
কলকাতা: কয়েকদিন আগেই সংসদে কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন। আর কেন্দ্রের এই বাজেটে নজর কেড়েছে ডানকুনি-সুরাট ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর (DFC)। এটা কি শুধুই বাংলার সঙ্গে গুজরাটের রেললাইন সংযোগ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর তার থেকেও বেশি কিছু। এই ডিএফসি বাংলার শস্যক্ষেত থেকে গুজরাটের হিরা ও বস্ত্র বাজারের সংযোগকারী এক ‘সমৃদ্ধির সেতু’-র কাহিনি।
রেলের বক্তব্য, ২০৫২ কিমি এই ফ্রেট করিডর পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যতের এক অনন্য উপহার। এই বিশাল প্রকল্পটি একটি সমৃদ্ধির সেতু হিসেবে কাজ করবে, যা সরাসরি ছয়টি রাজ্যের মধ্য দিয়ে বাংলার শিল্পকেন্দ্রকে সুরাটের ব্যবসায়িক কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করবে। উচ্চ-গতি সম্পন্ন এবং ভারী পণ্য পরিবহণের রুটের মাধ্যমে কৃষি-প্রধান রাজ্যকে জাতীয় বাজারে কৃষি-স্বর্ণ পরিবহণে ক্ষমতায়িত করবে। যাতে লাভবান হবেন কৃষকরা।
ডানকুনি থেকে সুরাটের সংযোগ-
ডানকুনি-সুরাট করিডরটি ছয়টি রাজ্যের মধ্য দিয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, ছত্তীসগঢ়, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং গুজরাট। বর্তমানে কলকাতা থেকে সুরাটগামী একটি ট্রেনকে যানজটপূর্ণ ও বহুমুখী ট্র্যাকের মধ্যে দিয়ে প্রায় ১,৮৫০ থেকে ১,৯০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। এই ক্লান্তিকর যাত্রায় সময় লাগে ৩০ থেকে ৩৩ ঘণ্টা। যেখানে মালবাহী ট্রেনগুলিকে প্রায়ই প্যাসেঞ্জার এক্সপ্রেস ট্রেনকে পথ ছেড়ে দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ডানকুনি-সুরাট DFC হল এই ‘লজিস্টিকস বাধা’-র চূড়ান্ত সমাধান। উচ্চ-গতির কার্গোর জন্য একটি ডেডিকেটেড ট্র্যাকের মাধ্যমে ট্রানজিট সময় প্রায় অর্ধেক কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। যা আগে দেড় দিন সময় নিত। তা অনেক কম সময়ে সম্ভব হবে। সময় কমে যাওয়ায় লাভবান হবেন উদ্যোগপতিরা।
স্থানীয় কারিগরদের বিশ্ববাজারের সুবিধা-
পশ্চিমবঙ্গ কারুশিল্পের একটি শক্তিকেন্দ্র, বিশেষ করে পোশাক খাতে। কলকাতা হল হাজার হাজার মেধাবী কারিগরের আবাসস্থল, যাঁরা বিশ্বমানের পোশাক তৈরি করেন। তবে স্থানীয় বাজার প্রায়শই খণ্ডিত এবং ক্ষুদ্র পরিসরে থেকে যায়। প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলির সঙ্গে সরাসরি এবং দ্রুত সংযোগ না থাকায় এই নির্মাতারা নিজেদের প্রসারিত করতে প্রতিনিয়ত লড়াই করেছেন, যার ফলে বৃদ্ধিতে ভাটা পড়েছে।
ডানকুনি-সুরাট করিডর ভবিষ্যতে এই চিত্রটিকে সম্পূর্ণ বদলে দেবে-
বস্ত্রশিল্পের সমন্বয়: কলকাতার উৎপাদন ইউনিটগুলোকে সরাসরি ভারতের প্রধান বাণিজ্যিক ও বস্ত্রকেন্দ্র সুরাটের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে, স্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারকরা এখন একটি বিশাল জাতীয় ও বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। বাংলার পণ্য অবশেষে গতি ও দক্ষতার সঙ্গে সুরাটের উচ্চ-চাহিদার বাজারগুলিতে পৌঁছাবে।
হিরা সংযোগ: সুরাট তার হিরা ও গহনা শিল্পের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বাঙালি জাতির সোনা ও হিরার গহনার প্রতি গভীর অনুরাগ ও ঐতিহ্য রয়েছে। এই করিডর একটি নিরবচ্ছিন্ন আদান-প্রদান সহজতর করবে, যা বাংলার কারিগরদের পশ্চিম থেকে উপকরণ সংগ্রহের সুযোগ দেবে এবং রাজ্যে বিশ্বমানের গহনার ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করবে।
কৃষি স্বর্ণযুগ : বাংলার বিখ্যাত আম বা শীতকালীন সবজির মতো পচনশীল পণ্য এখন পশ্চিম ভারতে সতেজ অবস্থায় পৌঁছাতে পারবে। যা স্থানীয় কৃষকদের জন্য “বিশ্বমানের” দাম নিশ্চিত করবে।
যাত্রীবাহী ট্রেন থেকে মালবাহী ট্রেনকে আলাদা করার মাধ্যমে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে?
১. যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য: যাত্রীবাহী ট্রেনগুলি অবশেষে সময়মতো চলবে। কারণ ভারী কার্গো এখন নিজস্ব ট্র্যাকে চলবে।
২. অর্থনৈতিক লাভ: ডানকুনি একটি আন্তর্জাতিক লজিস্টিক হাব-এ পরিণত হতে চলেছে, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ টানবে এবং বাংলার যুবকদের জন্য হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডানকুনি-সুরাট করিডর কেবল পণ্য চলাচলের বিষয় নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গকে বিশ্বমানের শিল্পোন্নত রাজ্যগুলোর সারিতে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম। এই করিডরের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ এখন আর কেবল একটি গন্তব্য নয়; এটি একটি প্রবেশদ্বার। এটি এমন এক ভবিষ্যতের শুরু যেখানে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে মালবাহী ট্রেনের ছন্দে, যা রাজ্যের ঐতিহ্য ও কঠোর পরিশ্রমকে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি দেবে। হাজার হাজার কর্মসংস্থানের পথ খুলে দেবে।