Assam: বাস্তবের বজরঙ্গী ভাইজান! ৪০০-রও বেশি মানুষকে জীবন ফেরালেন এই নৌকাচালক
Assam Human Interest Story: বজরঙ্গি এই একাকী লড়াই দেখে তাঁর সাথে পরবর্তীতে যোগ দেন ২৫ বছর বয়সী স্থানীয় নির্মাণ সামগ্রী ব্যবসায়ী শ্রবণ প্রসাদ, এবং রবি প্রসাদ সহ আরও বেশ কিছু স্থানীয় মাঝি। তাঁরা আরও ৫টি ডিঙি নৌকা নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন। সব মিলিয়ে মোট ৬টি ডিঙি নৌকা নিয়ে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান।

অসম: এবার সিনেমার গল্পকেও হার মানাল বাস্তব জীবনের এক অসম সাহসী লড়াই।অসমের এক প্রত্যন্ত গ্রামে এক সাধারণ গরিব ডিঙি নৌকার মাঝি আজ সাধারণ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছেন সাক্ষাৎ ঈশ্বরের দূত, বাস্তবের ‘অসমে বজরঙ্গি ভাই’।
বজরঙ্গি রাজভর নামের এই অসম সাহসী মাঝির বাড়ি অসমের প্রত্যন্ত পাহাড় ঘেরা বিহুবর এলাকার নেপালি কুঠি গ্রামে। গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে উত্তাল দিখৌ নদী। এই নদীর ওপরেই নির্ভর করত বিহুবর এলাকার নেপালি কুঠি বজরঙ্গি জীবন-জীবিকা। নদীর জলে ভেসে আসা কাঠ কুড়ানো থেকে শুরু করে মাছ ধরা ও গবাদি পশু পালন ছিল তাঁর একমাত্র পেশা।
গত ১৯ জুলাই অন্যান্য দিনের মতোই নদীতে কাঠ কুড়াতে গিয়েছিলেন বজরঙ্গি। আচমকাই তিনি দেখেন নদীর জল বিপুল পরিমাণে বাড়ছে। বিপদ বুঝে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই, চোখের নিমেষে তাঁর পুরো গ্রাম জলের তলায় ডুবতে শুরু করে। চারিদিকে ১৪-১৫ ফুট উচ্চতার জলের তীব্র স্রোত। পলকের মধ্যে গৃহহীন হয়ে পড়েন হাজার হাজার মানুষ। প্রাণ বাঁচাতে নিরুপায় গ্রামবাসীরা নিজেদের ঘরের চালে এবং গাছের ডালে আশ্রয় নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। চারদিকে শুধু অসহায় মানুষের বাঁচার আকুল আর্তনাদ।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বজ্রঙ্গী তাঁর ছোট ডিঙি নৌকাটি নিয়ে নিজের বাড়িতে পৌঁছন। নিজের স্ত্রীকে ঘরের ভাঙা জানলার ওপর বসিয়ে রেখে, গ্রামবাসীদের সেই বুকফাটা আর্তনাদ শুনে আর স্থির থাকতে পারেননি তিনি। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে নৌকা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্ধারকাজে।
বিপর্যয় এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, উদ্ধারকাজে আসা এসডিআরএফ (SDRF) দল তখনও পৌঁছাতে পারেনি গ্রামে । যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি দল ব্যর্থ হলো, সেখানে ত্রাতা হয়ে উঠলেন এই সাধারণ মাঝি। প্রবল জলের স্রোতের মধ্যে নিজের জীবন কার্যত হাতের মুঠোয় নিয়ে ডিঙি নৌকা বেয়ে চললেন বজরঙ্গি।
ঘরের চালের ওপর ও গাছের ডালে বসে থাকা মহিলা, শিশু-সহ একাধিক মানুষকে একে একে উদ্ধার করেন তিনি। মৃত্যু যাদের থেকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে ছিল, তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনেন।
বজরঙ্গি এই একাকী লড়াই দেখে তাঁর সাথে পরবর্তীতে যোগ দেন ২৫ বছর বয়সী স্থানীয় নির্মাণ সামগ্রী ব্যবসায়ী শ্রবণ প্রসাদ, এবং রবি প্রসাদ সহ আরও বেশ কিছু স্থানীয় মাঝি। তাঁরা আরও ৫টি ডিঙি নৌকা নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন। সব মিলিয়ে মোট ৬টি ডিঙি নৌকা নিয়ে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব রুদ্ধশ্বাস উদ্ধার অভিযান।
প্রবল জলের স্রোতের মধ্যে নিজের জীবন কার্যত হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘরের চাল ও গাছের ডালে আটকে থাকা মহিলা ও শিশুসহ একা বজরঙ্গি প্রায় ৪০০-রও বেশি মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার করেন।
নিজেদের প্রাণ বাজি রেখে এই পুরো দলটি ৬টি ডিঙি নৌকা মিলে আশেপাশের মোট ৬টি গ্রাম থেকে প্রায় ১৫০০ – ২০০০জন মানুষকে সুরক্ষিতভাবে উদ্ধার করে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেন।
১৯ জুলাইয়ের সেই অভিশপ্ত দিনের আচমকা প্রলয়ঙ্কারী বন্যার মুখে দাঁড়িয়ে নিজের বুক চিতিয়ে লড়ে বিহুবরের ‘আসল নায়ক’ হয়ে উঠলেন বজরঙ্গি রাজভর এবং তাঁর সহযোদ্ধারা। সেই অভিশপ্ত দিনের কথা TV9 বাংলার ক্যামেরার সামনে বজরঙ্গি বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বললেন, “ যদি উদ্ধার কাজ শেষ করে আরও ১০ মিনিট দেরিতে বাড়ি ফিরতাম আমার স্ত্রীকে জীবিত দেখতে পেতাম না, স্ত্রী জলে ডুবে যেত,বাঁচবার জন্য ঘরের জানলাটা ধরে আমার স্ত্রী কাঁদছিল। এই সাধারণ মাঝি অসামান্য মানবিকতা ও সাহসিকতাকে আজ কুর্ণিশ জানাচ্ছে গোটা দেশ। অসমের বন্যায় ইতিমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে ৮৯ জনের।
