Aviation fuel: মহুয়া থেকে চপ ভাজার তেল, এতেই উড়েছে ভারতীয় সেনার যুদ্ধবিমান, বড় সাফল্য বাঙালি বিজ্ঞানীর
Sustainable aviation fuel from seed oils: বাঙালি বিজ্ঞানী অঞ্জন রায় বলেন, "ছত্তীসগঢ়ে এক ধরনের গাছ হয়। তাকে বলে রতনজোত। ওই গাছের তেল। এইরকম গাছ দেশের অনেক জায়গায় রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে যেমন রয়েছে করমচা। মহুয়ার তেলেও হয়। এমনকি সিঙাড়া, চপ ভাজার পর যে খাদ্যতেল আমরা ফেলে দিই, তা দিয়েও এই জ্বালানি তৈরি করা যায়। এইসব 'অখাদ্য' তেলে হাইড্রোজন ভরে অনেক চাপে আমরা ওই তেলকে বায়ো ফুয়েলে পরিণত করি।"

কলকাতা: আত্মনির্ভর হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে ভারত। সোমবার নয়াদিল্লির কর্তব্য পথে প্রজাতন্ত্র দিবসে সেই আত্মনির্ভরতা শক্তি প্রদর্শন করেছে ভারতীয় সেনা। তখন নয়াদিল্লি থেকে প্রায় সাড়ে চোদ্দোশো কিমি দূরে কলকাতায় বসে এক বাঙালি বিজ্ঞানীর চোখে ভেসে উঠে সাত বছর আগের কথা। ২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে বায়ুসেনার একটি বিমান উড়েছিল তাঁদের তৈরি জ্বালানিতে। স্মৃতির সরণিতে ফিরে গিয়ে এদিন সেই ঘটনার কথা মনে পড়ছে বাঙালি বিজ্ঞানী অঞ্জন রায়ের। আজ ভারতকে আত্মনির্ভরতা পথে এগিয়ে যেতে দেখে কী বলছেন তিনি?
২০১৯ সালে দেরাদুনে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব পেট্রোলিয়ামের ডিরেক্টর ছিলেন বাঙালি বিজ্ঞানী অঞ্জন রায়। এখন তিনি অবসর নিয়েছেন। তবে ২০১৯ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে তাঁদের তৈরি জ্বালানিতে যুদ্ধবিমান ওড়ার শিহরণ আজও অনুভব করেন তিনি। স্মৃতির সরণি বেয়ে এই বাঙালি বিজ্ঞানী বলেন, “এর শুরুটা হয়েছিল ২০০৯ সালে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব পেট্রোলিয়াম ভারতকে আত্মনির্ভর করতে একটি পদক্ষেপ করে। তারা দেখে, বিদেশ থেকে আমরা যে জ্বালানি আমদানি করি, তার একটা বড় অংশ নষ্ট হয়। ফেলে দেওয়া হয়। বছরে ৩৩০ মিলিয়ন টন কার্বন অ্যাটম আমরা আমদানি করি। বেশি অংশ ফেলে দিই। তখন প্রশ্ন উঠে, দেশের মধ্যে যে কার্বন রয়েছে, তা দিয়ে কি জ্বালানি তেল তৈরি করা যাবে না? তখন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব পেট্রোলিয়ামের ডিরেক্টর ছিলেন ডক্টর এমও গর্গ। তিনি এবং ডক্টর অনিল সিনহার টিম এই নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তাঁরা একটা তেল তৈরি করেন, যেটা বিমানের জ্বালানির মতো দেখতে।”
এরপরই তিনি বলেন, “২০১৬ সালে ওই ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর হই আমি। তখন কাজটাকে দেখে আগ্রহী হই। আমি জানতে চাই, এই তেলে প্লেন কটা উড়ল? বিজ্ঞানীরা বলেন, “আমরা তো প্লেন উড়াতে পারি না।” তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এই জ্বালানিতে প্লেন কি উড়বে? ২০১৮ সালে একটি বেসরকারি বিমান পরিবহণ সংস্থা এগিয়ে এল। ওদের যে ছোট প্লেন, সেখানে এই জ্বালানি দিয়ে উড়ানে রাজি হল। ২০১৮ সালের ২৭ অগস্টে ওই প্লেনের একটি ইঞ্জিনে ২৫ শতাংশ এই সিনথেটিক জ্বালানি, আমরা যেটাকে বলি সাসটেনেবল এভিয়েশন ফুয়েল, দিয়ে প্লেনটাকে দেরাদুন থেকে নয়াদিল্লি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হল। বিমানে ২০ জন যাত্রী ছিলেন। ২ জন পাইলট। ডিজিসিএ-র একজন পর্যবেক্ষক ছিলেন। বিমান দিল্লিতে পৌঁছনোর পর পাঁচজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।”

ওই পরীক্ষামূলক উড়ানের পরই তৎপর হয় ভারতীয় বায়ুসেনা। বাঙালি বিজ্ঞানী বলেন, “এরপর ভারতীয় বায়ুসেনা বিষয়টিতে নজর দিল। ভারতীয় বায়ুসেনা দেখল, তেল আমদানি বন্ধ হলে তাদের বিমান উড়বে না। ফলে এই সফল পরীক্ষামূলক উড়ানের পর ভারতীয় বায়ুসেনা বলল, ছোট বিমানে যদি এই জ্বালানি ব্যবহার করা যায়, তাহলে বায়ুসেনার বিমানে কেন ব্যবহার করা যাবে না? চার মাস পর ওই বছরের ডিসেম্বরে ভারতীয় বায়ুসেনা এই জ্বালানি ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক উড়ান উড়াল। তারপর ২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে এই তেল ব্যবহার করেই কর্তব্য পথে উড়েছিল বায়ুসেনার একটি এএন-৩২। এটা ২ ইঞ্জিনের প্লেন। দু’দিকেই ১০ শতাংশ করে এই বায়ো জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছিল।”

সেদিন বিজ্ঞানী অঞ্জন রায়দের স্বাগত জানাতে হাজির ছিলেন তৎকালীন পাঁচ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী
কীভাবে বানানো হয় এই জ্বালানি?
বাঙালি বিজ্ঞানী বলেন, “ছত্তীসগঢ়ে এক ধরনের গাছ হয়। তাকে বলে রতনজোত। ওই গাছের তেল। এইরকম গাছ দেশের অনেক জায়গায় রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে যেমন রয়েছে করমচা। মহুয়ার তেলেও হয়। এমনকি সিঙাড়া, চপ ভাজার পর যে খাদ্যতেল আমরা ফেলে দিই, তা দিয়েও এই জ্বালানি তৈরি করা যায়। এইসব ‘অখাদ্য’ তেলে হাইড্রোজন ভরে অনেক চাপে আমরা ওই তেলকে বায়ো ফুয়েলে পরিণত করি। তারপর এই জ্বালানি একটু শুদ্ধ করা হয়। যাতে বিমানের উপযুক্ত হয়। এই জ্বালানির নাম রেখেছি ড্রপ-ইন লিক্যুইড সাসটেনেবল অটোমেটিভ এভিয়েশন ফুয়েল। সংক্ষেপে DILSAAF।”
এখন কতটা অগ্রগতি হয়েছে ওই বায়ো তেলের উৎপাদনের কাজ?
বাঙালি বিজ্ঞানী বললেন, “এখনও পর্যন্ত বায়ুসেনার ৭০টি বিমান পরীক্ষামূলকভাবে ওই জ্বালানি ব্যবহার করেছে। একটা বিমানে ৩০০-৪০০ লিটার জ্বালানি লাগে। আর আমরা একবারে বানাই ৫০ লিটার করে। সেজন্য এখন একটা বড় প্ল্যান্ট তৈরি হচ্ছে ম্যাঙ্গালোরে। যেখানে দিনে ২০ হাজার লিটার জ্বালানি তৈরি হবে। আশা করি, ২০২৮ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে ওই প্ল্যাটে জ্বালানি তৈরি শুরু হয়ে যাবে।”
জ্বালানি তৈরির অগ্রগতি কি ধীর গতিতে হচ্ছে?
প্রশ্ন শুনে বিজ্ঞানী অঞ্জন রায় বললেন, “আপনাদের চোখে হয়তো সাত বছর অনেকটা সময়। কিন্তু, প্রযুক্তির দিক থেকে দেখতে গেলে যেকোনও জিনিসকে বাজারে আনতে গেলে, বিশেষ করে যেখানে এর উপর মানুষের জীবন নির্ভর করবে, এর জন্য অনেক সাধনা লাগে। এর টেস্টিং বিদেশে হয়। বিমানের ইঞ্জিন তৈরির সব সংস্থা যখন মেনে নেবে যে এটা ব্যবহারযোগ্য, তখন এটা নিয়মিত ব্যবহার হবে। আমি জানতে পেরেছি, এই বছরই সেই ছাড়পত্র পাওয়া যেতে পারে। ফলে আগামী বছর থেকে এই বায়ো ফুয়েল ব্যবহার শুরু হবে।”
২০২৮ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসে ফের কি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব পেট্রোলিয়ামের তৈরি জ্বালানিতে উড়বে বায়ুসেনার বিমান? এখন থেকেই স্বপ্ন দেখছেন বাঙালি এই বিজ্ঞানী। কে বলেছে বাঙালিরা স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাচ্ছে? এই বাঙালি বিজ্ঞানীর স্বপ্ন-ই তো ভারতকে আত্মনির্ভরতার পথে এককদম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
