রাত সাড়ে ১২টায় নন্দিনীদের সরিয়ে দিয়ে আদতে লাভ কার?
বাঙালির অস্মিতার প্রশ্ন তুলে সংসদে ওয়াকআউটও করেছে তৃণমূল। রাজ্যের শাসক দলের বক্তব্য, কমিশন নয়, বিজেপিই আসলে এই সব সিদ্ধান্তের পিছনে মূল কারিগর। আবার বিজেপির পাল্টা দাবি, স্বরাষ্ট্রসচিব পদে তো সঙ্ঘমিত্রা ঘোষকে বসানো হয়েছে। তিনিও তো একজন মেধাবী বাঙালি। আর বদলি করার ক্ষমতা তো কমিশনের হাতে আছেই।

কলকাতা: বিকেল ৪টেয় ভোট ঘোষণা করল নির্বাচন কমিশন। ঠিক সাড়ে ৬ ঘণ্টা পরই শুরু ‘অ্য়াকশন’! ঘড়িতে রাত সাড়ে ১২টায় নোটিস দিয়ে সরানো হল মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী ও স্বরাষ্ট্রসচিব জগদীশ প্রসাদ মিনাকে। ভোট আবহে আধিকারিকদের বদলির ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু এবার যা ঘটল, তা বাংলায় কস্মিনকালেও ঘটেনি। কেন এমন সিদ্ধান্ত? নবান্নের দুই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ আইপিএস-কে সরিয়ে আদতে কী লাভ?
রবিবার রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ নির্বাচন কমিশন নোটিস দিয়ে জানাল, স্বরাষ্ট্রসচিব পদ থেকে জগদীশ মিনাকে সরিয়ে বসানো হচ্ছে সঙ্ঘমিত্রা ঘোষকে। এই ঘটনা নতুন নয়। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগেও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব অত্রি ভট্টাচার্যকে সরানো হয়েছিল। কিন্তু এভাবে রাতারাতি মুখ্যসচিবকে সরানোর সিদ্ধান্ত কার্যত নজিরবিহীন। বাংলায় এত ভোট হয়েছে, কখনও কোনও মুখ্যসচিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়নি। আর একসঙ্গে স্বরাষ্ট্রসচিব আর মুখ্যসচিবকে বদল করার ঘটনাও বেনজির।
অ্যাকশন এখানেই শেষ হয়নি। সোমবার সকালে সরানো হয়েছে সিপি, ডিজি-র তো গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ আধিকারিকদের। বলা যায়, একেবারে প্রথম সারিতে থেকে রাজ্যের প্রশাসন চালাতে যাঁরা ভূমিকা নেন, তাঁদের প্রায় সবাইকেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, কেন এত কড়া সিদ্ধান্ত? কমিশনের বক্তব্য, রবিবার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক জ্ঞানেশ কুমার সাংবাদিক বৈঠকে বলেই দিয়েছিলেন যে এবার পশ্চিমবঙ্গে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করাই কমিশনের লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যেই প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের সরানো হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, যাঁরা রাজ্যের ডিজি, সিপি বা সিএস ছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই কি অযোগ্য? তাঁরা কেউ কি শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে পারতেন না?
এখানে তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে, একজন কৃতী বাঙালি মহিলাকে সরানো হল কেন? তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “নন্দিনী সিএস। বাঙালি মহিলা। ওঁরা শুধু বাংলা বিদ্বেষী নয়, হিন্দু বিদ্বেষীও। আপনারা নন্দিনীকে মধ্যরাতে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেন। একবার রাজ্যকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন মনে করলেন না?”
বাঙালির অস্মিতার প্রশ্ন তুলে সংসদে ওয়াকআউটও করেছে তৃণমূল। রাজ্যের শাসক দলের বক্তব্য, কমিশন নয়, বিজেপিই আসলে এই সব সিদ্ধান্তের পিছনে মূল কারিগর। আবার বিজেপির পাল্টা দাবি, স্বরাষ্ট্রসচিব পদে তো সঙ্ঘমিত্রা ঘোষকে বসানো হয়েছে। তিনিও তো একজন মেধাবী বাঙালি। আর বদলি করার ক্ষমতা তো কমিশনের হাতে আছেই।
তৃণমূল জমানায় অনেকগুলো ভোট হয়েছে রাজ্যে। এভাবে পরপর সব শীর্ষ আধিকারিককে সরানো হয়নি কখনও। ২০২১-এর নির্বাচনও যথেষ্ট হাইভোল্টেজ ছিল। সেই সময় কমিশন রাজ্য পুলিশের ডিজি, এডিজি আইনশৃঙ্খলাকে সরিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে মুখ্যসচিবের নামটা কি গুরুত্বপূর্ণ? নন্দিনী চক্রবর্তী।
২০২৩-এ এই নন্দিনীকে নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে একটা সংঘাত তৈরি হয়। তখন রাজভবনে দায়িত্বে ছিলেন নন্দিনী। তৎকালীন রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু নবান্ন তাঁকে অব্যাহতি দেয়নি। ফলে রাজ্যপাল বলে দেওয়ার পরও অফিস যেতেন নন্দিনী। পরে তাঁকে সরানো হয়। সেই সময় রাজ্যের বিরোধী নেতারা নন্দিনীকে নিয়ে কম কথা বলেননি। এমনকী নন্দিনীকে যখন স্বরাষ্ট্রসচিব করা হল, তখন শুভেন্দু অধিকারী অবৈধ বলে আদালতে যাবেন বলে হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন। আর তিনি মুখ্যসচিব হওয়ার পর বিজেপি অভিযোগ তুলতে শুরু করে, বকলমে মুখ্যসচিবের কাজ করছেন মনোজ পন্থ।
আপাতত বিজেপির ব্যাখ্যা হল, স্তাবক আধিকারিকদের সরিয়ে সেই সব আধিকারিককে জায়গা দেওয়া হচ্ছে, যাঁরা এতদিন ধরে কোনঠাসা ছিলেন। কারা কোণঠাসা ছিলেন, দুষ্মন্ত নারিয়াল? রাজ্যের একাধিক সচিব পদ সামলেছেন তিনি। দীর্ঘদিন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সচিব হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। আর সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ দীর্ঘ সময় নারী ও শিশু কল্যাণ দফতর ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের দায়িত্ব সামলেছেন। ভোট আবহে তাঁরাই এবার নবান্নের অন্যতম শীর্ষ আধিকারিক পদে।
২০২১-এর নির্বাচনের পর ভোট পরবর্তী হিংসা আদালত পর্যন্ত পৌঁছেছিল। বহু রাজনৈতিক কর্মীর মৃত্যুতে খুনের অভিযোগ সামনে এসেছিল। এবার ডিজি, সিপি, মুখ্যসচিব সবাইকে বদল করে কতটা শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে পারবে কমিশন, এটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।
