FIFA World Cup, Portugal: ত্রাতা সেই রোনাল্ডো, উজবেকদের হেলায় বধ করল পর্তুগাল!
CR7 Goals: রোনাল্ডো আসলে বারবার এমন মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করেন, যাঁরা জীবনে বারবার পরীক্ষিত, উপেক্ষিত, অবহেলিত। যাঁদের জীবনে কোনও কিছুই ক্লিক করছে না, তবুও হাল না ছেড়ে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছেন তাঁরা। লড়ছেন, নতুন উদ্যমে ঝাঁপ দিচ্ছেন নতুন অ্যাডভেঞ্চারের উদ্দেশ্যে।

পর্তুগাল – ৫ (রোনাল্ডো ২, নুনো মেন্ডেজ, নেমাতভ আত্মঘাতী, রাফা লিয়াও) : উজবেকিস্তান – ০
হিউস্টন : “…সে মহৎ কিছু করছে না, তার অভাব মিটছে না, কিন্তু তা সত্ত্বেও সে জীবনবিমুখ হচ্ছে না। সে পালাচ্ছে না, এস্কেপ করছে না, সে বাঁচতে চাইছে। সে বলছে, বাঁচার মধ্যেই আনন্দ, সার্থকতা। হি ওয়ান্টস টু লিভ।” সেই কোন ১৯৫৯ সালের সিনেমা অপুর সংসারে এই কথা বলেছিলেন অপু অর্থাৎ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আজ প্রায় ৬৭ বছর পরে তাঁর কথা ফলালেন একজন পর্তুগিজ। নাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো (Cristiano Ronaldo)। এই সোশ্যাল মিডিয়ার অধিবাসীরা যেখানে কঙ্গোর (Congo) বিরুদ্ধে ড্রয়ের পরেই তাঁর জ্যান্ত পোস্টমর্টেম করে ফেলেছিল, সেখানে সব সমালোচনাকে চুপ করিয়ে প্রবলভাবে ফিরলেন তিনি। গোল করলেন। রেকর্ড গড়লেন, রেকর্ড ভাঙলেন, পর্তুগালকে (Portugal) জীবিত রাখলেন। আর প্রমান করলেন, কেন তিনি এখনও সেরার তালিকায় পড়েন।
কঙ্গোর বিরুদ্ধে ১-১ ড্রয়ের পর অনেক ফুটবলবোদ্ধা সোশ্যাল মিডিয়ায় গজিয়ে উঠে অনেক কিছু বলেছিলেন। আজকের পর তাঁরা কোথায় জানতে ইচ্ছে করছে। এমনকি পর্তুগাল দলেও তো গৃহযুদ্ধ কম লাগেনি। এই দলেরই সতীর্থ জোয়াও নেভেস রোনাল্ডোকে ‘দলের এক সাধারণ সদস্য’ বলায় তাঁর ছবিতে কদর্য আক্রমণ করে এলেন রোনাল্ডো ভক্তরা। বাধ্য হয়ে নেভেসের প্রেমিকাকে আসরে নামতে হল। কোচ রবার্তো মার্টিনেজের ট্যাকটিকস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। অথচ, আজ দেখুন, সব ভ্যানিশ। এটাই রোনাল্ডোর সার্থকতা। আজকের ম্যাচে নামার আগেই এই বিশ্বকাপে মেসির সঙ্গে তাঁর তফাৎ হয়ে গিয়েছিল ৫। আজকের ম্যাচের পর সেটা কমে দাঁড়াল ৩-এ।
ম্যাচের ৬ মিনিটের মাথায় জোয়াও ক্যানসেলোর থেকে বল পেয়ে দুরন্ত শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। তাঁর গতির কাছেই পরাস্ত হলেন উজবেক কিপার নেমাটোভ। ১৭ মিনিটে বক্সের বাইরে ফ্রি কিক পায় পর্তুগাল। সেখান থেকে সোজা বল গোলে ঢুকিয়ে দেন নুনো মেন্ডেজ। যদিও, গোলের থেকেও বেশি আলোচনা হবে রোনালদোর বুদ্ধি নিয়ে। এমনভাবে পজিশন নিয়ে রোনাল্ডো দাঁড়িয়েছিলেন, দেখে যে কেউ মনে করবে, বলটা মারবেন রোনাল্ডো। কিন্তু মারলেন নুনো। গোলও করলেন। এরপর আবার ৩৯ মিনিটেও সেই রোনাল্ডো। ব্রুনো ফার্নান্দেজের পাস থেকে বল পেয়ে নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে দেন রোনাল্ডো। এরপর আর দ্বিতীয়ার্ধে কিছু করার ছিল না উজবেকিস্তানের। যদিও, প্রথমার্ধে তাদের একটি গোল বাতিল হল ফাউলের জন্য। গানিয়েভের দুরন্ত শটে আসা গোল ভার দেখে বাতিল করে দিলেন রেফারি। ৬০ মিনিটের মাথায় নেমাতভের আত্মঘাতী গোল ও ৮৭ মিনিটে রাফায়েল লিয়াওয়ের গোলে ৫-০ জয় পেল পর্তুগাল। আজ জোড়া গোলে রেকর্ড গড়লেন সিআর সেভেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় বয়স্ক ফুটবলার হিসেবে গোল করলেন রোনাল্ডো। বিশ্বকাপের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ৬ বিশ্বকাপে খেলে প্রত্যেকটি বিশ্বকাপে গোল করলেন তিনি। বিশ্বকাপে তাঁর গোল সংখ্যা ১০ হয়ে গেল আজ। ভাঙলেন ইউসেবিওর রেকর্ড। একটুর জন্য হ্যাটট্রিকটা হল না, নাহলে আজ আরও একটা রেকর্ড হয়ে যেত হয়ত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আত্মত্রান’ কবিতার লাইনগুলো মনে আছে? “দুঃখতাপে ব্যথিত চিত্তে নাই বা দিলে সান্ত্বনা/দুঃখ যেন করিতে পারি জয়।” এই রোনাল্ডো আসলে বারবার এমন মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করেন, যাঁরা জীবনে বারবার পরীক্ষিত, উপেক্ষিত, অবহেলিত। যাঁদের জীবনে কোনও কিছুই ক্লিক করছে না, তবুও হাল না ছেড়ে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছেন তাঁরা। লড়ছেন, নতুন উদ্যমে ঝাঁপ দিচ্ছেন নতুন অ্যাডভেঞ্চারের উদ্দেশ্যে। এই কঙ্গোর বিরুদ্ধে ড্রয়ের পর এত সমালোচনা হল, অথচ আজ সোশ্যাল মিডিয়া, খবরের চ্যানেল -সর্বত্র শুধুই রোনাল্ডোকে নিয়ে আলোচনা। হারের দুঃখ, বিশ্বকাপ না পাওয়ার গ্লানি – সবকিছু থেকেও যেন প্রধান হয়ে যায় এই দুই জিনিসের না থাকা। দুঃখকে জয় করে তাই আবার নামতে হয় রোনাল্ডোদের। আবার নিজের হেরে যাওয়া সত্ত্বাকে টেনে তুলতে হয়। “তুমিই পারবে কারণ তুমিই সেরা” নামক ভোকাল টনিক দিতে হয় প্রতিনিয়ত। মেসিরা থাকবেনই, তবে আজকের ম্যাচে রোনাল্ডো প্রমাণ করলেন, তাঁরাও ছেড়ে কথা বলবেন না। ক্লাসে ফার্স্ট বয় থাকেই, তা বলে কি সেকেন্ড বয় প্রথমকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে না? কারণ, একটা বড় অংশের কাছে, দ্বিতীয় হওয়া ছেলেটাও যে প্রথমের সমান গুরুত্ব পেয়ে এসেছে।
