Domicile Certificate Explained: প্রথমে হ্যাঁ বললেও, হঠাৎ ‘ইউটার্ন’! কেন ডোমিসাইল সার্টিফিকেটে আপত্তি কমিশনের?

Domicile Certificate: ডোমিসাইল সার্টিফিকেট বা নিবাসী শংসাপত্র রাজ্য সরকারের ইস্যু করা একটি নথি, যা প্রমাণ করে, সেই ব্যক্তি নির্দিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা। এটি মূলত শিক্ষা, চাকরি, বা সরকারি সুবিধা পাওয়ার জন্য একজন ব্যক্তির বসবাসের প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

Domicile Certificate Explained: প্রথমে হ্যাঁ বললেও, হঠাৎ ইউটার্ন! কেন ডোমিসাইল সার্টিফিকেটে আপত্তি কমিশনের?
ডোমিসাইল সার্টিফিকেট নিয়ে কোথায় সমস্যা?Image Credit source: TV9 Bangla

Jan 20, 2026 | 4:18 PM

কলকাতা: এসআইআর আবহে কলকাতা জুড়ে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট বানানোর ঢল। পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য হাজার হাজার আবেদন জমা পড়ছে। যদিও ডোমিসাইল সার্টিফিকেট নিয়ে অবস্থান আগেই স্পষ্ট করেছে নির্বাচন কমিশন। পরিস্কার করে বলে দেওয়া হয়েছে, নির্দিষ্ট ভাবে এসআইআর-এর কাজে এই সার্টিফিকেট প্রয়োজন হবে, কখন‌ওই এমনটা বলা হয়নি। ওই সার্টিফিকেটের প্রয়োজনীয়তা অন্য জায়গায়। তবুও দেখা যাচ্ছে,  ডোমিসাইল বা নিবাসী শংসাপত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় কলকাতা পুরসভায় আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়ছে। পুরসভার সদর দফতরের পাশাপাশি বিভিন্ন বরো অফিসেও এই শংসাপত্রের জন্য নাগরিকদের ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু কেন? তা নিয়েই তুমুল বিতর্ক!

ডোমিসাইল সার্টিফিকেট কী? 

ডোমিসাইল সার্টিফিকেট বা নিবাসী শংসাপত্র রাজ্য সরকারের ইস্যু করা একটি নথি, যা প্রমাণ করে, সেই ব্যক্তি নির্দিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা। এটি মূলত শিক্ষা, চাকরি, বা সরকারি সুবিধা পাওয়ার জন্য একজন ব্যক্তির বসবাসের প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

ডোমিসাইল সার্টিফিকেটে কী নিয়ম রয়েছে?

১. রাজ্য প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে,  ১৯৯৯ সালের ২ নভেম্বর তারিখে জারি করা হয় নির্দেশিকা। তাতে বলা হয়েছিল, প্রতিরক্ষা এবং আধা সামরিক বাহিনীর চাকরির জন্য ওই শংসাপত্র দেওয়া হয়।

২. এই সার্টিফিকেট কেবলমাত্র জেলাশাসকরাই দিতে পারেন।

৩. আবেদনকারীর বাবা কিংবা মা সাধারণত ১৫ বছর বা তার বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে থাকতে হবে, তখনই তিনি এই সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করতে পারেন।

৪. সেক্ষেত্রে আবেদনকারীর বাবা, মায়ের নামে বাংলায় বাড়ি বা জমি রয়েছে কিংবা স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে কি না, তা দেখা হয়।

প্রামাণ্য নথি হিসাবে জন্ম সার্টিফিকেট বা স্কুলের পড়ার নথি জমা দিতে হবে। এর পর দেখা হয় আবেদনকারীর কোথায় বসবাস করেন। কোনও সরকারি কোয়ার্টার, না ভাড়াবাড়িতে, নাকি তাঁর নিজের বাড়ি রয়েছে। এসবই ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়।

ডোমিসাইল সার্টফিকেট Vs রেসিডেন্সি সার্টিফিকেট

ডোমিসাইল ও রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট উভয়েই বসবাসের প্রমাণ হলেও পার্থক্য রয়েছে। মূল পার্থক্য, স্থায়ী বনাম অস্থায়ী অবস্থান। ডোমিসাইল সার্টিফিকেট কোনও নির্দিষ্ট রাজ্যে দীর্ঘমেয়াদী বা চিরস্থায়ী বসবাসের প্রমাণ। এটা আজীবনের জন্য বৈধ হয় ।  অন্যদিকে, রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ, যা অস্থায়ীও হতে পারে।

ডোমিসাইল সার্টিফিকেট কত প্রকার ও কী কী? 

ডোমিসাইল সার্টিফিকেট মূলত তিন প্রকার।

জন্মসূত্র: অর্থাৎ কোনও ব্যক্তি জন্মসূত্রেই সেই এলাকার বাসিন্দা। সেখানেই দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন।

বাই চয়েস: হয়তো সেই ব্যক্তি জন্মসূত্রে অন্য জায়গার বাসিন্দা, কিন্তু নিজের পছন্দে দীর্ঘদিন ধরে তিনি এক জায়গায় রয়েছেন। সেটি চাকরির কারণেও হতে পারে, কিংবা নিজের পছন্দে। দীর্ঘদিন বসবাসের পর ওই ব্যক্তি এই সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন করতে পারেন।

ডোমিসাইল অফ ডিপেন্ডেন্স

অর্থাৎ একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক, যে তার বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল। বাবা-মায়ের বাসস্থানের ওপর নির্ভর করেই তার ডোমিসাইল সার্টিফিকেটের আবেদন করা যাবে।

কমিশনের কী বক্তব্য? 

এসআইআর পর্বের একেবারে প্রথমেই নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে বলা হয়েছিল, নো ম্যাপড কিংবা প্রজেনি ম্যাপডদের শুনানির নোটিস পাঠানো হবে। সেক্ষেত্রে কমিশনের বেঁধে দেওয়া নথিগুলি, যেগুলি ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে গণ্য হচ্ছে, তা দেখাতে হবে। তার মধ্যেই একটি ছিল ডোমিসাইল সার্টিফিকেট। ডোমিসাইল সার্টিফিকেট কোন স্তরের আধিকারিক ইস্যু করেন, তা জানতে রাজ্য সরকারকে চিঠিও পাঠায় মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর। রাজ্য প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী, এই ধরনের শংসাপত্রের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করবেন সংশ্লিষ্ট জেলাশাসক বা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক। কিন্তু পরবর্তীতে কমিশন স্পষ্ট করে দেয়, শুনানিতে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট গণ্য হবে না। সেক্ষেত্রে, কমিশনের পর্যবেক্ষণ, যে নিয়মে এই সার্টিফিকেট ইস্যু হওয়ার কথা, বাস্তবে সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না।

ধন্দ কোথায়? 

শংসাপত্রের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করবেন কারা? কমিশন যখন রাজ্যের কাছে এটা জানতে চেয়েছিল, তখন রাজ্যের তরফ থেকে জানানো হয় ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত এই সার্টিফিকেট দেওয়ার ক্ষমতা ছিল কেবল জেলাশাসকদের। পরবর্তীতে সেই অধিকার অতিরিক্ত জেলাশাসক, মহকুমাশাসক ও এসডিও-দেরও দেওয়া হয়। আর এখানেই সমস্যা, কারণ এসডিও-রাই আবার এই এসআইআর পর্বে ERO। ফলে কমিশন এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

কোথায় অসামঞ্জস্য?

এসবের মাঝেই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল ডোমিসাইল সার্টিফিকেট ইস্যুর বিস্তারিত পদ্ধতি রিপোর্ট আকারে নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে সন্দেহ মেটে না কমিশনের। কমিশনের বক্তব্য, বাংলায় যে পদ্ধতিতে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কমিশনের বক্তব্য, নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই সার্টিফিকেটের আবেদনকারীদের মধ্যে কেবল প্যারামিলিটারি সদস্যদের মতো নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির মানুষই যোগ্য। তাঁরা বাদে বাকি কাউকে দেওয়া যায় না। কিন্তু বাংলায় সেই নিয়ম মানা হচ্ছে না। এরপরই স্পষ্ট করে দেওয়া হয়, এসআইআর-এ ডোমিসাইল সার্টিফিকেট গণ্য নয়।

ততক্ষণে অবশ্য  রাজ্য জুড়ে পাড়ায় পাড়ায় এরই মধ্যে ক্যাম্প বা সহায়তা কেন্দ্র খুলে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট দেওয়ার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই যে সমস্ত ভোটাররা নথি হিসাবে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন, তাঁরা চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ তাঁদের ফের শুনানির নোটিস আসে।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য

এরপর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই চিঠি লেখেন CEC জ্ঞানেশ কুমারকে। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের দ্বারা ইস্যু করা স্থায়ী বাসিন্দা শংসাপত্র বা ডোমিসাইল সার্টিফিকেট ভোটার পরিচয়ের প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ না করার নির্দেশ অনানুষ্ঠানিকভাবে সমস্ত জেলা নির্বাচন আধিকারিকদের জানানো হয়েছে। তবে এই সংক্রান্ত কোনও লিখিত বিজ্ঞপ্তি বা আইনসম্মত নির্দেশ এখনও জারি করা হয়নি। কিন্তু এই নির্দেশে সমস্যায় পড়ছেন বাংলায় পরিযায়ী শ্রমিকরা। চিঠির পরও নিজের অবস্থানে অনড় থাকে কমিশন।

বিরোধী দলনেতার বক্তব্য

শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, “মুখ্যমন্ত্রীর আইনের বই পড়া উচিত। ১০ বছর না হলে সেই সার্টিফিকেট গ্রাহ্য নয়।”  তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, “দক্ষিণ ২৪ পরগনার দুর্নীতিগ্রস্ত জেলাশাসক সুমিত গুপ্তকে কলকাতা পৌরসভার কমিশনার বানিয়ে বরো ভিত্তিক বার্থ সার্টিফিকেট দিতে চান, তাহলে তো অবৈধ হবেই। নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যার অত্যন্ত আপডেটেড।”

কমিশনের নির্দেশের পরও হু হু করে বাড়ছে আবেদন

গত এক সপ্তাহে কলকাতায় ডোমিসাইল সার্টিফিকেটের আবেদনের ঢল। এক সপ্তাহে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার আবেদন পৌঁছল কলকাতা পুলিশের কাছে ভেরিফিকেশনের জন্য। আগামী তিন দিনের মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ভেরিফাই করার নির্দেশ দিয়েছে। এত কম সময় এত ভেরিফিকেশনের কাজ পেয়ে মাথায় হাত পুলিশের। থানা ওয়ারি তালিকায় শীর্ষে হরিদেবপুর। ৮০৪ জনের আবেদনের পুলিশ ভেরিফিকেশন করতে হবে। তারপরেই রয়েছে পর্ণশ্রী ৩৮৫, তৃতীয় স্থানে বেহালা ৩১০ জনের আবেদন।

পুলিশের উদ্যোগ

গত শুক্রবার পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের বৈঠক হয়। তারপরেই নির্দেশ দেওয়া হয় ৩ দিনের মধ্যে ভেরিফিকেশন করার। গড়ে অন্য সময় থানা প্রতি বেশি হলে মাসে ৫ টি আবেদন আসে ভেরিফিকেশন করার জন্য। এই বিপুল সংখ্যা অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন আধিকারিকদের একাংশ। প্রশাসনিকভাবে কলকাতা উত্তর এবং দক্ষিণ দুই ভাগে বিভক্ত।

হঠাৎ কেন তৎপরতা?

জরুরি ভিত্তিতে ডোমিসাইল সার্টিফিকেটের পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য সোমবার সকালে অতিরিক্ত পুলিশ কর্মী নিয়োগ করেছে লালবাজার। ৮ জন অফিসার, ২৯ জন কনস্টেবল পদমর্যাদার পুলিশ কর্মী এবং ১৬ টি অতিরিক্ত গাড়ি বরাদ্দ করা হয়েছে জরুরি ভিত্তিতে ভেরিফিকেশন। তারপরও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে কমিশনের স্বচ্ছ নির্দেশিকার পরও কেন এই তৎপরতা?