Madhyamik Exam: জঙ্গলের অন্ধকার চিরে স্বপ্নের উড়ান, মাধ্যমিকের জেদি মেয়েটার হাত ধরে ইতিহাসের দোরগোড়ায় বনবস্তি
Madhyamik Student: বুধুরাম বনবস্তি থেকে গরুমারা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে সাত সকালে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সুমিলা। বাড়ি থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে স্কুল। স্কুল শেষ করে আরও দূরে সাইকেল চালিয়ে যেতে হয় প্রাইভেট টিউশনে। পদে পদে বিপদ। কিন্তু তা উপেক্ষা করেই চলছে পড়াশোনার লড়াই।

ময়নাগুড়ি: গরুমারা জাতীয় উদ্যানের রামশাই বিট। ময়নাগুড়ি ব্লকে থাকা জাতীয় উদ্যানের এই অংশ গন্ডার, হাতি, চিতাবাঘ তো রয়েইছে সঙ্গে আবার কত্ত রকমের সাপ। সোজা কথায় বন্যপ্রাণী অধ্যুষিত এই এলাকায় জীবন কাটানোই যেন একটা চ্যালেঞ্জ। এই বিট অফিসের অধীনে রয়েছে বুধুরাম বনবস্তি। যেই বস্তি থেকে আজ পর্যন্ত কেউ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোয়নি সেখানেই প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হিসেবে ইতিহাস তৈরি করতে চলেছে বন বস্তির সোনার কন্যা সুমিলা ওড়াওঁ।
যাবতীয় প্রতিকূলতাকে দূরে ঠেলে এগিয়ে চলেছে সুমিলা। গরুমারা জাতীয় উদ্যানের ঘন জঙ্গলঘেরা দুর্গম পথ পেরিয়ে এই বন বস্তি। চারদিকে এখনো জঙ্গল গা ছমছমে পরিবেশ। পদে পদে আতঙ্ক রয়েছে বন্যপ্রাণীর। এমন পরিবেশে এই গ্রাম থেকে আজও কেউ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেনি। আর এবার সেই গ্রাম থেকেই প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হিসেবে নতুন ইতিহাস তৈরি করতে চলেছে চলেছে সুমিলা ওরাওঁ।
সুমিলা ময়নাগুড়ি ব্লকের রামশাই অঞ্চলের পানবাড়ি ভবানী হাইস্কুলের ছাত্রী। বাবা মঞ্চাল ওরাওঁ এবং মা রূপালি ওরাওঁয়ের বড় মেয়ে সুমিলা। বাবা বর্তমানে কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে রয়েছেন। মা চা বাগানে অস্থায়ী শ্রমিকের কাজ করেন। অভাব অনটন সত্বেও চার মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ওরাওঁ পরিবার।
বুধুরাম বনবস্তি থেকে গরুমারা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে সাত সকালে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সুমিলা। বাড়ি থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে স্কুল। স্কুল শেষ করে আরও দূরে সাইকেল চালিয়ে যেতে হয় প্রাইভেট টিউশনে। পদে পদে বিপদ। কিন্তু তা উপেক্ষা করেই চলছে পড়াশোনার লড়াই। সংসারে অভাব থাকলেও পড়াশোনায় কোনওদিন ছেদ পড়েনি। এক বুক স্বপ্ন নিয়ে প্রতিকূলতার সামনে লড়াই চলে যাচ্ছে বন বস্তির এই মেয়ে।
আদিবাসী কন্যার সাফল্যের খবর পেয়ে ইতিমধ্যে এগিয়ে এসেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী তথা সমাজসেবী দুলাল রায়। তিনি সুমিলার উচ্চ শিক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব নিয়েছেন। সুমিলার স্বপ্ন বড় হয়ে নার্স হওয়ার। মন থেকে চায় বনবস্তির মানুষদের সেবা করতে। মা রুপালি দেবী বলছেন আর্থিক কষ্ট আছে। তার মধ্যেই যতদূর সামর্থ্য রয়েছে মেয়েকে পড়াতে চান। খুশি এলাকার লোকজনও।
স্থানীয় বাসিন্দা সুভাষ মণ্ডল বলছেন, “এই এলাকার বাসিন্দারা অর্থনৈতিকভাবে খুবই দুর্বল। পাশাপাশি রাস্তাঘাট খারাপ। পানীয় জলের অভাব। বন্যপ্রাণীদের আতঙ্ক। এইসব নানান সমস্যার কারণে প্রাথমিক শিক্ষার পর আর কেউ স্কুলে যায় না। তাই এখান থেকে আজ পর্যন্ত কেউ উচ্চশিক্ষিত হয়নি। এখন আগের যুগ নেই। পড়াশোনা না করলে বেশিদূর এগোতে পারবে না। সুমিলা আমাদের গ্রাম থেকে প্রথম মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। আমরা খুব খুশি।” প্রতিবেশী রুপমনি ওড়াওঁ বলছেন, এই বন বস্তি থেকে প্রথমবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ও। সুমিলা এগিয়ে গেলে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবে। তাই আমরা চাই ও অনেক দূর যাক।
জেলার ভারপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষা পরিদর্শক শ্যামল চন্দ্র রায় বলেন, “আমি সুমিলার সর্বতভাবে উন্নতি কামনা করি। আমরা চাই ও মাধ্যমিকে ভাল ফল করুক। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হোক। শিক্ষা দফতর এই সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে আগেও ছিল, আগামীতেও থাকবে। একইসঙ্গে বনবস্তি বা চা বাগানের দুর্গম এলাকার থাকা পড়ুয়ারা যাতে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে তার জন্য সরকারের তরফে বছরভর বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দ্রুত ওই পরিষেবা চালু হবে।” আইনজীবী তথা সমাজসেবী দুলাল চন্দ্র রায় বলেন, “আমি এই এলাকার বিধায়ককে অনুরোধ করব যাতে উনি এই বনবস্তির সমস্যার কথা বিধানসভায় তুলে ধরেন। সুমিলা আগামীতে যতদূর পড়তে চায় আমি তার দায়িত্ব নেব।”
