
কলকাতা: অর্থসঙ্কট। সেকথা স্বীকার করছেন স্বয়ং মেয়র। কিন্তু, দরজায় কড়া নাড়ছে বিধানসভা নির্বাচন। আবার বছর কাটলেই পৌরনিগমেও নির্বাচন। এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার কলকাতা পৌরনিগমে বাজেট পেশ করতে চলেছেন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। কেমন হবে পৌরনিগমের বাজেট? অর্থসঙ্কট মেটাতে কি কোনও বড় পদক্ষেপ করবেন মেয়র? বাজেট পেশের আগে কী বলছেন ফিরহাদ হাকিম? বিরোধীরাই বা কী বলছে?
অতীতের তুলনায় কলকাতা পৌরনিগমে অর্থসঙ্কট সবথেকে বেশি। স্বীকার করে নিচ্ছেন মেয়র ফিরহাদ। আগামিকাল ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের কলকাতা পৌরনিগমেরর পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করবেন তিনি। পরিস্থিতি বুঝতে সম্প্রতি পৌরনিগমের বিভিন্ন বিভাগের কর্তাদের সঙ্গে রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয় বৈঠকে বসেছিলেন। আর সেখানেই উঠে আসে, পৌরনিগমের কোষাগারে কঙ্কালসার চেহারার বিষয়টি।
সেই বৈঠকে রাজস্ব সংক্রান্ত যে তথ্য পেশ হয়, তাতে দেখা যায়, পৌরনিগমের সম্পত্তিকর বিভাগ সূত্রের খবর, ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্পত্তিকর বাবদ মোট আদায় হয়েছিল ৯৫৩ কোটি ২০ লক্ষের কিছু বেশি টাকা। ২০২৫ সালে ওই একই সময়ে আদায় হয়েছে ৯৯২ কোটি ৬১ লক্ষ টাকার কিছু বেশি।অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের সঙ্গে তুলনামূলক বিচার করে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের পরিসংখ্যান দেখা যাচ্ছে, মাত্র ৪০ কোটি টাকা বেশি আদায় করা সম্ভব হয়েছে।
কলকাতা পৌরনিগমের আগামী অর্থবর্ষের বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে। কিন্তু সম্পত্তি কর আদায় কিংবা অন্যান্য যে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব খাত রয়েছে, তার সঙ্গীন দশা নিয়ে চিন্তিত পৌর আধিকারিকরা। কলকাতা পৌরনিগম সূত্রে খবর, একাধিক প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে ঠিকাদাররা সম্পন্ন করেছেন। অথচ ২০২৩ সালের বিলের টাকা বকেয়া রয়েছে। ঠিকাদাররা নিত্যদিন পৌরনিগমে এসে দরবার করলেও শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে। পৌরনিগমের আধিকারিকদের একাংশের কথায়, অপরিকল্পিত ব্যয় এবং আয়ের কথা না ভেবে একের পর এক প্রকল্পের কাজে হাত দিয়েই কোষাগারে বিপদ ডেকে এনেছে বর্তমান শাসকদল।
শুধু সম্পত্তিকর নয়, কলকাতা পৌরনিগমের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে পার্কিং ফি থেকে আদায়কৃত রাজস্ব, বিজ্ঞাপন খাত এবং বিল্ডিং বিভাগ। এই বিভাগগুলি থেকে রাজস্ব আদায়ের অবস্থা আরও খারাপ।
বিপুল পরিমাণ অর্থসঙ্কটের প্রভাব পড়েছে পৌরনিগমের একাধিক প্রকল্পে। পৌরনিগমের অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট বলছে, চলতি অর্থবর্ষে উদ্বোধন কিংবা শিলান্যাস করা প্রকল্পগুলির মধ্যে মাত্র ৪৮ শতাংশ প্রকল্পের কাজে হাত দেওয়া গিয়েছে। বাকিগুলোর জন্য ৩ থেকে ৫ শতাংশ টাকা বরাদ্দ হয়ে পুরো বিষয়টি থমকে গিয়েছে। ইঞ্জিনিয়ার পদমর্যাদার আধিকারিক নিয়োগ হলেও পর্যাপ্ত গ্রুপ ডি স্টাফ নিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ গত সাড়ে চার বছর ধরে। সব মিলিয়ে বিধানসভা নির্বাচনের আগে কলকাতা পৌরনিগমের এই বাজেট পেশ করা এবং ঘাটতি পূরণ করা রীতিমতো চ্যালেঞ্জের বিষয় বর্তমান ক্ষমতাসীন তৃণমূলের কাছে।
জানা গিয়েছে, পৌরনিগমের স্থায়ী, অস্থায়ী এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের বেতন ও পেনশন দিতে মাসে প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা খরচ হয়। প্রায় ১৮ হাজার স্থায়ী কর্মীর জন্য মাসে ৭৮ কোটি এবং ২০ হাজার অস্থায়ী কর্মীর বেতন বাবদ খরচ হয় ১৫ কোটি টাকা। ৩৫ হাজার অবসরপ্রাপ্ত কর্মীর জন্য মাসে খরচ হয় ৪০ কোটি টাকা। স্থায়ী কর্মীদের মোট বেতনের ৮৫ শতাংশ রাজ্য সরকার বহন করে। বাকি ১৫ শতাংশ পৌরনিগমকে বহন করতে হয়। আবার অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনের ৬০ শতাংশ পৌরনিগম দেয়। কিন্তু অস্থায়ী কর্মীদের বেতনের পুরো অর্থই পৌরনিগমকে বহন করতে হয়।
পৌরনিগমে অর্থসঙ্কট রয়েছে, বাজেট পেশের আগে তা স্বীকার করছে মেয়র ফিরহাদ। তিনি বলছেন, অর্থনৈতিক সঙ্কটে রয়েছে পৌরনিগম। কীভাবে কাজ হবে, তাঁরা জানেন না। সেই চ্যালেঞ্জ সামলে বাজেট করতে হচ্ছে।
মেয়রের এই মন্তব্য নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়ল না গেরুয়া শিবির। পৌরনিগমের ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেপি কাউন্সিলর সজল ঘোষ বলেন, “যখন উনি জানেন না, বাজেটটা কেমন করে করবেন, পৌরনিগম কেমন করে চলবে। তাহলে ছেড়ে দিন। গদি কামড়ে পড়ে রয়েছেন কেন? আমরা বলছি, ডবল ইঞ্জিন সরকার আসবে। পুরো বাংলা উন্নয়নের দিক থেকে বুলেট ট্রেনের গতিতে ছুটবে।”