
কলকাতা: কেউ নিজে থেকে এবার ভোটে দাঁড়াতে চাইছিলেন না। কেউ তাঁর জায়গায় সন্তানকে প্রার্থী করার জন্য সওয়াল করেছিলেন। আবার দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে জেলে গিয়েছেন কেউ। সবমিলিয়ে মঙ্গলবার তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হতে দেখা গেল, শাসকদলের ৭৪ জন বর্তমান বিধায়ক টিকিট পেলেন না। তার মধ্যে একুশের নির্বাচনে জেতা বাবুল সুপ্রিয় যেমন রয়েছেন। যিনি কয়েকদিন আগে রাজ্যসভায় সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। আবার শিক্ষা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত পার্থ চট্টোপাধ্যায়, মানিক ভট্টাচার্যরা রয়েছেন। সবমিলিয়ে কোন কোন বিধায়ক টিকিট পেলেন না?
মহেশতলা বিধানসভার বিধায়ক দুলালচন্দ্র দাস এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান না বলে দলকে জানিয়েছিলেন। এদিন ওই আসনে তাঁর পুত্র শুভাশিস দাসকে প্রার্থী করল তৃণমূল। এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না দুলালবাবু। আবার এন্টালির বিধায়ক স্বর্ণকমল সাহাও এবার তাঁর আসনে পুত্র সন্দীপন সাহাকে প্রার্থী করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এদিন তালিকা ঘোষণা করার পর দেখা গেল, তাঁর আবেদন মেনে নেওয়া হয়েছে। মানিকতলার বর্তমান বিধায়ক সুপ্তি পাণ্ডেও এবার টিকিট পাননি। তাঁর কন্যা শ্রেয়া পাণ্ডেকে ওই আসনে প্রার্থী করল তৃণমূল। পানিহাটির বিধায়ক নির্মল ঘোষ এবার টিকিট পাননি। ওই আসনে প্রার্থী হয়েছেন তাঁর পুত্র তীর্থঙ্কর ঘোষ। বালিগঞ্জের বিধায়ক বাবুল সুপ্রিয় ইতিমধ্যে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে ভোটে লড়ছেন না তিনি। ওই আসনে প্রার্থী হচ্ছেন বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। বেলেঘাটার বর্ষীয়ান বিধায়ক পরেশ পালকে এবার প্রার্থী করেনি তৃণমূল। ওই আসনে লড়বেন কুণাল ঘোষ।
শিক্ষা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবার যে টিকিট পাবেন না, তা নিশ্চিত ছিল। ২৫ বছর পর বেহালা পশ্চিম কেন্দ্রে প্রার্থী বদল করল তৃণমূল। পার্থের কেন্দ্রে এবার প্রার্থী হচ্ছেন রত্না চট্টোপাধ্যায়। নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত নদিয়ার পলাশিপাড়ার বিধায়ক মানিক ভট্টাচার্যকে এবার টিকিট দেয়নি দল। আবার নিয়োগ দুর্নীতিতে জেলবন্দি মুর্শিদাবাদের বড়ঞার বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহাও টিকিট পেলেন না। সেখানে তৃণমূলের প্রার্থী হচ্ছেন প্রতিমা রজক।
চুঁচুড়ার দীর্ঘদিনের বিধায়ক অসিত মজুমদার এবার টিকিট পাননি। তাঁর জায়গায় টিকিট পেয়েছেন তৃণমূলের আইটি সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত দেবাংশু ভট্টাচার্য। হুগলির বলাগড়ের বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারী টিকিট নাও পেতে পারেন বলে জল্পনা চলছিল। শেষপর্যন্ত সেটাই হল। বলাগড়ে তৃণমূল প্রার্থী করল রঞ্জন ধাড়াকে। অভিনেতা কাঞ্চন মল্লিককে হুগলির উত্তরপাড়ায় আর টিকিট দেওয়া হবে বলে জল্পনা ছড়িয়েছিল। বাস্তবে সেটাই হল। উত্তরপাড়ার বিধায়ক কাঞ্চন টিকিট পেলেন না। উত্তরপাড়ায় তৃণমূল প্রার্থী করল তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
আর এক অভিনেতা-বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী এবার প্রার্থী হতে চাইছিলেন না। এবার উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে আর তাঁকে টিকিট দিল না দল। সেখানে প্রার্থী করা হল সব্যসাচী দত্তকে। বিজেপি থেকে তৃণমূলে আসা নদিয়ার রাণাঘাট দক্ষিণের বিধায়ক মুকুটমণি অধিকারীকে টিকিট দিল না দল। সেখানে প্রার্থী করা হল সৌগত কুমার বর্মণকে।
মালদহের মানিকচকের বিধায়ক সাবিত্রী মিত্রকে এবার টিকিট দেওয়া হয়নি। ওই আসনে টিকিট পেলেন কবিতা মণ্ডল। উত্তর ২৪ পরগনার নোয়াপাড়ার বিধায়ক মঞ্জু বসু যে এবার টিকিট পাবেন না, তা কয়েকদিন আগেই ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। বাস্তবে তাই হল। নোয়াপাড়ায় এবার টিকিট পেয়েছেন তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্য। আবার জোড়াসাঁকোর বিধায়ক বিবেক গুপ্তকেও এবার টিকিট দেওয়া হল না। তাঁর জায়গায় টিকিট পেলেন বিজয় উপাধ্যায়।
পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকের বিধায়ক সৌমেন মহাপাত্র এবার টিকিট পাননি। সেখানে শাসকদল প্রার্থী করেছে দীপেন্দ্র নারায়ণ রায়কে। পূর্ব মেদিনীপুরের বর্ষীয়ান তৃণমূল বিধায়ক বিপ্লব রায়চৌধুরীও এবার টিকিট পাননি। তাঁর জায়গায় পাঁশকুড়া পূর্ব আসনে তৃণমূল প্রার্থী করেছে অসীম কুমার মাজিকে।
জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জের দীর্ঘদিনের বিধায়ক খগেশ্বর রায় এবার টিকিট পাননি। টিকিট না পেয়ে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। বলেন, “টাকার কাছে হেরে গেলাম।” রাজগঞ্জে এবার তৃণমূল প্রার্থী করেছে অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মণকে। পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া পশ্চিমের বিধায়ক ছিলেন ফিরোজা বিবি। এবার তিনি টিকিট পেলেন না। তাঁর জায়গায় প্রার্থী করা হয়েছে সিরাজ খানকে। পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের দীর্ঘদিনের বিধায়ক মমতা ভুঁইয়াকে এবার টিকিট দেয়নি শাসকদল। সেখানে প্রার্থী হয়েছেন আশিস হুদাইত। পশ্চিম মেদিনীপুরের নারায়ণগড়ের বিধায়ক সূর্যকান্ত অট্টকে এবার টিকিট দেওয়া হল না। সেখানে এবার টিকিট পেলেন প্রতিভারানি মাইতি।
রাজ্যের তিন মন্ত্রী জ্যোৎস্না মান্ডি, তাজমুল হোসেন এবং মনোজ তিওয়ারিও টিকিটি পেলেন না। বাঁকুড়ার রানিবাঁধের বিধায়ক জ্যোৎস্না মান্ডি। তাঁর জায়গায় সেখানে প্রার্থী হলেন তনুশ্রী হাঁসদা। শিবপুরের বিধায়ক ছিলেন মনোজ তিওয়ারি। সেখানে প্রার্থী করা হল রানা চট্টোপাধ্যায়কে। আর মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরে তাজমুল হোসেনের জায়গায় প্রার্থী করা হল মহম্মদ মাতেবুর রহমানকে।
এদিন প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, যাঁদের টিকিট দেওয়া সম্ভব হল না, তাঁদের সংগঠন কিংবা অন্য কাজে লাগানো হবে। আর দলের প্রার্থী তালিকা নিয়ে তৃণমূলের তরফে বলা হয়, নিচুস্তরে কাজ করেছেন কিংবা করছেন, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, এরকম কর্মীদেরই প্রার্থী করা হয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ে পারফরম্যান্সের উপরই যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা বুঝিয়ে দিয়েছে শাসকদল।