AQI
TV9 Network
User
Sign In

By signing in or creating an account, you agree with Associated Broadcasting Company's Terms & Conditions and Privacy Policy.

পুলিশ স্টেশনে পা রাখা মাত্রই কী হয়? FIR-র অধিকার জানুন

Your India: সাধারণ নাগরিকদের জন্য মূল বিষয়টি স্পষ্ট। আপনি যদি কোনও অপরাধের অভিযোগ জানান, তাহলে আইন অনুযায়ী এফআইআর দায়ের করার অধিকার রয়েছে। এফআইআর-এর একটি কপি আপনাকে বিনামূল্যে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে আইনে।

পুলিশ স্টেশনে পা রাখা মাত্রই কী হয়? FIR-র অধিকার জানুন
প্রতীকী চিত্র।Image Credit: TV9 বাংলা
| Edited By: | Updated on: Oct 29, 2026 | 3:01 PM
Share

চুরির অভিযোগ জানাতে এক মহিলা থানায় গেলেন। ডিউটিতে থাকা পুলিশ আধিকারিক তাঁর কথা শুনলেন। কিন্তু লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পরিবর্তে তাঁকে বললেন, বিষয়টি নিয়ে আরও একবার ভেবে দেখতে এবং নিশ্চিত হলে পরে আসতে। কোনও লিখিত অভিযোগ জমা পড়ল না, মিলল না কোনও কেস নম্বর। এমনকী, ওই মহিলা যে থানায় এসেছিলেন, তারও কোনও সরকারি নথি রইল না। তাঁর কাছে ঘটনাটি হয়তো ছোট, ভুলে যাওয়ার মতো একটি অভিজ্ঞতা। কিন্তু আইনের চোখে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। পুলিশ আধিকারিক ইচ্ছাকৃতভাবে এমনটা না করলেও, কার্যত ওই মহিলার অধিকার খর্ব হল।

থানায় অভিযোগ জানানোর পর এফআইআর (FIR) বা ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (First Information Report) দায়ের করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তই সাধারণ ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, অথচ কম বোঝা আইনি যোগাযোগ।

দীর্ঘদিন ধরে এফআইআর (FIR) দায়ের করার বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করত সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকের সিদ্ধান্তের উপর। অভিযোগের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এফআইআর  দায়ের করার আগে পুলিশ আন-অফিশিয়ালি অভিযোগ যাচাই করতে পারত। শুনতে এই প্রক্রিয়াকে যুক্তিসঙ্গত মনে হলেও, এর ফলে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

২০১৪ সালে ললিতা কুমারী বনাম উত্তর প্রদেশ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় দেয়। আদালত জানায়, পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্য থেকে যদি কোনও আমলযোগ্য অপরাধের (Cognizable Offence) ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহলে এফআইআর দায়ের করা বাধ্যতামূলক। এই অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের আগাম অনুমতি ছাড়াই তদন্ত শুরু করতে এবং আইন অনুযায়ী গ্রেফতার করতে পারে। আদালতের বক্তব্য ছিল, আইনে ‘Shall’ শব্দের অর্থ বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, এফআইআর দায়েরের ক্ষেত্রে পুলিশের কোনও ঐচ্ছিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।

এফআইআর দায়ের বাধ্যতামূলক কেন?

সুপ্রিম কোর্টের যুক্তি শুধু আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আদালত বুঝিয়েছিল, এফআইআর দায়েরের আগে পুলিশ যদি আনঅফিশিয়ালি অভিযোগের সত্যতা বিচার করতে শুরু করে, তাহলে পক্ষপাতমূলক পদক্ষেপের সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে কম ক্ষমতাশালী, আর্থিকভাবে দুর্বল বা সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের অভিযোগ নথিভুক্ত না-ও হতে পারে। অন্যদিকে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অভিযোগ দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে।

এই কারণেই এফআইআর (FIR) দায়ের বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক নিয়ম হিসেবে দেখা হয়নি। একে সাংবিধানিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ মামলা যথাযথভাবে নথিভুক্ত হওয়ার পরই অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত—উভয় পক্ষ আইনের সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ পান।

তবে সুপ্রিম কোর্ট কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের কথাও বলেছিল। মূলত বৈবাহিক বিবাদ, বাণিজ্যিক বিরোধ এবং চিকিৎসায় গাফিলতির মতো কিছু ক্ষেত্রে এফআইআর দায়েরের আগে সংক্ষিপ্ত প্রাথমিক অনুসন্ধান করা যেতে পারে। কারণ এই ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কখনও কখনও প্রাথমিক যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

এফআইআর না নিয়ে অভিযোগকারীকে ফেরানোর প্রবণতা কি বন্ধ হয়েছে?

সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও, এফআইআর দায়ের না করে অভিযোগকারীকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পুলিশ ও আইনি মহলে এই ধরনের অভিযোগ নথিভুক্ত না করার প্রবণতাকে কখনও কখনও ‘বার্কিং’ (Burking) বলা হয়।

জাতীয় অপরাধ নথি ব্যুরো বা এনসিআরবি (NCRB)-র পরিসংখ্যানের ধরন নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ নথিভুক্ত না করে, কাউন্সেলিং বা যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে দেওয়ার কিংবা অভিযোগকারীকে অভিযোগ দায়ের করতে নিরুৎসাহিত করার প্রবণতার কথা উঠে এসেছে। সাইবার অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়, যেখানে অভিযোগ এফআইআরে পরিণত হওয়ার হার এখনও তুলনামূলকভাবে কম।

পুলিশ প্রথমে এফআইআর দায়ের করতে অস্বীকার করেছে—এমন ঘটনায় এফআইআর নথিভুক্ত করার নির্দেশ চেয়ে দেশের বিভিন্ন হাইকোর্টে এখনও নিয়মিত মামলা দায়ের হচ্ছে। এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও ললিতা কুমারী মামলার নির্দেশ কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা যে রয়ে গিয়েছে, এই প্রবণতা তারই ইঙ্গিত দেয়।

থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে জিরো এফআইআর (Zero FIR)-এর কথাও মনে রাখুন-

সাধারণ নাগরিকদের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা রয়েছে, যার বিষয়ে অনেকেই জানেন না। সেটি হল জিরো এফআইআর (Zero FIR)।

এই ব্যবস্থায় কোনও অপরাধের অভিযোগ দেশের যে কোনও থানায় দায়ের করা যায়। অপরাধটি সেই থানার এক্তিয়ারভুক্ত এলাকার বাইরে ঘটলেও, অভিযোগ গ্রহণ করা সম্ভব। পরে মামলাটি যথাযথ এক্তিয়ার থাকা থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল, ‘এটি আমাদের থানার এক্তিয়ারভুক্ত নয়’—এই যুক্তিতে যেন কোনও অভিযোগকারীকে ফিরিয়ে দেওয়া না হয়। অতীতে এই ধরনের প্রত্যাখ্যানের কারণে জরুরি মামলায়, বিশেষত যৌন নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে, পদক্ষেপ নিতে দেরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন আইনেও কী বদল এসেছে?

২০২৩ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধি সংক্রান্ত ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার পুরনো আইন, অর্থাৎ কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিওর (Code of Criminal Procedure) বা সিআরপিসি (CrPC)-এর পরিবর্তে চালু হয় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita), যা সংক্ষেপে বিএনএসএস (BNSS) নামেই পরিচিত।

এই আইনের বিধান অনুযায়ী, তিন থেকে সাত বছরের কারাদণ্ডের শাস্তিযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ দিন সময় পেতে পারে। প্রতারণা ও চুরির মতো কিছু সাধারণ অপরাধ এই শ্রেণির মধ্যে পড়তে পারে।

আইনি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এর ফলে আইনি প্রক্রিয়ায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আগে অভিযোগে আমলযোগ্য অপরাধের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিই ছিল মূল বিবেচ্য বিষয়। নতুন বিধানের ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রাথমিক বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে। দেশজুড়ে এই পরিবর্তন বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়, তা নজরে রাখা প্রয়োজন।

পুলিশ এফআইআর দায়ের করতে না চাইলে কী করবেন?

সাধারণ নাগরিকদের জন্য মূল বিষয়টি স্পষ্ট। আপনি যদি কোনও অপরাধের অভিযোগ জানান, তাহলে আইন অনুযায়ী এফআইআর দায়ের করার অধিকার রয়েছে। এফআইআর-এর একটি কপি আপনাকে বিনামূল্যে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে আইনে।

এ ছাড়া, অপরাধটি যে থানার এক্তিয়ারভুক্ত এলাকায় ঘটেছে, সেই থানা ছাড়াও অন্য কোনও থানায় জিরো এফআইআর-ও দায়ের করতে পারেন।

পুলিশ যদি এফআইআর দায়ের করতে অস্বীকার করে, তাহলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানোর জন্য আইনে নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ বারবার অনুরোধ করে শেষ পর্যন্ত কাজ হবে কি না, সেই অনিশ্চয়তার উপর নির্ভর করতে হবে না।

থানায় যাওয়া বা পুলিশের সঙ্গে কথা বলা অনেকের কাছেই এখনও ভীতিকর অভিজ্ঞতা হতে পারে। তবে এই অধিকারগুলি সম্পর্কে জানা থাকলে নাগরিকরা নিজেদের আইনি অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারবেন। ২০১৪ সালের আগে যে ব্যবস্থায় এফআইআর দায়েরের বিষয়টি অনেকটাই পুলিশ আধিকারিকের বিবেচনার উপর নির্ভর করত, সুপ্রিম কোর্টের রায় সেই ক্ষেত্রে একটি আইনি সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। কোনও আধিকারিকের ব্যক্তিগত বিচারবোধের ঊর্ধ্বে থেকেও যে আইন মেনে চলা প্রয়োজন, এই রায় সেই বার্তাই দেয়।

তথ্যসূত্র: ললিতা কুমারী বনাম উত্তর প্রদেশ রাজ্য (২০১৪), ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের রায়; ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩-এর FIR দায়ের ও প্রাথমিক অনুসন্ধান সংক্রান্ত বিধান; FIR দায়েরের প্রক্রিয়া, জিরো FIR এবং BNSS-পরবর্তী পুলিশি ক্ষমতা নিয়ে আইনি বিশ্লেষণ।

Follow Us