
সাতচল্লিশে স্বাধীনতা, তার ঠিক ৫ বছরের মাথায় ১৯৫১ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচন ছিল আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম সাহসী এক পদক্ষেপ। কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া, বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, বিপুল সংখ্যক নিরক্ষর জনসমষ্টিকে নিয়ে এই নির্বাচন পরিচালনা করা ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। আর তাই করে দেখিয়েছিলেন ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন।

১৯৫১ সালে যখন প্রথম নির্বাচন হয়, ভারত তখনই ঠিক করেছিল যে ধনী-গরিব বা পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে ২১ বছরের উপরের সবাই ভোট দিতে পারবেন। একে বলা হয় 'সর্বজনীন ভোটাধিকার'।

আমেরিকার মতো উন্নত দেশেও নারীদের ভোটের অধিকার পেতে অনেক লড়াই করতে হয়েছিল। কিন্তু ভারত স্বাধীনতার পর প্রথম দিন থেকেই নারীদের এই সমান অধিকার দিয়েছিল। শুরুতে ভোট দেওয়ার বয়স ছিল ২১ বছর। ১৯৮৯ সালে আইন বদলে সেটি কমিয়ে ১৮ বছর করা হয়।

প্রথম ভোটের মাস্টারমাইন্ড হিসাবে বারবারই উঠে আসে সুকুমার সেনের নাম। ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনার ছিলেন তিনিই। কোনও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে এই বিশাল দেশের ভোট সামলেছিলেন, তা আজও বিস্ময়কর।

সেই সময়ে দেশে অনেক মানুষ পড়তে বা লিখতে জানতেন না। তাদের সুবিধার জন্য দলগুলোকে আলাদা আলাদা ‘চিহ্ন’ বা প্রতীক দেওয়া হয়, যাতে ছবি দেখে তারা ভোট দিতে পারেন।

কেউ যাতে দুবার ভোট দিতে না পারে, সেজন্য আঙুলে যে নীল কালি লাগানো হয়, তার ফর্মুলা আজও টপ-সিক্রেট বা গোপন রাখা হয়েছে।

মুম্বইয়ের একটি কারখানায় ভারতের প্রথম ব্যালট বাক্স তৈরি হয়েছিল। তখন একটি বাক্স তৈরি করতে খরচ হয়েছিল মাত্র ৫ টাকা। দেশের দুর্গম এলাকাগুলোতে ভোটের বাক্স পৌঁছাতে ট্রেন বা গাড়ির পাশাপাশি উট এবং হাতিও ব্যবহার করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল—দেশের শেষ মানুষটির কাছেও যেন গণতন্ত্রের স্বাদ পৌঁছে যায়।

অশিক্ষা আর যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব সত্ত্বেও ভারত বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, মানুষের ইচ্ছাশক্তি থাকলে গণতন্ত্র সফল করা সম্ভব। ভারতের সেই প্রথম নির্বাচন বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। আজও ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থাকে সারা পৃথিবী সম্মান করে।

সহজ কথায় বলতে গেলে, ভারতের প্রথম নির্বাচন ছিল এক অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। ধর্ম, বর্ণ বা ভাষা যা-ই হোক না কেন, দেশের প্রতিটি মানুষের দেশের গণতন্ত্রে মতামতের যে দাম আছে—ভারত তা প্রথম দিন থেকেই প্রমাণ করে দিয়েছিল।