Sikhism: শিষ্যদের ফুটন্ত জলে সিদ্ধ করে, কখনও তুলোর ভিতর ঢুকিয়ে জ্যান্ত জ্বালিয়ে খুন করেছিলেন ঔরঙ্গজেবের সেনা, ধর্ম রক্ষায় গুরু তেগ বাহাদুরের ইতিহাস জানুন

এই আত্মত্যাগের বীজ বপন হয়েছিল আরও পঞ্চাশ বছর আগে। পঞ্চম গুরু গুরু অর্জন দেব জি-কে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গির গ্রেফতার করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন। অস্বীকার করায় তাঁকে নির্মমভাবে শহিদ করা হয়।

Sikhism: শিষ্যদের ফুটন্ত জলে সিদ্ধ করে, কখনও তুলোর ভিতর ঢুকিয়ে জ্যান্ত জ্বালিয়ে খুন করেছিলেন ঔরঙ্গজেবের সেনা, ধর্ম রক্ষায় গুরু তেগ বাহাদুরের ইতিহাস জানুন
তেগ বাহাদুরজিImage Credit source: Tv9 Bangla

Jan 25, 2026 | 11:16 AM

শিখধর্ম কেবল একটি আধ্যাত্মিক পথ নয়, এটি ন্যায়, সত্য ও ধর্মরক্ষার জন্য আত্মত্যাগের এক অনন্য ইতিহাস। গুরু নানক দেবজি ‘এক ওঙ্কার’ ও সমতার বীজ রোপণ করেছিলেন, তা যুগে যুগে শহিদদের রক্তে সঞ্জীবিত হয়েছে। এই মহান ত্যাগের ধারায় অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন নবম শিখ গুর। তাঁর নাম গুরু তেগ বাহাদুর জি, যিনি ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

গুরু তেগ বাহাদুর জির জন্ম ১৬২১ সালের ১ এপ্রিল অমৃতসরে। ষষ্ঠ গুরু গুরু হরগোবিন্দ জি-র ঘরে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁর আসল নাম ছিল ত্যাগ মাল। মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য তিনি ‘তেগ বাহাদুর’—অর্থাৎ তরবারির বীর—নামে পরিচিত হন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি প্রায় ২৬ বছর পঞ্জাবের বাকালা গ্রামে গভীর সাধনা ও ধ্যানে নিমগ্ন থাকেন। সেখান থেকেই তাঁর নাম হয় ‘বাবা বাকালা’।

১৬৬৪ সালে অষ্টম গুরু গুরু হরকৃষ্ণ জি ইঙ্গিত দেন যে তাঁর উত্তরসূরি বাকালাতেই মিলবে। এরপর গুরু তেগ বাহাদুর জি নবম গুরু হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারপর তিনি উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভ্রমণ করেব। এবং সত্য-করুণা-নিঃস্বার্থ সেবা ও নির্ভীকতার বার্তা ছড়িয়ে দেন সাধারণ মানুষের মধ্যে। তিনি আনন্দপুর সাহিব প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে খালসা পন্থের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তাঁর রচিত বহু শবদ আজও গুরু গ্রন্থ সাহিবে অন্তর্ভুক্ত। যা মানুষকে ভয়, অহংকার ও আসক্তি ত্যাগ করে ঈশ্বরের  কাছে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে।

‘হিন্দ দি চাদর’

সপ্তদশ শতকে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব যখন জোর করে ধর্মান্তরের নীতি গ্রহণ করেন। তখন একাধিক কাশ্মীরি পণ্ডিত এর শিকার হন। কাশী বিশ্বনাথের মতো বহু মন্দির ধ্বংস করা হয়, দেবমূর্তি ভাঙচুর চলে, এবং ধর্মান্তর অস্বীকারকারীদের উপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন।

এই অত্যাচারে বিপর্যস্ত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের একটি প্রতিনিধি দল গুরু তেগ বাহাদুর জির শরণাপন্ন হন। গুরুজি তাঁদের পরামর্শ দেন—ঔরঙ্গজেবকে জানাতে, “গুরু তেগ বাহাদুর যদি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে আমরাও করব।” এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতার ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন।
এর ফলস্বরূপ ১৬৭৫ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে দিল্লিতে আনা হয়। ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে তাঁর উপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। তাঁর চোখের সামনেই তিন অনুগত শিখ—ভাই মতি দাস, ভাই সতী দাস ও ভাই দয়ালা—ভয়াবহভাবে শহিদ হন। ভাই মতি দাসকে করাত দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করা হয়, ভাই দয়ালাকে ফুটন্ত জলে সিদ্ধ করা হয় এবং ভাই সতী দাসকে তুলোর ভেতর মুড়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

সব কিছু দেখেও গুরু তেগ বাহাদুর জি অবিচল থাকেন। অবশেষে ১৬৭৫ সালের ২৪ নভেম্বর দিল্লির চাঁদনি চকে তাঁর শিরচ্ছেদ করা হয়। তাঁর এই ত্যাগ কেবল শিখধর্মের জন্য নয়, সমগ্র ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। তাই তিনি ইতিহাসে ‘হিন্দ দি চাদর’ ভারতের ঢাল—নামে চিরস্মরণীয়। তাঁর শহিদিস্থলে আজ গড়ে উঠেছে ‘পবিত্র গুরুদ্বারা সিসগঞ্জ সাহিব’। এই ত্যাগ তাঁর পুত্র ও দশম গুরু গুরু গোবিন্দ সিং জিকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।

গুরু অর্জন দেব জি-র শহিদ

এই আত্মত্যাগের বীজ বপন হয়েছিল আরও পঞ্চাশ বছর আগে। পঞ্চম গুরু গুরু অর্জন দেব জি-কে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গির গ্রেফতার করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন। অস্বীকার করায় তাঁকে নির্মমভাবে শহিদ করা হয়। এই ঘটনার পর শিখ সমাজ আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। ষষ্ঠ গুরু, গুরু হরগোবিন্দ জি ‘মিরি ও পিরি’ নীতির মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ও পার্থিব শক্তির সমন্বয়ের কথা বলেন এবং শিখদের সামরিকভাবে সংগঠিত করেন। পরবর্তীতে গুরু গোবিন্দ সিং জি ১৬৯৯ সালে খালসা পন্থ প্রতিষ্ঠা করেন, অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য।

গুরু গোবিন্দ সিং জির পুত্রদের আত্মত্যাগ

গুরু গোবিন্দ সিং জির চার পুত্রই ধর্মরক্ষায় শহিদ হন। বড় দুই পুত্র—সাহিবজাদা অজিত সিং জি (১৮) ও সাহিবজাদা জুঝার সিং জি (১৪)—১৭০৪ সালের ডিসেম্বর মাসে চামকৌরের যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে শহিদ হন। ছোট দুই পুত্র—সাহিবজাদা জোরাওয়ার সিং জি ও সাহিবজাদা ফতেহ সিং জি—মাত্র ৬ ও ৯ বছর বয়সে সিরহিন্দে ২৬ ডিসেম্বর ১৭০৪ সালে ইটের দেওয়ালে জীবন্ত গাঁথা হয়ে শহিদ হন, কারণ তাঁরা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করেছিলেন। বিশ্ব ইতিহাসে তাঁদের এই ত্যাগ এক বিরল উদাহরণ।

বান্দা সিং বাহাদুর

গুরু গোবিন্দ সিং জি-র পর তাঁর শিষ্য বান্দা সিং বাহাদুর মুঘলদের বিরুদ্ধে শিখ বাহিনীকে নেতৃত্ব দেন। তিনি তাঁর চার বছরের পুত্রসহ গ্রেফতার হন এবং ধর্মান্তরে অস্বীকার করায় নির্মমভাবে নিহত হন। দেহ ক্ষতবিক্ষত হলেও বিশ্বাস থেকে তিনি সরে দাঁড়াননি। শিখ ইতিহাসের এই অবিচ্ছিন্ন আত্মত্যাগের ধারা প্রমাণ করে—শিখদের কাছে ধর্ম ও সম্মান জীবনের থেকেও মূল্যবান।

‘সির দিয়া, পর সির-এ-ইমান না দিয়া’ অর্থাৎ,’আমি মাথা দিয়েছি, কিন্তু বিশ্বাস দিইনি।’ এই পংক্তি শিখ শহিদদের অটল সাহস ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের প্রতীক, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করে।