Explained: ‘বন্দি’ মাদুরো, ভেনেজুয়েলা চালাবেন ট্রাম্প!
Maduro in Detention: শুক্রবার মধ্যরাতে আচমকাই কেঁপে উঠলে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস। পরপর সাতটি বিস্ফোরণ। যাঁরা রাস্তায় ছিলেন, তাঁরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দিলেন, যাঁরা ঘরে ছিলেন, তাঁরা উৎসুক চোখে বেরিয়ে এলেন। প্রাথমিক ভাবে ঠাওর করা যায়নি ঠিক কী ঘটেছে। ততক্ষণে একাংশের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু কেউ নিশ্চিত নন।

নয়াদিল্লি: কারওর চোখে তিনি ভেনেজুয়েলার ‘চে গুয়াভারা’, কারওর চোখে ‘স্বৈরতন্ত্রের’ প্রতীক। নিকোলাস মাদুরো, গত ৪৮ ঘণ্টায় নানা ভাবে এই নামের সঙ্গে গোটা বিশ্ববাসী পরিচিত হয়ে গিয়েছে। ট্রাম্পের ‘নেকনজরে’ থাকা নেতা। যিনি এককালে দেশ কাঁপিয়েছিলেন, এখন ট্রাম্পের ডেল্টা ফোর্সের কাঁপুনিতে ‘বন্দি’ হয়েছেন। তাও আবার কোথায়, নিউ ইয়র্কের বামমনস্ক মেয়র জোহরান মামদানির শহরের জেলে। কিন্তু এমন পরিণতি কী বৈধ? কোন ক্ষমতা বলে ট্রাম্প এই প্রেসিডেন্টকে কোট আনকোট অপহরণ করলেন? শুধু কি তেলের চাহিদা মেটাতেই এত বড় সিদ্ধান্ত? নাকি মেজাজের মতো ট্রাম্পের কাছে রাজনীতিটাই আসল রাজা।
ট্রাম্পের ‘দাদাগিরি’
শুক্রবার মধ্যরাতে আচমকাই কেঁপে উঠলে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস। পরপর সাতটি বিস্ফোরণ। যাঁরা রাস্তায় ছিলেন, তাঁরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দিলেন, যাঁরা ঘরে ছিলেন, তাঁরা উৎসুক চোখে বেরিয়ে এলেন। প্রাথমিক ভাবে ঠাওর করা যায়নি ঠিক কী ঘটেছে। ততক্ষণে একাংশের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু কেউ নিশ্চিত নন।
কিছুক্ষণ পরেই নিজের সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাতেই নড়েচড়ে বসল গোটা বিশ্ব। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এটা যেন নতুন পর্ব। অনেকে আবার স্মৃতিচারণ করলেন ২০০৩ সালে ইরাকের প্রাক্তন সর্বময় কর্তা সাদ্দাম হোসেনের পরিণতির কথা।
নিজের সেই পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘ভেনেজুয়েলা এবং ওদের নেতার বিরুদ্ধে বৃহৎ পরিসরে একটি হামলা চালানো হয়েছে।’ তবে শুধু হামলা চালিয়ে ক্ষান্ত হয়নি মার্কিন সেনা। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে আরও একটা কাণ্ড ঘটিয়েছে তাঁরা। ঠিক কী কাণ্ড? ট্রাম্পের কথায়, ‘ভেনেজুয়েলান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে মার্কিন সেনা ওই দেশ থেকে রওনা দিয়েছে।’
কোন ক্ষমতাবলে এটা হল?
আমেরিকার এমন ‘দাদাগিরি’ আজ নতুন নয়। ঘরের ঢুকে মারার প্রবণতা তাঁদের বরাবরের। বিশেষ করে মাদুরোর ‘অপহরণের’ পর বারংবার নিরাপত্তা মহলে ফিরে এসেছে সাদ্দাম বা লাদেনের পরিণতির কথা। এমনকি, মানুষ ভুলে যায়নি ১৯৮৯ সালে পানামার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটক করার ঘটনাও। মাদুরোর মতো নরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ তুলেছিল ওয়াশিংটন। সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ হার্বাট ওয়াকার বুশ। এরপর কিছু দিনের মধ্য়েই নরিয়েগার গ্রেফতারির বিরোধিতা করে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল পানামা বাহিনী। অবশ্য দিন কয়েকের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল তাঁদের। অনেকে বলেন, নরিয়েগা ছিলেন আমেরিকা-বিরোধী, অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে নিজের সরকার গড়েছিলেন তিনি। তাই তাঁর উপর পড়েছিল মার্কিন রোষ। পানামা থেকে গ্রেফতার, কিছু বছর আমেরিকার জেল, তারপর ফ্রান্স। এখন সেই পানামাতেই জেলবন্দি রয়েছেন নরিয়েগা।
কিন্তু মাদুরো নিয়ে কী যুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের? মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি বলেন, মাদুরোর সরকার আন্তর্জাতিক স্তরে মাদক চক্র চালায়। তাই সেই মর্মে মাদুরো, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে-সহ মোট ছয় জনের বিরুদ্ধে ‘মাদক-সন্ত্রাস’, অস্ত্র-পাচার-সহ একাধিক ধারায় মামলা করা হয়েছে।
মামলা হয়েছে, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু একজন প্রেসিডেন্টকে কি আটক করার ক্ষমতা রয়েছে আমেরিকার? ওই দেশের সংবিধান অনুযায়ী, আমেরিকান কংগ্রেস, এক কথায় সংসদের অনুমতিতে অন্য কোনও দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা সম্ভব। কিন্তু এই ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে বলে কোনও খবর আপাতত নেই। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক স্তরে কখনওই এমন জোরাজুরিকে আইনি ভাবে রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো প্রতিষ্ঠান প্রশ্রয় দেয় না।
মেজাজটাই আসল রাজা
ট্রাম্প দাদাগিরি কায়েম করে ফেলেছেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আচমকা এই হামলার কারণ কী? ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, মাদুরোকে অপহরণের নেপথ্য়ে রয়েছে তেলের রাজনীতি। শনিবারই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, আপাতত ভেনেজুয়েলার শাসন চালাবে আমেরিকা। অবশ্য, সেদেশের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ভেনেজ়ুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেসকে আপাতত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরেও ট্রাম্প মরিয়া ক্ষমতা নিয়ে।
বর্তমানের বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অপরিশোধিত তৈলভান্ডার ভেনেজুয়েলা। এই দেশের সংরক্ষণে রয়েছে মোট ৩০ হাজার কোটি ব্যারেল তেল। তাতেই নাকি নজর পড়েছে ট্রাম্পের, এমনটাই অভিযোগ। অবশ্য এই অভিযোগকে ইঙ্গিতেই স্বীকার করে নিয়েছেন ট্রাম্প। একাধারে যেমন বলেছেন ভেনেজুয়েলার শাসন চালানোর, তেমনই বলেছেন, তেল বিক্রির কথাও।
তবে শুধু তেল নয়, লক্ষ্য রয়েছে না-পাওয়া নোবেলের দিকেও। একাংশ মনে করছেন, নোবেলের পথ প্রশস্ত করতে এটা ট্রাম্পের বড় মার! কিন্তু কীভাবে? গত বছর ট্রাম্পকে পেরিয়ে নোবেল শান্তি পুরষ্কার ছিনিয়ে নিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো। সেই সময় ট্রাম্প রুষ্ঠ হননি, বরং বলেছিলেন, ‘আমার হয়েই মাচাদো পুরষ্কার পেয়েছেন।’ এবার সেই মাচাদোর পথ যেন আরও প্রশস্ত করে দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলাতেও রাশিয়া-চিন নয়, বরং কোট-আনকোট আমেরিকা-পন্থী নেত্রীকে ক্ষমতা আনতে চান তিনি। এমনকি, মাদুরো আটক হওয়ার পরেই মাচাদো খুশিতে গদগদ হয়েছেন। নিজের সমাজমাধ্য়মে তিনি লিখেছেন, এটা স্বাধীনতার মুহূর্ত। মাদুরোকে অপহরণের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে উঠেছে নিন্দার ঝড়। উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতও। সোমবার এই নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জে রয়েছে জরুরি বৈঠক। নজর রয়েছে সেই দিকেও।
