
কলকাতা: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগ, স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত। তার সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কর্পোরেট’ কায়দা। তার ছাপ পড়ছে তৃণমূলের সংসদীয় রাজনীতিতে। সংসদে নিয়মিত বদলাচ্ছে তৃণমূলের নেতৃত্বের মুখ। বর্ষীয়ান সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে দলনেতা হিসেবে লোকসভার রাশ নিজের হাতে নিয়েছেন তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্য সচেতকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ডেপুটি লিডারের দায়িত্ব পেয়েছেন শতাব্দী রায়। লোকসভার মুখ্য সচেতকের ভূমিকায় কাকলি ঘোষ দস্তিদার। রাজ্যসভায় অভিজ্ঞতা ও সিনিয়রিটির নিরিখে সবার অগ্রজ সুখেন্দুশেখর রায়। কিন্তু তাঁর জায়গায় রাজ্যসভার মুখ্য সচেতকের ভূমিকায় আগেই এসেছেন রাজনীতিতে নব্য সাগরিকা ঘোষ।
এবার রাজ্যসভা থেকে সরছেন জন্মলগ্ন থেকে দলের রাজ্য সভাপতির দায়িত্বে থাকা আজীবন সংগঠক বর্ষীয়ান সুব্রত বক্সি। তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের দায়িত্বে থাকা তরুণ মুখ, সংস্কৃতি-সচেতন, একাধিক ভাষায় স্বচ্ছন্দ এবং রাজ্যসভায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আর রাজ্যসভায় যাচ্ছেন না। আবার আরটিআই কর্মী হিসেবে পরিচিত, সোশ্যাল মিডিয়া যোদ্ধা সাকেত গোখেলকেও সরানো হল রাজ্যসভা থেকে। এর বাইরে মৌসম নূর তৃণমূল থেকে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে রাজ্যসভার পদ ছেড়েছেন। এই চারজনের জায়গায় আসছেন অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক, মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়, বাংলার প্রাক্তন ডিজিপি রাজীব কুমার এবং আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী।
যে কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দূরদর্শী লক্ষ্যের কথা মাথায় রাখতেই হয়।
শিয়রে বিধানসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনে রাজ্যসভার ভোট সমীকরণের গুরুত্ব যৎসামান্যই। কিন্তু তিন বছর পার করলেই ফের দেশের মসনদের ক্ষমতা নির্ধারণের ভোট। সেই লড়াইয়ে দেশের বিরোধী বৃত্তের নেতৃত্বের মুখ হিসেবে মমতাকে তুলে ধরতে এখন থেকেই মরিয়া তৃণমূল।
ইন্ডিয়া ব্লকে আগাগোড়া কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ছিল। কংগ্রেস প্রশ্নে বরাবরই জাতীয় রাজনীতিতে হাতা গুটিয়ে রেখেছে তৃণমূল। আনুষ্ঠানিক বিরোধী দলনেতার পদে থাকলেও রাহুলকে বিরোধীদের নেতা হিসেবে মানতে নারাজ তারা। ভোট যত এগিয়ে আসবে, বিরোধী বৃত্তে মমতাকে নেতা স্বীকারের দাবিতে তৃণমূল যে ক্রমশ সরব হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু কিভাবে? নিছক ময়দানের ভাষণ আর মিডিয়া বাইট?
এই কাজ করতে সংসদ পরিসরের ভূমিকা অপরিসীম। কাজের মূল দায়িত্বই থাকবে দলের সাংসদদের ওপর। কিন্তু নিছক কংগ্রেসের প্রতি ছুৎমার্গ দেখিয়ে সমাজবাদী পার্টি, উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করলেই উদ্দেশ্যসাধন হবে না। প্রয়োজন সংসদ পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির অলিন্দে নিয়মিত লবিং। যে কাজ একসময় রাজ্যসভার দলনেতা তথা তৎকালীন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে করে যেতেন সদ্য প্রয়াত মুকুল রায়। ২০১১ সালে সিপিএমকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় স্তরে কংগ্রেস, বিজেপি সকলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। জাতীয় রাজনীতিতে এক দিকে সনিয়া গান্ধী, প্রণব মুখোপাধ্যায়, অন্যদিকে লালকৃষ্ণ আদবানি, রাজনাথ সিংদের সঙ্গে মমতার পরই নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন মুকুল রায়ই।
এখন সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার কাজ নিয়মিত করেন রাজ্যসভায় তৃণমূলের দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন। ইন্ডিয়া ব্লকের বৈঠকে ইদানিং যাতায়াত শুরু করেছেন শতাব্দী রায়। সংসদে উপস্থিত থাকলে যোগ দেন কাকলি ঘোষ দস্তিদারও। জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ইন্ডিয়া ব্লকের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক থাকলেই ধার-ভার মিলিয়ে মিটিংয়ে যোগ দেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের বিরাট পার্টি সংগঠনের দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে। সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের প্রতিটা পদক্ষেপের কমান্ডিং অথরিটি তিনি। দিল্লির বিরোধী বৃত্তে নিয়মিত সূত্রধরের ভূমিকা পালন করতে তৃণমূল নেত্রীর পর ভরসা করতে হবে একা অভিষেকের উপরেই।
কয়েক বছর আগেও তৃণমূলের লক্ষ্য ছিল গোয়া, ত্রিপুরার মতো ভিন রাজ্যে ক্ষমতা দখল। তৃণমূলকে ভিন রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে অসমের সুস্মিতা দেব, গোয়া থেকে লুইজিনো ফেরেইরোর মতো নেতাদের তৃণমূলের সাংসদ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু মুখ পুড়েছে সব রাজ্যেই। তাই মুখ ফিরিয়ে তৃণমূলের চলার অভিমুখ এখন শুধু বাংলাই। ভিন রাজ্যের নেতাদের ইদানিং আর রাজ্যসভার টিকিট দেওয়ার পক্ষপাতী নয় তৃণমূল। সবমিলিয়ে সংসদীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে বদলে যাচ্ছে তৃণমূলের স্ট্র্যাটেজি।