোস, মার্কো পোলো বা করবী গুহর মতো চরিত্রগুলো আজও বাঙালির রক্তে মিশে রয়েছে। এই উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ছবি এবং থিয়েটার আজও সমান জনপ্রিয়।

শঙ্করের বাস্তবধর্মী ও তীক্ষ্ণ লেখনি মুগ্ধ করেছিল সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশ্ববিখ্যাত পরিচালককেও। তাঁর অমর দুই সৃষ্টি ‘সীমাবদ্ধ’ এবং ‘জনঅরণ্য’কে সেলুলয়েডে বন্দি করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। মধ্যবিত্তের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নৈতিক অবক্ষয় এবং কর্পোরেট জগতের লড়াইকে শঙ্কর যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা ভারতীয় সাহিত্যে বিরল। ‘মুক্তির স্বাদ’, ‘চরণ ছুঁয়ে যাই’, ‘তিন ভুবনের কথা’, ‘সীমাবদ্ধ’ তাঁর অনন্য সৃষ্টি।  কেবল গল্প-উপন্যাস নয়, শঙ্কর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন বিশিষ্ট গবেষক হিসেবেও। স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে তাঁর লেখা ‘অচেনা অজানা বিবেকানন্দ’ বা ‘আমি বিবেকানন্দ বলছি’ গ্রন্থগুলো পাঠককে এক রক্ত-মাংসের স্বামীজির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। বিবেকানন্দের খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে তাঁর মানবিক দিকগুলো শঙ্কর অত্যন্ত নিপুণভাবে সাধারণের সামনে এনেছেন।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি যেমন লক্ষ লক্ষ পাঠকের ভালোবাসা পেয়েছেন, তেমনই পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মানও। ‘একা একা একাশি’র জন্য  তিনি পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। এছাড়াও বঙ্গবিভূষণ থেকে শুরু করে অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। একসময় পশ্চিমবঙ্গের শেরিফ পদেও আসীন ছিলেন এই গুণী ব্যক্তিত্ব। আশি বা নব্বইয়ের দশক ছাড়িয়ে আজকের ডিজিটাল যুগেও শঙ্কর একইভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর লেখনির সহজ গদ্য এবং চরিত্রের গভীরতা বাংলা সাহিত্যের সম্পদ হয়ে থাকবে।