মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সনের পদ থেকে সরতে ইচ্ছুক লীনা গঙ্গোপাধ্যায়, রাহুলের মৃত্যুতে বিবৃতি পেশ প্রযোজক সংস্থার
তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কেন শুটিংয়ের সময় সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়নি তা নিয়েও নানা ক্ষোভ জমা হয় টলিপাড়ায়। তার উপর শুটিং ইউনিটের নানা মানুষের নানারকম বক্তব্যেও জটিলতা তৈরি হয়। বুধবার, ঘটনার তিনদিন পর প্রযোজনা সংস্থার থেকে দীর্ঘ এক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। যেখানে তুলে ধরা হয়েছে, ঠিক সেদিন কী কী ঘটেছিল তালসারিতে।

রবিবার তালসারিতে লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’ প্রযোজক সংস্থার ধারাবাহিক ‘ভোলে বাবা পার করেগা’র শুটিং করতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্য়ায়। তার পর থেকেই রাহুলের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে চিত্রনাট্যকার ও লেখক লীনা গঙ্গোপাধ্য়ায় ও তাঁর প্রযোজনা সংস্থা। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কেন শুটিংয়ের সময় সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়নি তা নিয়েও নানা ক্ষোভ জমা হয় টলিপাড়ায়। তার উপর শুটিং ইউনিটের নানা মানুষের নানারকম বক্তব্যেও জটিলতা তৈরি হয়। বুধবার, ঘটনার তিনদিন পর প্রযোজনা সংস্থার থেকে দীর্ঘ এক বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। যেখানে তুলে ধরা হয়েছে, ঠিক সেদিন কী কী ঘটেছিল তালসারিতে।
ম্যাজিক মোমেন্টস প্রযোজনা সংস্থার তরফ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ”আমাদের সহকর্মী রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকাল প্রয়াণে আমরা ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্স পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। আমাদের টিমের প্রতিটি শিল্পী এবং সদস্য এই মুহূর্তে গভীর শোকাচ্ছন্ন।
দুর্ঘটনার সময় ঠিক কী ঘটেছিল তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বোঝার জন্য আমরা আমাদের শিল্পী এবং কলাকুশলীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছি, যাঁদের মধ্যে অধিকাংশই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ এবং সুসংগঠিত রিপোর্ট পেশ করার জন্য আমাদের আরও কয়েক দিন সময় প্রয়োজন, যাতে সবার বক্তব্যের মিল এবং অমিলগুলো খতিয়ে দেখে আমরা একটি সঠিক ও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরতে পারি।
সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য আমরা রাহুলের পরিবার, বন্ধু বা ‘আর্টিস্ট ফোরাম’-এর পক্ষ থেকে মনোনীত একজন প্রতিনিধিকে স্বাগত জানাচ্ছি। তিনি উপস্থিত থেকে আমাদের তথ্য সংগ্রহ এবং পর্যবেক্ষণের বিষয়টি তদারকি করতে পারেন, যাতে পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ থাকে।
আমরা জানতে পেরেছি যে, দুর্ঘটনার সময় আমাদের সংস্থার পরিচালক শ্রী শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায় মুম্বইয়ে ছিলেন। প্রোডাকশন ম্যানেজারের কাছ থেকে খবর পাওয়ার পরেই তিনি দ্রুত কলকাতায় ফিরে আসেন এবং সেই রাতেই রাহুলের বাসভবনে গিয়েছিলেন। তবে সেই সময় পরিবার কথা বলার মতো অবস্থায় ছিল না। এই বিবৃতির মাধ্যমে আমরা তাঁদের জানাতে চাই যে, তাঁদের মনে যদি কোনও সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকে, তবে আমরা আমাদের সাধ্যমতো তার উত্তর দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কোনও ধরনের গাফিলতির বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা থাকলেও আমরা তা খতিয়ে দেখতে দায়বদ্ধ।
ফেডারেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি সংক্রান্ত বিষয়ে সংবাদমাধ্যম এবং জনসাধারণের মধ্যে অনেক জল্পনা ছড়িয়েছে। আমরা আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে, আমাদের সমস্ত যোগাযোগ, অনুমতিপত্র এবং প্রাপ্ত নথিপত্র আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করব। তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সমস্ত নথিপত্র দিয়ে সহযোগিতা করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জল্পনা চলছে রাহুলের জলের নিচে থাকার সময়সীমা নিয়েও। কিছু সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, তিনি ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা জলের নিচে ছিলেন। আমাদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই খবরটি সম্ভবত সঠিক নয়। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরেই আমরা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারব।
আমাদের কলাকুশলীদের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, রাহুলকে যখন উদ্ধার করা হয়, তখন তিনি জীবিত ছিলেন এবং যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন, যদিও তিনি স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। তাঁকে তৎক্ষণাৎ জল থেকে তুলে শরীর থেকে জল বের করার চেষ্টা করা হয় এবং নিকটবর্তী একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত, সেই সময় সেখানে কোনও ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন না। ফলস্বরূপ,তাঁকে পুনরায় দিঘা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়, যেখানে শেষ পর্যন্ত তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
আমরা আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংবাদমাধ্যম এবং জনমানসে ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্সকে শুধুমাত্র লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। আমরা জানাতে চাই যে, লীনা ২০১০ সাল থেকে এই সংস্থার সঙ্গে লেখিকা এবং ক্রিয়েটিভ হেড হিসেবে যুক্ত। ২০১১ সালে তিনি বোর্ডে যোগ দেন। তবে তিনি কোনো প্রোমোটার বা অপারেশনাল এক্সিকিউটিভ নন। ইন্ডাস্ট্রিতে এটি সর্বজনবিদিত যে তাঁর ভূমিকা সর্বদা সৃজনশীল দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সম্প্রতি তাঁকে নামমাত্র শেয়ার এবং কো-প্রডিউসারের কৃতিত্ব দেওয়া হলেও, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি আমাদের শো-গুলোর লেখিকা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কোম্পানির কাঠামো বা ‘ক্যাপ টেবিল’ পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
পশ্চিমবঙ্গ মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন হিসেবে লীনার ভূমিকার কারণেই সম্ভবত এই ধরণের ধারণা তৈরি হয়েছে। এই কথা মাথায় রেখে, লীনা তাঁর চেয়ারপার্সন পদ থেকে সরে দাঁড়াতে ইচ্ছুক, যাতে রাহুলের তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনও পক্ষপাতিত্বের আভাস না থাকে এবং তিনি এই বিষয়ে তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করছি যে রাহুলের পরিবার এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে—তাঁরা হারিয়েছেন এক পুত্র, এক স্বামী এবং এক পিতাকে। যদিও আমরা তাঁদের এই শোক কোনোভাবেই লাঘব করতে পারব না, তবুও আমরা অঙ্গীকার করছি যে তদন্তে কোনও ফাঁক রাখা হবে না এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা পূর্ণ সহযোগিতা করব।
যথাযথ অনুমতি সাপেক্ষে, আমরা শুটিংয়ের ফুটেজ, পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের রেকর্ড এবং সমস্ত অফিশিয়াল নথি পরিবারের সদস্য বা প্রতিনিধির সঙ্গে শেয়ার করতে চাই, যাতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে। রাহুল শুধু আমাদের সহকর্মীই ছিলেন না, তিনি আমাদের বন্ধু ছিলেন। আমাদের টিমের প্রতিটি সদস্য তাঁর অকাল প্রয়াণের তদন্ত যাতে নির্ভুল এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ হয়, তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। রাহুল শুধু আমাদের সহকর্মীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের বন্ধুও। আমাদের টিমের প্রতিটি সদস্য তাঁর এই অকাল প্রয়াণের তদন্ত যাতে নির্ভুল এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ হয়, তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।”
