ভারতে শুরু ‘নতুন শিল্পবিপ্লব’! অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে রিপোর্ট Jefferies-র
Industrial Revolution: ভারতে ডেটা সেন্টার এখন গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল পরিকাঠামো হয়ে উঠছে। গত পাঁচ বছরে ডেটা সেন্টারের ক্ষমতা প্রায় ৫ গুণ বেড়ে ২ গিগাওয়াট (GW) হয়েছে। ক্লাউড পরিষেবার ব্যবহার, ডিজিটাল পরিষেবা এবং দেশে ডেটা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কারণে এই বৃদ্ধি হয়েছে।

নয়া দিল্লি: গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক জেফারিস (Jefferies)-র রিপোর্টে ভারতে নতুন শিল্পবিপ্লব হচ্ছে বলে উল্লেখ করল। গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতের অর্থনীতিতে যে পরিবর্তন ঘটছে, তাকে ‘ভারতের নতুন শিল্পবিপ্লব’ (India’s New Industrial Revolution) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মতে, দেশের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, বেসরকারি ক্ষেত্রের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এবং সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তাই এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি।
রিপোর্টে বিশেষ করে কয়েকটি সরকারি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেসরকারি সংস্থার জন্য মহাকাশ ক্ষেত্র খুলে দেওয়া, ডেটা সেন্টারের জন্য কর ছাড়, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স ও সৌরশিল্পে বিভিন্ন অনুমোদন, দেশীয় উৎপাদনে জোর এবং সরকারের পক্ষ থেকে জিপিইউ (GPU) কেনা। জেফারিস (Jefferies)-এর মতে, এই পদক্ষেপগুলিই ভারতের উদীয়মান শিল্পগুলির বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ভারতের নতুন শিল্পবিপ্লব
ভারতে মহাকাশ, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, ডেটা সেন্টার এবং সৌরশক্তির মতো নতুন শিল্পে বেসরকারি সংস্থাগুলির অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ছে। দেশের বড় বাজার এবং চাহিদাই এর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি সরকারও এই ক্ষেত্রগুলিকে এগিয়ে নিতে নানা পদক্ষেপ করছে। যেমন- বেসরকারি সংস্থার জন্য মহাকাশ ক্ষেত্র খুলে দেওয়া, ডেটা সেন্টারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর ছাড়, সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্সে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা, দেশীয় পণ্য ব্যবহারে জোর এবং জিপিইউ কেনার মতো উদ্যোগ। এই রিপোর্টে এই শিল্পগুলির গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
মহাকাশ: নতুন উচ্চতায় বেসরকারি সংস্থা-
মহাকাশ ক্ষেত্রে শক্তিধর দেশের মধ্যে অন্যতম ভারত। ২০২০ সালে মহাকাশ ক্ষেত্রটি বেসরকারি সংস্থার জন্য খুলে দেওয়া হয়। ২০২৩ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতি প্রায় ৫ গুণ বাড়িয়ে ৪০-৪৫ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
এই ক্ষেত্রে একাধিক ভারতীয় স্টার্টআপ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। যেমন স্কাইরুট (Skyroot) কক্ষপথে রকেট উৎক্ষেপণ করেছে, পিক্সেল (Pixxel) উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ তৈরি করছে, অগ্নিকুল (Agnikul) 3D-প্রিন্টেড রকেট ইঞ্জিন তৈরি করেছে এবং দিগন্তর (Digantara) নজরদারি উপগ্রহ নিয়ে কাজ করছে।
সেমিকন্ডাক্টর: তৈরি হচ্ছে নতুন শিল্প ব্যবস্থা-
ভারতের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এখন শুধু পরিকল্পনার পর্যায়ে নেই, বাস্তব কাজও শুরু হয়েছে। এই ক্ষেত্রে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হচ্ছে। একটি চিপ তৈরির কারখানা নির্মাণের কাজ চলছে এবং একাধিক OSAT প্রকল্পও উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে।
নতুন করে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের অনুমোদন পরিকল্পনা এই শিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এর ফলে চিপ ডিজাইন-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব দক্ষতা বাড়বে। তবে সরবরাহ ব্যবস্থা, দক্ষ কর্মী এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
ডেটা সেন্টার: ৫ বছরে ক্ষমতা বাড়বে ৫ গুণ-
ভারতে ডেটা সেন্টার এখন গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল পরিকাঠামো হয়ে উঠছে। গত পাঁচ বছরে ডেটা সেন্টারের ক্ষমতা প্রায় ৫ গুণ বেড়ে ২ গিগাওয়াট (GW) হয়েছে। ক্লাউড পরিষেবার ব্যবহার, ডিজিটাল পরিষেবা এবং দেশে ডেটা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কারণে এই বৃদ্ধি হয়েছে।
আগামী পাঁচ বছরে এই ক্ষমতা আরও ৫ গুণ বেড়ে প্রায় ১০ গিগাওয়াট হতে পারে। এর ফলে ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী সংস্থাগুলির জন্য প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, কুলিং, নির্মাণ এবং নেটওয়ার্ক পরিকাঠামোয় প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
ইলেকট্রনিক্স: এবার দেশেই তৈরি হবে যন্ত্রাংশ-
ভারতের ইলেকট্রনিক্স শিল্প এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। শুধু মোবাইল বা অন্যান্য পণ্য জোড়া লাগানোর পরিবর্তে দেশে আরও বেশি যন্ত্রাংশ তৈরির উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ইলেকট্রনিক্স রফতানি দ্রুত বেড়েছে। ECMS এবং MPMS (Mobile 2.0)-এর মতো সরকারি প্রকল্পের লক্ষ্য হল দেশেই আরও বেশি যন্ত্রাংশ তৈরি করা এবং বিদেশ থেকে আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো।
আগামী ৬ বছরে ECMS-এর মাধ্যমে মোবাইল ফোনের মোট যন্ত্রাংশের মূল্যের প্রায় ৫০ শতাংশ দেশে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে এই হার ২০ শতাংশেরও কম। PCB বা সার্কিট বোর্ড তৈরির ক্ষেত্রেও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
সৌরশক্তি: বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সৌর প্যানেল নির্মাতা ভারত-
ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সৌর PV নির্মাতা। দেশে প্রায় ৩৫ গিগাওয়াট সৌর সেল উৎপাদন ক্ষমতা ইতিমধ্যেই চালু রয়েছে। আরও প্রায় ১০০ গিগাওয়াট ক্ষমতা তৈরির কাজ চলছে। সরকারের ALMM, দেশীয় পণ্য ব্যবহারের নিয়ম এবং PLI-এর মতো উদ্যোগ সৌরশিল্পে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করছে। এর ফলে সেল, ওয়েফার এবং ইনগট তৈরিতেও দেশের সক্ষমতা বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরশিল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদন-শৃঙ্খল দেশে তৈরি করার সম্ভাবনা রয়েছে।
অ্যারোস্পেস: দেশে তৈরি, বিশ্বে উড়ান-
বিশ্বে বিমানের চাহিদা বাড়লেও সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত সুবিধা পেতে পারে। কম খরচে উৎপাদন এবং দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারিং কর্মীদের কারণে ভারতের অ্যারোস্পেস শিল্পের সম্ভাবনা বাড়ছে। Boeing এবং Airbus ইতিমধ্যেই ভারত থেকে বছরে প্রায় ১.৪-১.৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কিনছে। Aequs, Azad, BHFC, DYTC, RW, MOTHERSON এবং SANSERA-এর মতো ভারতীয় সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক বিমান নির্মাতা সংস্থার সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে।
২০৩০ সালের লক্ষ্য-
- মহাকাশ: মহাকাশ অর্থনীতি ৫ গুণ বেড়ে ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
- সেমিকন্ডাক্টর: ইতিমধ্যেই ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, নতুন করে ১৩ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা।
- ডেটা সেন্টার: ক্ষমতা ৫ গুণ বেড়ে ১০GW।
- ইলেকট্রনিক্স: মোবাইলের যন্ত্রাংশের মোট মূল্যের ৫০ শতাংশ দেশে তৈরি।
- সৌরশিল্প: সৌর উৎপাদন-শৃঙ্খলের ৯০ শতাংশ দেশে তৈরি।
- অ্যারোস্পেস: Boeing ও Airbus-এ ভারতের রফতানি বর্তমানে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।
