Humayun Kabir Viral Video Controversy: ভোকাট্টা হুমায়ুন? বাংলার আকাশে মিমের ঘুড়ি!
Humayun Kabir’s Viral ‘Deal’ Video Disrupts AIMIM Alliance: অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন .. অর্থাৎ এআইএমআইএম ওরফে মিম যে কেবল একটি বিশেষ অঞ্চলের দল নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব ক্রমশ বিস্তার করছে—তার প্রমাণ মিলছে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে। বিহারের কিষণগঞ্জ ও কাটিহারের মতো জেলাগুলিতে মিমের প্রভাব দীর্ঘদিনের।

তৃণমূল থেকে বেরিয়ে নতুন দল তৈরি। বিশাল বিশাল সব মিটিং, মিছিল। বেলডাঙায় মহাসমারোহে বাবরি মজজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন, হইচই-শোরগোল থেকে কাট টু হাজার কোটির ডিল! ভাইরাল ভিডিয়ো। আর তাতেই ভোটের আগে বিরাট চাপে হুমায়ুন কবীর। এবারের ভোটে শুরুতে বামেদের সঙ্গে হুমায়ুনের আমজনতা উন্নয়ন পার্টির জোট নিয়ে চর্চা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত বাংলায় সদ্য গোজানো মিমের সঙ্গে জোট হয়। আসাদউদ্দিন ওয়েসির সঙ্গে একসঙ্গে সাংবাদিক বৈঠক করে জোটের ঘোষণাও করেন হুমায়ুন। কিন্তু, একটা ভিডিয়োই যেন একেবারে বাড়বেলার কালবৈশাখীর মতো এসে সব এলোমেলো করে দিল। এলোমেলো করে দিল এতদিন ধরে গোছানো সব অঙ্ক। হাত ছেড়ে দিল মিম। এদিকে এবারের ভোটে হুমায়ুনেরও যেমন পাখির চোখ ছিল মালদহ-মুর্শিদাবাদ তেমনই মিমেরও। অতীতের ভোট পরিসংখ্যান দিকে নজর দিলে দেখা যাবে একাধিক রাজ্যে একেবারে সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরিয়েছিল ওয়েসির দল। কিন্তু কী হবে বাংলায়?
‘একাই ১০০’ না একাই ‘০’?
অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন .. অর্থাৎ এআইএমআইএম ওরফে মিম যে কেবল একটি বিশেষ অঞ্চলের দল নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব ক্রমশ বিস্তার করছে—তার প্রমাণ মিলছে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে। বিহারের কিষণগঞ্জ ও কাটিহারের মতো জেলাগুলিতে মিমের প্রভাব দীর্ঘদিনের। ২০২০ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে পাঁচটি আসন জিতে তারা যে চমক দিয়েছিল, ২০২৫ সালেও সেই সাফল্যের ধারা বজায় রেখেছে ওয়েইসির দল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেখানে মিম এখন কোনও ক্ষণস্থায়ী শক্তি নয়, বরং সেখানে তাদের একটি স্থায়ী ও মজবুত জনভিত্তি তৈরি হয়েছে।
বিহারে নিজেদের জমি শক্ত করার পাশাপাশি ২০২৬ সালে মহারাষ্ট্রের পৌরসভা নির্বাচনেও মিমের ‘ঘুড়ি’ সাফল্যের আকাশে ডানা মেলেছে। মহারাষ্ট্রের পৌর রাজনীতিতে নিজেদের এক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে প্রমাণ করে এআইএমআইএম বিভিন্ন পৌরসভায় মোট ১২৫টি আসনে জয়লাভ করেছে। এই বিশাল সাফল্য কেবল মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে মিমের গুরুত্বকেই বাড়িয়ে দেয়নি, বরং রাজ্যের দীর্ঘদিনের প্রথাগত রাজনৈতিক সমীকরণকেও বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। অর্থাৎ মিম কিন্তু বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা এখন যে কোনও বড় রাজ্যের রাজনৈতিক চালচিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এবার তাতের হাত ধরে বাংলার সমীকরণ দখলের স্বপ্ন দেখেছিলেন হুমায়ুন। কিন্তু সে গুড়ে বালি। জোট হচ্ছে না। সাফ জানিয়ে দিয়েছে মিম। লড়াই হবে একাই। আর হুমায়ুন? তিনি বলছেন জোট ভাঙলে কোনও ক্ষতি হবে বলে তিনি মনে করেন না।
যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, মিম যদি এখন বাংলায় একা লড়ে, তবে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। কারণ, জোটসঙ্গীর বিরুদ্ধে ওঠা ‘বিজেপি-ঘনিষ্ঠতা’র দাগ মিমের গায়েও কিছুটা লেগেছে। ফলে সংখ্যালঘু ভোটারদের একাংশ যারা তৃণমূলের বিকল্প খুঁজছিল, তারা এখন দ্বিধাবিভক্ত। ফলে ভরাডুবি হতে পারে মিমের। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এই ইস্যুটিকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করছে। প্রেস মিটে কুণাল ঘোষের আক্রমণাত্মক মেজাজ সঙ্গে ইমোশোনাল ফিরহাদ হাকিম যেন একটাই কথা বলতে চাইলেন তৃণমূলই একমাত্র বিশ্বস্ত শক্তি, বাকিরা বিক্রিত।
শেষ বেলায় খেলা ঘুরিয়ে দেবে তৃণমূল?
এবারের ভোটে আইএসএফ থেকে মিম, হুমায়ুনের দল, সঙ্গে বাম-কংগ্রেসের থাবা, একের পর এক শক্তিশালী সংখ্য়ালঘু মুখ শুরু থেকেই চাপে রেখেছিল তৃণমূল কংগ্রেসকে। ‘সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হওয়া’র যে ভয় তৃণমূলের ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ভিডিয়োতে যেখানে হুমায়ুনের মুখে শোনা যাচ্ছে “সংখ্যালঘুদের বোকা বানানো সহজ” তা যেন একেবারে শাপে বর হল ঘাসফুল শিবিরের। আর এই সুযোগ পেলে কে ছাড়ে বলুন তো! তৃণমূলও ছাড়ল না। অতএব, হুমায়ুনকে শূলে চড়িয়ে ফিরহাদ হাকিম বললেন, এটা পাপ এটা অন্যায়। আর বিজেপি? এত বড় অভিযোগের পর কী বলছেন পদ্ম নেতারা? শুভেন্দু অধিকারী বলছেন তদন্তের কথা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলার নির্বাচনে যখনই কোনও ছোট দল বা সংখ্যালঘু-কেন্দ্রিক দল মাথা চাড়া দেয়, তৃণমূল তাদের ‘বিজেপির বি-টিম’ বলে দেগে দেয়। হুমায়ুন কবীরের এই ভিডিয়ো সেই তত্ত্বকেই সাধারণ মানুষের চোখে ‘প্রমাণিত’ করার সুযোগ করে দিল। এতে বিজেপি বিরোধী ভোট একত্রিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। একইসঙ্গে মিম এবং হুমায়ুনের আলাদা লড়াই আদতে তৃণমূল বিরোধী ভোটকেই আরও দুর্বল করবে, যা পরোক্ষভাবে তৃণমূলের আসন সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে।
হুমায়ুন কবীরের মূল শক্তি ছিল মুর্শিদাবাদ। ভিডিয়োটি প্রকাশের পর তাঁর নিজের দলেই ভাঙন ধরেছে। শত শত কর্মী তৃণমূলে যোগ দিচ্ছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাতেই তো হরিহরপাড়া বিধানসভার চোয়া অঞ্চল এলাকার আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রচুর কর্মী দল ছেড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূলে যোগদান করেন। তাঁদের হাতে দলীয় পতাকা তুলে দেন হরিহরপাড়া বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী নিয়ামত শেখ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জেলা স্তরে হুমায়ুন কবীরের যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছিল, তা এখন অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে। হুমায়ুন যদিও সব কিছুই দ্বার্থ্যহীন ভাষায় অস্বীকার করেছেন। তিনি বলছেন তিনি এমন কোনও কাজ করবেন না যাতে তাঁকে কেই মীরজাফর আখ্যা দিতে পারে।
ধর্ম নিয়ে রাজনীতি এ দেশে নতুন নয়, কিন্তু প্রকাশ্য় ভিডিয়োয় ‘ধর্মের ডিল’? কে কবে দেখেছেন মনে করতে পারছেন না। তবে ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি টিভি৯ বাংলা। হুমায়ুনের ভাইরাল ভিডিয়োটি যে ভোটের আগে তৃণমূলের সংখ্যালঘু পালে নতুন হাওয়া দিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যদিকে হুমায়ুনেদের সঙ্গে ভবিষ্যতে নওশাদরা আসতেন কিনা, বামেরা আসতেন কিনা সেই প্রশ্নও যেন বিশ বাঁও জলে চলে গেল। সোজা কথায় ‘সংখ্যালঘু ফ্রন্ট’ তৈরির প্রচেষ্টাকে কার্যত আঁতুড়ঘরেই বিনাশ হল। এখন দেখার তৃণমূল ওই প্রেস মিটের সংখ্যালঘু আবেগকে ভোটের বাক্স পর্যন্ত কতটা টেনে নিয়ে যেতে পারে! নাকি হুমায়ুন কবীর আইনি লড়াইয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে ঘুরে দাঁড়াবেন? উত্তর দেবে সময়।
