
একুশের নির্বাচনের মতো এবারও নাটকীয় পটপরিবর্তন। নন্দীগ্রামে এবার শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে তৃণমূলের বাজি আরও এক ভূমিপুত্র। তৃণমূলে যোগ দিয়েই যেন রাতারাতি মোক্ষলাভ। একহাতে ঘাসফুলের পতাকা, একহাতে টিকিট। মঙ্গলবারের ছবিটা যেন ঠিক এমনই ছিল। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর একসময়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং দক্ষ সংগঠক পবিত্র কর শিবির বদলে ফিরে এলেন তৃণমূলে। মঙ্গলবার তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তুলে নেন তৃণমূলের পতাকা। চমক এখানেই শেষ নয়, দলবদল শেষ হতেই শুভেন্দুর গড়ে খোদ শুভেন্দুর বিরুদ্ধেই তাঁকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বাংলার শাসকদল!
এদিকে ভবানীপুরের পাশাপাশি এবার নন্দীগ্রামেও ফের মমতাকে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন শুভেন্দু। তৃণমূলের আগেই প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছিল বিজেপি। আগের বার হারলেও এবার আর নন্দীগ্রামে যাচ্ছেন না মমতা। তিনি থাকছেন ভবানীপুরে। এবার নন্দীগ্রামে শুভেন্দুকে টক্কর দেবেন এই পবিত্র।
পবিত্র করের রাজনৈতিক উত্থানও বেশ কৌতূহলের জন্ম দেয়। ২০২০ সালের নভেম্বরে, শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ঠিক এক মাস আগেই, তৃণমূল ছেড়ে পদ্ম শিবিরে নাম লিখিয়েছিলেন তিনি। তৎকালীন রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষের হাত থেকে পতাকা নিয়েছিলেন সে সময়ের বয়াল-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান পবিত্রবাবু। সঙ্গে ছিলেন উপপ্রধান বিশ্বজিৎ ভুঁইয়া। সে বছরেরই ১৯ ডিসেম্বর মেদিনীপুরে বিজেপির জনসভায় অমিত শাহের হাত ধরে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু। তারপর এক নতুন শুভেন্দুকে দেখেছে বাংলা। এককালে বিজেপির তুলোধনা করা শুভেন্দু সেই কবেই হয়ে উঠেছেন বঙ্গ বিজেপির হিন্দুত্বের নয়া পোস্টার বয়। আর তাঁর দুর্গ? অবশ্যই নন্দীগ্রাম।
কেন পবিত্রকেই বেছে নিল তৃণমূল?
এদিকে তৃণমূলে ফেরার আগে পর্যন্ত পবিত্রবাবু বিজেপির তমলুক সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি পদে আসীন ছিলেন। শুধু তাই নয়, গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে তাঁর স্ত্রী বিজেপির টিকিটে জয়ী হয়ে বর্তমানে বয়াল-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান। কিন্তু কেন কেন পবিত্রকেই বেছে নিল তৃণমূল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দু অধিকারীর মতো একুশে জোড়াফুলকে হারানো হেভিওয়েট নেতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে তৃণমূলের এমন একজনের প্রয়োজন ছিল, যাঁর নন্দীগ্রামের মাটির সঙ্গে যোগ রয়েছে। নন্দীগ্রাম যাঁর হাতের তালুতে।
রাজনৈতিক মহলের অনেকেরই মতে, পবিত্র কর একজন দুর্ধর্ষ গ্রাউন্ড-লেভেল স্ট্র্যাটেজিস্ট। এলাকার নাড়িনক্ষত্র তাঁর নখদর্পণে। বিজেপির অন্দরমহলও তাঁর চেনা। গত বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দুর ভোট কৌশলের অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনিই। এবার শুভেন্দু অধিকারী একইসঙ্গে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রাম—এই দুই কেন্দ্র থেকে লড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে বিজেপির ঘরের লোককে ভেঙে এনে তাদেরই গড়ে পদ্ম শিবিরকে অস্বস্তিতে ফেলাই তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের প্রধান লক্ষ্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পবিত্র করের যোগদানে স্বাভাবিকভাবেই উল্লসিত তৃণমূল কংগ্রেস। সমাজমাধ্যমে এক বিবৃতিতে শাসক দল জানিয়েছে, এই যোগদানের মাধ্যমে নন্দীগ্রামে বিজেপির পতন আরও ত্বরান্বিত হলো। দলের দাবি, নন্দীগ্রামের মানুষ এবার বঞ্চনা ও বেইমানির রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে উন্নয়নের জোয়ারে শামিল হতে প্রস্তুত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পবিত্রবাবু মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবেন বলে মনে করেছে তৃণমূল।
প্রেস্টিজ ফাইট নাকি বদলার লড়াই?
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হার এবং শুভেন্দুর জয়, বাংলার রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। যদিও সামগ্রিক ক্ষেত্রে লোকসভা ভোটের থেকে বিজেপির হাল খারাপ হলেও তেজি ঘোড়ার মতো ছুটেছেন শুভেন্দু। এখন ছাব্বিশের মহারণে নন্দীগ্রাম হারের বদলা নিতে আক্ষরিক অর্থেই মরিয়া তৃণমূল। অন্যদিকে, নিজের দুর্গ অটুট রাখা শুভেন্দু অধিকারীর কাছেও যে বড়সড় ‘প্রেস্টিজ ফাইট’ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গত ডিসেম্বর থেকে এই পবিত্রর দলবদল নিয়ে তীব্র জল্পনা তৈরি হয়েছিল। কিছুদিন আগেই আইপ্যাকের সঙ্গে তাঁর গোপন বৈঠকের কথা ছড়িয়ে পড়ে।
কী বলছেন পবিত্র কর?
পবিত্র যদিও আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলছেন, নন্দীগ্রামেই আমার জন্ম। এখানের মানুষ তো আমাকে আপন করে নিচ্ছে। আমরা উন্নয়নের পক্ষে সওয়াল করব। গত নির্বাচনে বিজেপি যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেগুলি ভাঁওতা বলে আজ প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। এরফলে নাকি রাজ্য সরকারের বিভিন্ন জনমোহিনী প্রকল্প মানুষের হৃদয় কেড়ে নিয়েছে।
আর বিজেপি? বিজেপিতে এই পবিত্র কী আজও পবিত্র? তোপ দাগতে কিন্তু ছাড়ছেন না পদ্ম নেতারা। দিলীপ ঘোষ বলছেন, তৃণমূলের কাছে মনে হয় নন্দীগ্রামে লড়ার মতো যোগ্য প্রার্থীই নেই। সুর চড়িয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেও। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— তৃণমূলের এই কালো ঘোড়া পবিত্র কর কি পারবেন শুভেন্দুর মজবুত দুর্গে ফাটল ধরাতে? নাকি বিরোধী দলনেতার দাপটেই ফের একবার ঘেঁটে যাবে শাসকদলের সমস্ত অঙ্ক? উত্তরের অপেক্ষায় বাংলা।