WB Assembly Election 2026 : ভোট ‘রাজনীতিতে’ তিলোত্তমার মা! কেন নিশানায় সিপিএম? নির্বাচনে প্রভাব পড়বে?
WB Assembly Election 2026 : আরজি করের ঘটনা থেকে তার বিচারপ্রক্রিয়া... এই গোটা ঘটনায় সিপিএম কোথা থেকে এল? বিজেপির টিকিটে ভোটে লড়ার সিদ্ধান্ত জানানোর সময় হঠাৎ কেন সিপিএম-কে আক্রমণ করেন তিলোত্তমার মা-বাবা? সিপিএম বারবার দাবি করেছে, তাঁরা না থাকলে প্রমাণ লোপাট করে দেওয়া হত। কিন্তু, তিলোত্তমার মা দাবি করছেন, সিপিএম নাকি নিজেদের স্বার্থে তাঁর মেয়েকে ব্যবহার করেছে।

কলকাতা : প্রার্থী হচ্ছেন নাকি ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছেন? তিলোত্তমার মা কি এবার সত্য়ি ভোট রাজনীতিতে নামলেন? তিনি নিজে টিভি নাইন বাংলাকে জানিয়েছেন, এবার ভোটে তিনি প্রার্থী হতে চান। তাঁর অভিযোগ, সিপিএম নিজের স্বার্থের জন্য তাঁদের মেয়েকে ব্যবহার করেছে। তাই বিজেপির টিকিটে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর তিলোত্তমার মায়ের এই ভোট ময়দানে যোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই কাঁটাছেড়া শুরু হয়েছে। কয়েক দিন আগেও যে লড়াইটা অরাজনৈতিক ছিল, এখন কেন সেই লড়াইটাকে রাজনীতিতে নিজেই টেনে আনতে চাইছেন তিলোত্তমার মা? মেয়ের বিচারের জন্য? কিন্তু, রাজনীতির ময়দান কি আদৌ তাঁর মেয়েকে বিচার দিতে পারবে? আর সবথেকে বড় যে প্রশ্নটা উঠছে, তিলোত্তমার মায়ের এই রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবারের নির্বাচনে কতটা মাথাব্যথার কারণ হতে চলেছে তৃণমূলের জন্য? এই প্রশ্নগুলি নিয়েই আজ আমরা আলোচনা করব টিভি নাইন বাংলার দ্য ব্রিফিং রুমে,আজ আপনাদের সঙ্গে রয়েছি আমি শুভশ্রী।
গোটা বিষয়টা আলোচনার জন্য না চাইলেও আমাদের ফিরে যেতে হবে দুই বছর আগের সেই বিভীষিকাময় রাতে। যে রাতে আর জি কর হাসপাতালে ডিউটিরত অবস্থায় এক তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। সেদিনের ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা রাজ্যকে। নির্যাতিতার বিচার চেয়ে পথে নামেন রাজ্যের মানুষ। তারকা থেকে সাধারণ মানুষ…হাতে হাত রেখে লড়াইয়ে নামেন। মেয়েদের রাত দখল,মিছিল…হাজার হাজার কণ্ঠে প্রতিবাদের স্বর উঠল উই ওয়ান্ট জাস্টিস। এরকম প্রতিবাদের ছবি আগে দেখেনি কলকাতা সহ গোটা রাজ্য। শুধু রাজ্য নয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। অবশ্য আর জি করের ঘটনা নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করেছিল বিভিন্ন দল। এমনই অভিযোগ উঠেছে বারবার। তবে, তাদের মেয়েকে নিয়ে কেউ রাজনীতি করুক তা কখনও চায়নি তিলোত্তমার বাবা মা। তাঁরা মেয়ের বিচার চেয়েছেন শুধু। বিচার কি পেলেন?
আরজি কর ঘটনার তদন্তে নেমে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রথম থেকেই গণধর্ষণের তত্ত্ব উঠে আসছিল। কিন্তু কলকাতা পুলিশ তদন্ত করে বলল ধর্ষক একজনই। তারপর সিবিআই তদন্ত চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলেন তিলোত্তমার বাবা-মা। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হল সিবিআইকে। এরই মাঝে স্বতোঃপ্রণোদিত পদক্ষেপও করে সুপ্রিম কোর্ট। এদিকে, সিবিআই মূল অভিযুক্ত হিসেবে সঞ্জয় রায়ের নামই উল্লেখ করল। সিবিআইয়ের তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সঞ্জয় রায়কে আমৃত্যু কারাবাসের সাজা দেয় শিয়ালদহ আদালত। এই রায়ের পরই সঞ্জয়ের ফাঁসি চেয়ে প্রথমে হাইকোর্টে যায় রাজ্য। তারপর একই আবেদন নিয়ে আদালতে যায় সিবিআইও। রাজ্যের আবেদন খারিজ করলেও সিবিআইয়ের আবেদন হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গ্রহণ করে। বিচার চেয়ে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তিলোত্তমার বাবা-মাও। কিন্তু, এখনও সেই মামলার নিষ্পত্তি হল না। বিচার কবে মিলবে, অপেক্ষায় তিলোত্তমার বাবা-মায়ের মতো আমরা-আপনারাও।
এই যে আরজি করের ঘটনা থেকে তার বিচারপ্রক্রিয়া… এই গোটা ঘটনায় সিপিএম কোথা থেকে এল? বিজেপির টিকিটে ভোটে লড়ার সিদ্ধান্ত জানানোর সময় হঠাৎ কেন সিপিএম-কে আক্রমণ করেন তিলোত্তমার মা-বাবা? আরজি করের ঘটনা যেদিন ঘটে, সেদিন ময়দানে দেখা গিয়েছিল সিপিএমের তরুণ মুখদের। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ময়নাতদন্তের পরই তিলোত্তমার দেহ বাবা মায়ের হাতে তুলে না দিয়ে অন্ধকারে রীতিমতো ‘লুঠ’ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখনই কার্যত বুক চিতিয়ে পুলিশের গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন মীনাক্ষী, কলতানরা। সিপিএম বারবার দাবি করেছে, তাঁরা না থাকলে প্রমাণ লোপাট করে দেওয়া হত। কিন্তু, তিলোত্তমার মা দাবি করছেন, সিপিএম নাকি নিজেদের স্বার্থে তাঁর মেয়েকে ব্যবহার করেছে।
পাল্টা সিপিএম বলছে, তাঁরাই এই ঘটনাটা সবার সামনে নিয়ে এসেছিল। তিলোত্তমার মা-কে সেলিম মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন, পুলিশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল প্রথম বামেরাই। কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশে নয়, শুধুমাত্র মানবিক উদ্দেশে, একজন অসহায় মা-বাবার পাশে দাঁড়াতেই।
মুখে খোলেন মীনাক্ষীও। তাঁরা প্রশ্ন সেদিন কারা করেছিল রাজনীতি? যখন তাঁরা লড়াই করেছিলেন, সেইসময় নির্যাতিতা কোন দল করেন, তা তাঁরা দেখেননি। নারী সুরক্ষা নিয়েই ছিল তাঁদের লড়াইটা তৃণমূলের অভিযোগ, বিষয়টা খুবই দুঃখজনক যে মেয়ের মৃত্যুকে অবলম্বন করে তিলোত্তমার মা-বাবা রাজনীতি করছেন। এদিকে, কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী বলছেন, বিচার সবাই চাইছে। কিন্তু কোনও পার্টির পক্ষ নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ালে কি সত্যিই বিচার পাবেন?
এটা সত্যিই একটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটে দাঁড়ালে কি বিচার পাওয়া সম্ভব? এখানে একটা ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ড। বন্ধুর সঙ্গে সিনেমা দেখে ফেরার সময় বাসের মধ্যে তরুণীকে গণধর্ষণ, অকথ্য অত্যাচার। এই ঘটনা নাড়িয়ে দেয় গোটা দেশকে। প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঝড় ওঠে। মেয়ের বিচারের দাবিতে নির্ভয়ার মা-বাবারও এক দীর্ঘ লড়াই শুরু হয়। দীর্ঘ সাত বছরের সংগ্রাম। তাঁদের এই সংগ্রাম দেশে ক্রিমিনাল ল অর্ডিন্যান্স নিয়ে আসে। যে আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ সাজা হল মৃত্যুদণ্ড। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে তাঁরা সাফল্য পেয়েছেন। চার অভিযুক্তকে ফাঁসির সাজা দেয় আদালত। তবে, নির্ভয়ার মা-বাবার লড়াইয়ে কোনও রাজনীতির রং লাগেনি। বরং রাজনীতিতে একটা বড় প্রভাব ফেলেছিল। এই ঘটনা দেশের সরকার ফেলে দেয়। ২০১৪ সালে পরিবর্তন ঘটে। দেশে সরকার গঠন করে এনডিএ।
আর জি করের ঘটনায় যেটুকু বিচার হয়েছে,তাতে অনেকটাই ভূমিকা রয়েছে নির্ভয়া কাণ্ডের। তবে বিশেষজ্ঞ মহল বলছে মেয়ের বিচারের জন্য ভোটের ময়দানে দাঁড়াতে হয়নি নির্ভয়ার মা-কে। সেখানে তিলোত্তমার মায়ের ভোটে দাঁড়ানোর বিষয়টা কতটা যুক্তিযুক্ত, সেই বিষয়ে প্রশ্ন তুলছে ওয়াকিবহাল মহল। তবে, আরও একটা প্রশ্ন উঠছে। নির্ভয়া কাণ্ড যদি একটা সরকার ফেলে দিতে পারে, তাহলে তিলোত্তমার মা ভোটে দাঁড়ালে কি বাংলাতেও সরকার পরিবর্তন ঘটিয়ে দিতে পারে?
আর জি করের ঘটনার পর বাংলায় সেভাবে কোনও বড় নির্বাচন হয়নি। তবে, রাজ্যের ছ’টি বিধানসভার উপনির্বাচন ছিল। মনে করা হচ্ছিল, আর জি করের ঘটনা উপনির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু, ফল ঘোষণার পর দেখা গেল আর জি করের কোনও প্রভাবই পড়েনি। ৬টি আসনেই জেতে তৃণমূল। তাহলে কি আদৌ এবারের নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে? সেটা তো সময়ই বলবে। আরও একটা বিষয়। এতদিন নিয়ম অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে মুখ দেখাননি তিলোত্তমার মা-বাবা। কিন্তু, ভোটের ময়দানে নামতে গেলে প্রার্থী হলে, নাম-পরিচয় আড়ালে রেখে নির্বাচনী প্রচার চলবে কীভাবে? ইতিমধ্যেই নাম-পরিচয় প্রকাশ্যে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা, পানিহাটি কেন্দ্র থেকে বিজেপির প্রার্থী করা হতে পারে তিলোত্তমার মাকে। বিজেপির দ্বিতীয় তালিকায় তাঁর নাম থাকতে পারে বলে জল্পনা চলছিল। কিন্তু, দ্বিতীয় তালিকাতেও পানিহাটি কেন্দ্র থেকে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে পারেনি বিজেপি। ভোটপ্রচার কীভাবে হবে, সেই ভাবনা-চিন্তা থেকেই কি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছে বিজেপি নেতৃত্ব? গোটা বিষয়টা কোন দিকে মোড় নেই, সেদিকেই নজর থাকবে।
