AQI
Sign In

By signing in or creating an account, you agree with Associated Broadcasting Company's Terms & Conditions and Privacy Policy.

Maharashtra & Sikhism: মহারাষ্ট্রে লুকিয়ে রয়েছে শিখ ধর্মের শিকড়, কীভাবে তৈরি হল সেবার ধর্ম, জানুন ইতিহাস

Hazur Sahib Nanded: লঙ্গর প্রথা মহারাষ্ট্রে সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন। গুরুদ্বারায় সকল শ্রেণির মানুষ একসঙ্গে মাটিতে বসে আহার করেন। এই প্রথা অহংকার ও সামাজিক স্তরভেদ বিলীন হয়ে যায়। নান্দেদের হাজুর সাহিবে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ লঙ্গরে ভোজন করেন।

Maharashtra & Sikhism: মহারাষ্ট্রে লুকিয়ে রয়েছে শিখ ধর্মের শিকড়, কীভাবে তৈরি হল সেবার ধর্ম, জানুন ইতিহাস
ফাইল চিত্রImage Credit: PTI
| Updated on: Jan 25, 2026 | 10:12 AM
Share

মুম্বই: শিখ ধর্মের সঙ্গে মহারাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেক গভীর। এক দীর্ঘ এক ইতিহাস রয়েছে। নান্দেদে শ্রী গুরু গোবিন্দ সিং জি এসেছিলেন। এখান থেকেই গুরু গোবিন্দজি গুরু গ্রন্থ সাহিবকে শিখদের ধর্মীয় গ্রন্থ হিসাবে ঘোষণা করেন।  খালসার পাঁচটি তখতের মধ্যে অন্য়তম হন তিনি, যা হাজুর সাহিব নামে পরিচিত। তবে এই ইতিহাসের বীজ রোপিত হয়েছিল বহু শতাব্দী আগেই, মহারাষ্ট্রের সাধু-সন্তদের সঙ্গে শিখ গুরুদের আধ্যাত্মিক সংলাপের মাধ্যমে।

সন্ত নামদেব: পঞ্জাবে ভক্তির বীজ রোপণ

মহারাষ্ট্র ও পঞ্জাবকে সংযুক্ত করা প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী সেতু হলেন সন্ত নামদেব। ত্রয়োদশ শতকে, যখন যাতায়াত ও যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত কঠিন, তখন সন্ত নামদেব মহারাষ্ট্র থেকে পঞ্জাব পর্যন্ত ভক্তি আন্দোলনের পতাকা বহন করে নিয়ে যান। তিনি জীবনের প্রায় শেষ ২০ বছর পঞ্জাবের ঘুমান গ্রামে কাটান, স্থানীয় ভাষা শিখে ভক্তি ও সমতার বার্তা প্রচার করেন।

তাঁর আধ্যাত্মিক মহত্ত্ব গ্রহণ করে পঞ্চম শিখ গুরু, গুরু অর্জন দেব জি গুরু গ্রন্থ সাহিবে সন্ত নামদেবের ৬১টি পদ সংযোজন করেন। আজও পঞ্জাবে সন্ত নামদেব ‘ভগত নামদেব’ নামে ততটাই শ্রদ্ধেয়, যতটা তিনি মহারাষ্ট্রে সম্মান পান। ভক্তির উপর ভিত্তি করে তাঁর শিক্ষা পরবর্তীকালে শিখ দর্শনের এক মৌলিক স্তম্ভে পরিণত হয়।

গুরু হরগোবিন্দ সিং ও সন্ত সমর্থ রামদাসের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ-

শিখ ও মহারাষ্ট্রের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল ষষ্ঠ শিখ গুরু, গুরু হরগোবিন্দ সিং জি এবং সন্ত সমর্থ রামদাস স্বামীর সাক্ষাৎ, যা কাশ্মীরের শ্রীনগরে সংঘটিত হয়েছিল। এই সাক্ষাৎ ‘ভক্তি’ ও ‘শক্তি’-র এক অপূর্ব সমন্বয়ের প্রতীক।

গুরু হরগোবিন্দজি-কে ঘোড়ায় চড়ে, মিরি ও পিরি নামে দুই তলোয়ার ধারণ করতে দেখে সন্ত রামদাস স্বামী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, একজন সাধু কেন অস্ত্র বহন করেছেন? উত্তরে গুরু হরগোবিন্দ জি বলেন, অন্তরে তিনি গুরু নানকের বিনয়ী সেবক ও সাধু। অস্ত্র ধারণের উদ্দেশ্য হল দুর্বলের রক্ষা এবং অত্যাচারীদের বিনাশ। এই উত্তর সন্ত রামদাস স্বামীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং তিনি উপলব্ধি করেন যে শুধু প্রার্থনায় বিশ্বাস টিকে থাকে না; সুরক্ষার জন্য শক্তিও প্রয়োজন।

হাজুর সাহিব, নান্দেদ:

গুরু গোবিন্দ সিংজির নান্দেদে আগমন এই পবিত্র বন্ধনের চূড়ান্ত শিখর ছিল। এখানেই তিনি মানব গুরুদের ধারার অবসান ঘটিয়ে গুরু গ্রন্থ সাহিবকে গুরুত্ব প্রদান করেন। এর ফলে নান্দেদ শুধু শিখদের জন্যই নয়, মহারাষ্ট্রের একতা ও আধ্যাত্মিক সম্প্রীতির ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হয়।

মহারাষ্ট্রের শিখ সমাজের অন্যতম স্বতন্ত্র অংশ হল ‘দক্ষিণী’ শিখরা। তাঁদের ইতিহাস ১৭০৮ সালে গুরু গোবিন্দ সিং জির দক্ষিণ অভিযানের মাধ্যমে শুরু হয়। গুরু গোবিন্দজির সঙ্গে আসা সৈনিক ও কারিগরদের বংশধররা পরবর্তীকালে দক্ষিণে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

শিকলগড় সম্প্রদায়: ঐতিহ্যগতভাবে এরা দক্ষ অস্ত্রনির্মাতা, যারা শিখ বাহিনীর সামরিক প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।

বানজারা ও লোভানা সম্প্রদায়: ষোড়শ শতাব্দী থেকেই এই বণিক সম্প্রদায়গুলি শিখ আন্দোলনকে রসদ ও সরবরাহ দিয়ে সহায়তা করে আসছে।

সাংস্কৃতিক সমন্বয়: শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দক্ষিণী শিখরা মারাঠি ভাষা ও স্থানীয় রীতিনীতি গ্রহণ করেন, তবু শিখ গুরুদের প্রতি তাঁদের অটল ভক্তি অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

মহারাষ্ট্রে শিখ সমাজের আরেকটি অংশ হল পঞ্জাবী শিখরা, যারা দেশভাগের পর অথবা বর্তমান সময়ে ব্যবসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে এখানে বসতি স্থাপন করেছেন। এই গোষ্ঠীতে প্রধানত খত্রি, জাট, অরোরা ও মোহিয়াল শিখরা অন্তর্ভুক্ত, যাঁদের পঞ্জাবী ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

গুরু গ্রন্থ সাহিবের বাণী

শিখ ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হল একতা ও সমতা। গুরু নানক দে জি থেকে গুরু গোবিন্দ সিং জি পর্যন্ত সকল গুরুই জাত, ধর্ম বা সম্পদের ভিত্তিতে বৈষম্যের বিরোধিতা করেছেন। গুরু গ্রন্থ সাহিব সর্বজনীন সমতার দর্শন তুলে ধরে, যা মহারাষ্ট্রের বৈচিত্র্যময় শিখ সমাজকে একসূত্রে বাঁধে। ‘এক ওঙ্কার’ অর্থাৎ ঈশ্বর এক—এই বিশ্বাস সকল শিখকে ঐক্যবদ্ধ করে। পঞ্জাবী হোক বা দক্ষিণী, প্রতিটি শিখ দশ গুরুদের শিক্ষার সামনে মাথা নত করে।

লঙ্গর: সামাজিক সম্প্রীতির জীবন্ত দৃষ্টান্ত

লঙ্গর প্রথা মহারাষ্ট্রে সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন। গুরুদ্বারায় সকল শ্রেণির মানুষ একসঙ্গে মাটিতে বসে আহার করেন। এই প্রথা অহংকার ও সামাজিক স্তরভেদ বিলীন হয়ে যায়। নান্দেদের হাজুর সাহিবে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ লঙ্গরে ভোজন করেন।

আজও মহারাষ্ট্রে শিখ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সমতার শিক্ষাকে অনুসরণ করে সামাজিক সংহতির জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করা হয়। বিশেষভাবে শিকলগড় ও বনজারা শিখদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তাঁদের মূলধারার গুরুদ্বারার সঙ্গে সংযুক্ত করে সামাজিক ব্যবধান কমানোর প্রচেষ্টা চলছে।

মহারাষ্ট্রে শিখ ধর্ম আধ্যাত্মিক ও সামাজিক ঐক্যের এক শক্তিশালী উদাহরণ। গুরু গ্রন্থ সাহিবের পথনির্দেশে শিখ সমাজ তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখেই সমতার আলোয় এগিয়ে চলেছে। দক্ষিণী ও পঞ্জাবী শিখরা ভিন্ন ধারার হলেও, তারা ভক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের একই মহাসাগরে মিলিত হয়েছে। মহারাষ্ট্র ও শিখ ধর্মের এই চিরস্থায়ী বন্ধন আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।