Rath Yatra 2026: কান পেতে ভক্তের কথা শোনেন জগন্নাথ,২৮৬ বছরে গুপ্তিপাড়া রথের বিশেষত্ব জানেন?
স্যমন্তক বলেন, "আগেকার দিনে এক এক শিল্পীর এক এক রকম নিদর্শন থাকত। গুপ্তিপাড়ার জগন্নাথ দেবের এই নিদর্শনটা আলাদা করার জন্যই জগন্নাথ দেবকে জ্ঞান মুদ্রার হাতে রাখা হয়েছে। এখানে বলরাম এবং সুভদ্রা দেবীরও হাত রয়েছে।"

হুগলি: বাংলার প্রসিদ্ধ রথগুলির মধ্যে অন্যতম হুগলির বলাগড়ের গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা। সারা বছর জগন্নাথ দেব বৃন্দাবন জিউ মন্দিরে থাকেন। রথযাত্রায় মাসির বাড়ি যান।
জানা যায়, ১৭৪০ সালে এই রথযাত্রা উৎসবের সূচনা হয়। গুপ্তিপাড়ার রথ বৃন্দাবন জিউ রথ নামে পরিচিত। এই বছর ২৮৬ বছরে পদার্পণ করল গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা। বছরের অন্য সময়ে ঐতিহ্যপূর্ণ বৃন্দাবনচন্দ্র মঠের পাশে বছরভর এই রথ টিনের খাঁচায় ভরা থাকে। এই রথ চার তলা, উচ্চতা প্রায় ৩৬ ফুট, দৈর্ঘ্য ও প্রস্ত ৩৪ ফুট করে। আগে এই রথ ছিল ১৩ চূড়ার, এখন ৯ চূড়ার রথ হয়। বৃন্দাবন মন্দির থেকে জগন্নাথ,বলরাম আর সুভদ্রা রথে চড়ে যান প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গোসাঁইগঞ্জ-বড়বাজারে মাসির বাড়ি যান। এখানে জগন্নাথ দেবের গায়ের রং কালো বর্ণের, বলরাম সাদা ও সুভদ্রা হলুদ বর্ণের।
গুপ্তিপাড়া রথযাত্রার একটি নিজস্ব বিশেষত্ব হল ভান্ডার লুঠ। উল্টোরথের আগের দিন হয় ভান্ডার লুঠ। রথের সামনে থাকে একটি সাদা ও একটি নীল বর্ণের দু’টি ঘোড়া। এছাড়াও রথে থাকে বিভিন্ন পুতুল। তাঁদের আলাদা-আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে, আগেকার দিনের যে সামাজিক অবস্থা এই পুতুলগুলির মাধ্যমেই তা পাওয়া যায়। কেউ মাছ কাটছেন, কেউ সন্তানকে দুগ্ধ পান করাচ্ছেন, ডাকাত রয়েছে, ভাই বোন থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন দিক এই রথে লক্ষ্য করা যায়।
গুপ্তিপাড়া রথে উত্তর দক্ষিণ, পূর্ব পশ্চিম চারদিকেই টান হয়। এত সুউচ্চ কাঠের রথ কম দেখা যায়। পুরীর পর দীর্ঘ রাস্তা অতিক্রম করে গুপ্তিপাড়ার রথ। জগন্নাথ দেবের হাত থাকে না। কিন্তু গুপ্তিপাড়ার রথের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল- জগন্নাথ দেবের হাত ও কান আছে। তাই তিনি ভক্তদের কথা শোনেন এবং ভক্তদের উদ্দেশ্যে তিনি জ্ঞান মুদ্রা বাড়িয়ে রাখেন। বুধবার, রথযাত্রা তাই রথের গায়ে পড়েছে নতুন রংয়ের তুলির টান । কাঠ দিয়ে মেরামত করা হচ্ছে রথকে। ফুল দিয়ে সাজানো গোটা রথ। এ বছর গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রাকে ৫ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়েছে রাজ্য সরকার।
গুপ্তিপাড়া রথের পুরোহিত স্যমন্তক গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “২৮৬ বছরে পদার্পণ করেছে গুপ্তিপাড়ার রথ। বৃহস্পতিবার সকাল দশটায় হবে জগন্নাথ দেবের ভোগ। এরপর প্রভুকে কাঁধে করে রথের চারপাশে তিন বার ঘুরিয়ে রথে আরোহন করা হবে। রথের প্রথম টান শুরু হবে বারোটায় এবং দ্বিতীয় টান শুরু হবে বিকেল চারটে। বৃন্দাবন চন্দ্র জিও মঠেই জগন্নাথ দেব, বলরাম ও সুভদ্রাকে নিয়ে সারা বছর থাকেন।”
তিনি এও বলেন, “আজ আষাঢ় প্রতিপদে নব যৌবন হয়। তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা ও চক্ষুদান হয়। তিনি ভক্তদের উদ্দেশ্যে দর্শন দেন। মুখের স্বাদ নষ্ট করার জন্য দ্বিতীয় দিন রথে করে মাসির বাড়ি যান। কিন্তু লক্ষী দেবীকে মন্দিরে রেখে যান। জগন্নাথ দেব ফিরে না আসায় চিন্তায় পড়েন লক্ষ্মী। এরপর পঞ্চমীর দিন লক্ষ্মী দেবী যান সরষে পোড়া দিতে। অর্থাৎ স্বামীকে বশীকরণ করে মন্দিরে নিয়ে আসার জন্য তুকতাক করেন। তারপরেও জগন্নাথ দেব যখন আসছিলেন না, তখন তিনি বৃন্দাবন চন্দ্র এবং কৃষ্ণচন্দ্রকে নালিশ করেন। তারা লেঠেল পাঠিয়ে ভান্ডার লুঠ করায়। শুধুমাত্র গুপ্তিপাড়াতেই এই ভান্ডার লুট হয়।”
জগন্নাথ দেবের হাত থাকে কেন ?
স্যমন্তক বলেন, “আগেকার দিনে এক এক শিল্পীর এক এক রকম নিদর্শন থাকত। গুপ্তিপাড়ার জগন্নাথ দেবের এই নিদর্শনটা আলাদা করার জন্যই জগন্নাথ দেবকে জ্ঞান মুদ্রার হাতে রাখা হয়েছে। এখানে বলরাম এবং সুভদ্রা দেবীরও হাত রয়েছে।”
গুপ্তিপাড়া মাঠের মহারাজ স্বামী গোবিন্দা নন্দ পুরী বলেন, “১৭৪০ সালে স্বামী পীতাম্বরানন্দ রথ শুরু করেছিলেন। তিনি ছিলেন নবমদন্ডী। রথের প্রতি মানুষের একটা ভালোবাসা রয়েছে, অনেকে রথ দেখতে পুরী যান। তাই তখনকার দিনে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো ছিল না। অনেক রকম সমস্যা ছিল। তাই পীতাম্বরানন্দ এখানেই মানুষ যাতে রথ দর্শন করতে পারেন সে কারণেই রথ তৈরি করেছিলেন। তখন ছিল ১৩ চূড়ার রথ। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় এই রথযাত্রায়।”
