Supreme Court on Firecracker: বাজি পোড়ানো বন্ধ করলেই, বায়ুদূষণ কমবে কি না যথেষ্ঠ তথ্য নেই: সুপ্রিম কোর্ট
Supreme Court: অন্যদিকে, ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার থাকলেও তা জনস্বাস্থ্য ও সংবিধানের অন্যান্য বিধিনিষেধের ঊর্ধ্বে নয়। দীপাবলির ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব স্বীকার করেও আদালতের বক্তব্য, উৎসবের আনন্দের নামে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করা যায় না।

নয়াদিল্লি: পরিবেশ দূষণ রুখতে আতশবাজি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করাই আদর্শ সমাধান বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাজি পোড়ানো বন্ধ করলেই যে বায়ুদূষণ কমবে, তার পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এমনই পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের। আদালতের মতে, ২০২৪ সালে দিল্লি-এনসিআর এলাকায় সম্পূর্ণ বাজি নিষিদ্ধ করা হলেও বায়ুর গুণমান সূচক বা AQI-তে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়নি। ফলে শুধু নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
দীপাবলিতে বাজি পোড়ানো সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে এই মন্তব্য করেছে বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ এবং বিচারপতি প্রসন্ন বি বরালের বেঞ্চ। আদালত জানিয়েছে, বাজি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেই নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা বোঝার জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের তরফে প্রয়োজনীয় তথ্য-পরিসংখ্যান জমা দেওয়া হয়নি।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, ২০২৪ সালে দিল্লি-এনসিআর এলাকায় সম্পূর্ণ বাজি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও AQI-তে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। এমনকি চলতি বছর দশেরার দিন এবং তারপরের দিনও বায়ুদূষণের মাত্রা অনেকটা বেড়েছিল। তাই সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলেই দূষণের সমস্যা মিটবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য এখনও হাতে নেই।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর পরীক্ষামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব বাজি পোড়ানোর অনুমতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। উদ্দেশ্য ছিল, সবুজ বাজি ব্যবহারের ফলে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের উপর কী প্রভাব পড়ে, তা খতিয়ে দেখা। সেই অনুযায়ী রাজ্যগুলিকে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আদালতের অভিযোগ, রাজ্যগুলি সেই নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেনি।
৭ ও ৮ নভেম্বর গ্রিন ক্র্যাকার পোড়ানোর অনুমতি সব দিক বিবেচনা করে আপাতত সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে পরিবেশবান্ধব বাজি বা গ্রিন ক্র্যাকার ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে শীর্ষ আদালত। সেই অনুযায়ী আগামী ৭ ও ৮ নভেম্বর ২০২৬, দীপাবলির দু’দিন নির্দিষ্ট সময়ে গ্রিন ক্র্যাকার পোড়ানো যাবে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সকাল ৬টা থেকে ৭টা এবং রাত ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বাজি পোড়ানো যাবে। তবে এই অনুমতি শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদিত এবং CSIR-NEERI ও PESO-র শংসাপত্রপ্রাপ্ত গ্রিন ক্র্যাকারগুলির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
এ দিন আদালতের পর্যবেক্ষণ, প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক ও চিন্তাবিদগণ পরিবেশকে ধর্মের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করতেন। সকল জীবকে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত বলে মনে করতেন। আদালতের উল্লেখ, কয়েক শতাব্দী আগে ভারতে বারুদের প্রচলন দীপাবলি উদযাপনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে। যার ফলে বাজি ফোটানোর ব্যাপক প্রচলন ঘটে। আদলত বলেছে, ” ‘স্কন্দপুরাণ’ এবং ‘পদ্মপুরাণ’-এর মতো প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থে দীপাবলি উৎসব পালনের সময় প্রদীপ ব্যবহার হত। কয়েক শতাব্দী আগে ভারতে বারুদের প্রচলনের ফলে এই উদযাপনে একটি পরিবর্তন আসে। এর ফলস্বরূপ আতশবাজি ফোটানোর প্রথা চালু হয়।”
একই সঙ্গে হাসপাতাল, নার্সিংহোম, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বৃদ্ধাশ্রম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট নীরব এলাকার ৩০০ মিটারের মধ্যে বাজি পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। ওই এলাকাগুলিকে ‘নো-ক্র্যাকার জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাজি বিক্রিও করা যাবে না। নির্দিষ্ট জায়গা থেকেই অনুমোদিত বাজি বিক্রি করতে হবে। নিষিদ্ধ বাজি বিক্রি বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কড়া পদক্ষেপের নির্দেশও দিয়েছে আদালত।
বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, বাজি পোড়ানোর ফলে বাতাসে যে সূক্ষ্ম কণা ছড়িয়ে পড়েছে, তা দীর্ঘ সময় পরিবেশে ভেসে থাকতে পারে। শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এই কণাগুলি রক্তপ্রবাহে মিশে গিয়ে গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। এর প্রভাব পড়ে শিশু, প্রবীণ এবং বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের উপরও।
দিল্লি-এনসিআরের ভৌগোলিক পরিস্থিতিও দূষণ বাড়ার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে আদালত। সেখানে বাতাসের গতিবেগ কম থাকায় দূষিত বাতাস সহজে সরে যেতে পারে না। শীতকালে তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
আদালত আরও স্পষ্ট করেছে, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বেঁচে থাকার অধিকারের মধ্যে সুস্থ ও দূষণমুক্ত পরিবেশে বেঁচে থাকার অধিকারও রয়েছে। অন্যদিকে, ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার থাকলেও তা জনস্বাস্থ্য ও সংবিধানের অন্যান্য বিধিনিষেধের ঊর্ধ্বে নয়। দীপাবলির ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্ব স্বীকার করেও আদালতের বক্তব্য, উৎসবের আনন্দের নামে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করা যায় না।
সরকারি সংস্থাগুলিকে দীপাবলির পরেও নিয়মিত দূষণের মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে। AQI-র তথ্যের পাশাপাশি দূষণের কারণে হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা এবং মৃত্যুর পরিসংখ্যানও সংগ্রহ করতে হবে। এই তথ্য আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত জানিয়েছে, ৯ নভেম্বর থেকে ফের সারা বছর বাজি পোড়ানোর উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। পাশাপাশি, দীপাবলির পর দূষণ ও স্বাস্থ্যের উপর তার প্রভাব নিয়ে রাজ্যগুলিকে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে।
