
ভারতের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এক অত্যন্ত প্রভাবশালী নাম ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি। সংক্ষেপে আইপ্যাক (I-PAC) নামে পরিচিত। এটি কোনও রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা (Political Consultancy Firm)। ২০১৩-১৪ সাল নাগাদ ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর (PK) এবং একদল তরুণ পেশাদারদের হাত ধরে এই সংস্থার যাত্রা শুরু হয়। আইপ্যাক মূলত আধুনিক প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালাইসিস, এবং সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নির্বাচনের রণকৌশল তৈরি করে। পশ্চিমবঙ্গে শুধু তৃণমূল কংগ্রেস নয়, অতীতে অরবিন্দ কেজরীবাল থেকে খোদ নরেন্দ্র মোদীর রাজনৈতিক প্রচারেও মাঠে নামতে দেখা যায় ‘সাবেক’ আইপ্যাককে।
২০১৯ সালে বাংলায় পদ্ম শিবিরের ব্যাপক উত্থানের মাঝেই তৃণমূলের হাত ধরতে দেখা যায় আইপ্যাককে। পরবর্তীতে জনমানসে তৃণমূলের ভাবমূর্তি পরিবর্তন করতে একের পর এক কর্মসূচি নিতে দেখা যায় আইপ্যাককে। তৃণমূলের জন্য ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচির সূচনা করে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অভিযোগ সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়। ২০২১ সালের হাই-ভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচনে আইপ্যাকের মস্তিষ্কপ্রসূত ‘বাংলার মেয়ে’ (Banglar Gorbo Mamata) স্লোগান এবং ‘দুয়ারে সরকার’-এর মতো প্রকল্পগুলি তৃণমূলকে বিপুল জয় পেতে সাহায্য করে।
দলের অন্দরে স্বচ্ছতা আনা এবং তরুণ প্রজন্মের নেতাদের সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রেও আইপ্যাকের বরাবরই বড় ভূমিকা ছিল বলে মত ওয়াকিবহাল মহলের। তৃণমূলের প্রার্থী চয়ন থেকে শুরু করে প্রচারের ভাষা, রণকৌশল তৈরি, সবকিছুতেই আইপ্যাকের পরিকল্পনার ছাপ দেখা যায়।
শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ নয়, ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আইপ্যাক এক নতুন ঘরানার জন্ম দিয়েছে। ২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও বড় ছাপ রাখে প্রশান্ত কিশোরের টিম। যদিও আইপ্যাক তখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আসেনি। সেই সময় Citizens for Accountable Governance (CAG) নামে প্রশান্ত কিশোরের নেতৃত্বাধীন এই টিমই ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর ‘চায়ে পে চর্চা’ এবং ‘থ্রি-ডি র্যালি’-র মতো আইকনিক প্রচারের পরিকল্পনা করেছিল। এমনকী কংগ্রেসের সঙ্গেও কাজের ইতিহাস রয়েছে।
রাজ্যস্তরে আইপ্যাক অন্ধ্রপ্রদেশে ওয়াই.এস. জগন্মোহন রেড্ডি (YSRCP), দিল্লিতে অরবিন্দ কেজরীবাল (AAP), বিহারে নীতীশ কুমার (JDU) এবং তামিলনাড়ুতে এম.কে. স্ট্যালিন (DMK)-এর হয়ে কাজ করে তাদের ক্ষমতায় আসতে বড় ভূমিকা রেখেছে। যদিও প্রশান্ত কিশোর এখন অতীত। নিজেই খুলেছেন রাজনৈতিক দল। এখন আইপ্যাকের দায়িত্বে প্রতীক জৈন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বড় অংশের মতে, আইপ্যাক আসার আগে ভারতে নির্বাচন মূলত কর্মী-ভিত্তিক ছিল। আইপ্যাক প্রমাণ করেছে যে, ডেটা সায়েন্স এবং সঠিক বিপণন কৌশলের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করা সম্ভব। আইপ্যাক মূলত তিনটি স্তরে কাজ করে। বুথ স্তরে মানুষের অভাব-অভিযোগ এবং স্থানীয় ইস্যুগুলো বোঝার জন্য বড় আকারে সমীক্ষা করা। জোর দেওয়া হয় ফিল্ড সার্ভেতে। জোর দেওয়া হয় সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারে। রয়েছে আইটি সেল। ফেসবুক, টুইটার (X) এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যে দলের হয়ে তাঁরা প্রচার করছে তাঁদের আঙ্গিকে বিরোধীদের আক্রমণ করা এবং নিজেদের প্রচার ছড়িয়ে দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়। ভোটের সময় স্লোগান ও ইস্তেহার তৈরি করারও কাজ করে। জনগণের আবেগকে স্পর্শ করে এমন স্লোগান তৈরি করে। ‘খেলা হবের’ মতো স্লোগান যেমন এখনও চর্চায় বঙ্গ রাজনীতির আঙিনায়।