
ঢাকা: বাংলাদেশে শুরু হয়ে গেল শারদীয় দুর্গাপুজো (Durga Puja 2026)। শুক্রবার বাংলাদেশের সময় সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় গীতাপাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আচার-অনুষ্ঠান। আর এর মধ্যে দিয়েই সূচনা হল পাঁচ দিনের দুর্গোৎসবের। এবছর গোটা বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ হাজার মণ্ডপে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার পুজোমণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশে। উৎসব ঘিরে যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, তার জন্য কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোস্ট গার্ড সদস্যকে।
গত ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গোৎসবের আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল। শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হল মূল উৎসব। আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব। গত দু’বছরে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী থেকেছে বাংলাদেশ। বদলেছে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেই এবার শুরু হল দুর্গাপুজো। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
তবে দুর্গাপুজো শুধুমাত্র বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই উৎসবকে ঘিরে প্রতি বছরই আনন্দে মেতে ওঠেন হিন্দু-মুসলিম-সহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে উৎসবে শামিল হওয়ার এই সংস্কৃতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এবারও সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সৌহার্দ্যের বার্তাই উঠে এসেছে দুর্গোৎসবের আয়োজনে।
এবার বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ৩৪ হাজার মণ্ডপে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়েছে। গতবারের তুলনায় মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও চলছে উৎসবের প্রস্তুতি ও আয়োজন।
শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যতিক্রমী আয়োজনও করা হয়েছে। প্রতিমার সাজসজ্জা এবং মণ্ডপের সজ্জায় রয়েছে নতুনত্বের ছোঁয়া। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের মধ্যেও উৎসব ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। শুধু পুজোর আয়োজনই নয়, উৎসবের আবহে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার বার্তা।
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে একসঙ্গে দুর্গোৎসবের আনন্দ উপভোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সকলের প্রত্যাশা, ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে মানুষ যাতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আনন্দের সঙ্গে উৎসব পালন করতে পারেন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, সেই ঐতিহ্য বজায় রাখার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। উৎসবের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় হবে বলেই আশা আয়োজকদের। কোনও বিভেদ নয়, বরং আনন্দ, উৎসাহ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মধ্য দিয়েই এবারের দুর্গোৎসব সম্পন্ন করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের দাবি, সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে দুর্গাপুজো সম্পন্ন করতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গত দু’বছরের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে উৎসব চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।শারদীয় দুর্গাপুজো উপলক্ষে দায়িত্বপূর্ণ এলাকাগুলিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার সদস্য মোতায়েন করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড (Bangladesh Coast Guard)। পুজোমণ্ডপ, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং সংলগ্ন এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর সকালে ঢাকার মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরে দুর্গাপুজোর নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শনে যান বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মহম্মদ মঈনুল হাসান। সেখানেই নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন তিনি।
কোস্ট গার্ডের জেনারেল ডিরেক্টর জানান, বাংলাদেশের উপকূলীয় এবং নদী তীরবর্তী এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে কোস্ট গার্ড। পাশাপাশি সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে নিরাপত্তা প্রদান, ধর্মীয় উপাসনালয় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও দায়িত্ব পালন করে এই বাহিনী। পুজো চলাকালীন যে কোনও অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এড়াতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোস্ট গার্ড সদস্য নিরলসভাবে কাজ করছেন।
কোস্ট গার্ডের চারটি জোনের অধীনে মোট ৬১৫টি মন্দির ও পুজোমণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
পূর্ব জোন: ৬৩টি মন্দির ও পুজোমণ্ডপ
পশ্চিম জোন: ১৪৪টি মন্দির ও পুজোমণ্ডপ
দক্ষিণ জোন: ৩৭১টি মন্দির ও পুজোমণ্ডপ
ঢাকা জোন: ৩৭টি মন্দির ও পুজোমণ্ডপ
দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যাতে কোনও ধরনের অশান্তি বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তার জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কোস্ট গার্ডের ডিরেক্টর। তিনি জানান, হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যাতে তাঁদের ধর্মীয় উৎসব শান্তিপূর্ণ, প্রাণবন্ত এবং নিরাপদ পরিবেশে উদ্যাপন করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শুধু কোস্ট গার্ড নয়, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গেও যৌথভাবে কাজ করা হচ্ছে। পুজো চলাকালীন সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টহলদারি চালানো হবে। যে কোনও অনভিপ্রেত পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীকে।
শুধু পুজোমণ্ডপের নিরাপত্তাই নয়, প্রতিমা বিসর্জনের সময়ও বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। বিশেষ করে নদী এবং জলপথে দুর্ঘটনা এড়ানোর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোস্ট গার্ডের ডিরেক্টর-জেনারেল জানিয়েছেন, পুজো চলাকালীন নৌ-দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে সার্বক্ষণিক টহলদারিও অব্যাহত থাকবে।
প্রতিমা বিসর্জনের নির্ধারিত স্থানগুলিতে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা মোকাবিলায় বিশেষ ডুবুরি দল প্রস্তুত রাখা হবে। বিসর্জনের সময় কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে যাতে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করা যায়, সেই লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা।
পুজো চলাকালীন কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে সাধারণ মানুষকে দ্রুত কোস্ট গার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করার আবেদন জানিয়েছেন ডিরেক্টর-জেনারেল রিয়ার অ্যাডমিরাল মহম্মদ মঈনুল হাসান। তিনি জানিয়েছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে কোস্ট গার্ডের হেল্পলাইন নম্বর ১৬১১১-এ যোগাযোগ করা যাবে। অভিযোগ বা সাহায্যের আবেদন পাওয়া মাত্রই দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্ট গার্ডের এই ধরনের জননিরাপত্তামূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।