Abhishek Banerjee Amtala Office: আমতলায় কীভাবে পাউরুটি কারখানায় আগুন লাগিয়ে তৈরি হয়েছিল অভিষেকের কার্যালয়? সামনে আসছে হাড়হিম করা কাহিনি
Abhishek Banerjee Amtala Office Demolition: স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই অফিসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন প্রবেশ করতেন, তার অন্তত আধ ঘণ্টা আগে থেকে সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হত। ছাড় পেতেন না প্রসূতিরাও। কেউ প্রতিবাদ করলে এনডিপিএস আইনে গারদের পিছনে তাঁর স্থান হত। অত্যাচার চরম মাত্রায় ওঠায় মানুষের অভিযোগ ছিল এই অফিস এবং তার ভিতরে চলা যাবতীয় কার্যকলাপ নিয়ে।

আমতলা: পাঁচতলা ঝাঁ চকচকে পার্টি অফিস। বড় করে লেখা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলার এই পার্টি অফিসেই শনিবার বুলডোজার নিয়ে পৌঁছে যান প্রশাসনের আধিকারিকরা। অবৈধ নির্মাণের অভিযোগে অভিষেকের আমতলার কার্যালয় ভাঙা শুরু হয়। প্রশাসন এই কার্যালয় ভাঙা শুরু করতেই সামনে আসে একের পর এক অভিযোগ। কীভাবে একটি পাউরুটির কারখানাকে সরিয়ে এই কার্যালয় তৈরি হয়েছে, সেই কাহিনি শোনালেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ওই কার্যালয় তৈরির পিছনে হাড়হিম কাহিনি-
২০১৪ সালে প্রথমবার ডায়মন্ড হারবার লোকসভা থেকে নির্বাচিত হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপরই এলাকায় তাঁর ‘রাজত্ব’ কায়েম হতে শুরু করে। বিষ্ণুপুরের আমতলা এলাকাকে নিজের সংসদীয় এলাকার কেন্দ্রীয় এলাকা হিসেবে বেছে নেন অভিষেক।আমতলা মোড় থেকে ২০০ মিটার দূরে একটি বেকারির উপরে নজর পড়ে এলাকার তৃণমূলের নেতা থেকে কর্মীদের। প্রায় ৫ কাঠা ৬ ছটাক জমিতে এই পাউরুটির কারখানা চলত। প্রায় ৪০ জন কর্মী সেখানে কাজ করতেন। বেকারির মালিক ছিলেন মতিউর রহমান মল্লিক নামে এক ব্যক্তি।
অভিযোগ, ওই বেকারিকে সরাতে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। আচমকাই ২০১৪ সালের শেষের দিকে সেই বেকারিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সম্পূর্ণ ছাই হয়ে যায় বেকারি। সেই সময় অভিযোগ ওঠে, বেকারিতে আগুন লাগিয়ে জমি দখল করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এরপর শুরু হয় অত্যাচার। মতিউর রহমান মল্লিককে ভয় দেখানোর পালা শুরু হয়। ওই জমি ছেড়ে দিতে হবে। কারণ সাংসদের অফিস তৈরি হবে। প্রায় ২.৩০ কোটি টাকার জমি সামান্য কয়েক লক্ষ টাকার বিনিময় এলাকার তৃণমূল নেতৃত্ব জোর করে কিনে নেয়।মতিউর রহমান মল্লিককে পুলিশ এবং স্থানীয় সমাজবিরোধীদের দ্বারা ভয় দেখিয়ে ওই জমি ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
ক্যামাক স্ট্রিটের আগে এই অফিস অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য চালানোর অফিস হিসেবে বিবেচিত হত বলে অভিযোগ। বেকারির জমিতে কোনওরকম নির্মাণ নকশা অনুমোদন ছাড়াই প্রথম দু’বছরে দুই তলা, তারপর পর পর আরও তিনতলা তৈরি হয়ে যায়। জমি দখল থেকে বাড়ি দখল বা একাধিক অপরাধমূলক কার্যকলাপের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয় এই সুবিশাল কার্যালয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই অফিসে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন প্রবেশ করতেন, তার অন্তত আধ ঘণ্টা আগে থেকে সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হত। ছাড় পেতেন না প্রসূতিরাও। কেউ প্রতিবাদ করলে এনডিপিএস আইনে গারদের পিছনে তাঁর স্থান হত। অত্যাচার চরম মাত্রায় ওঠায় মানুষের অভিযোগ ছিল এই অফিস এবং তার ভিতরে চলা যাবতীয় কার্যকলাপ নিয়ে।
রাজ্যে পালাবদলের আগেই সুশান্ত মণ্ডল নামে জনৈক এক ব্যক্তি নির্মাণ নকশা ছাড়া এই পাঁচতলা ভবন তৈরি করা হয়েছে বলে জেলা পরিষদে অভিযোগ করেন। আদালতের দ্বারস্থ হন। যার কারণে তাঁকেও নানা অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয়েছিল বলে এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন। সেই সময় যাবতীয় অভিযোগের বিষয়টি প্রভাব খাটিয়ে ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হয়।
পালাবদলের পর জেলা পরিষদে ফের সুশান্ত মণ্ডলের অভিযোগ খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয় এবং নোটিস পাঠানো শুরু করেন জেলা পরিষদের কর্তারা। গত ৩০ জুন দক্ষিণ ২৪ পরগনা প্রশাসনের তরফে নোটিস পাঠানো হয় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়কে। লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডসের ডিরেক্টর হিসাবে অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়কে নোটিস পাঠানো হয়। কারণ, এই সম্পত্তিও লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ডসের নামে। একইসঙ্গে জেলা পরিষদের তরফে নোটিস পাঠানো হয় সুশান্ত মণ্ডল এবং মতিউর রহমান মল্লিককে।
১৫ জুলাই দুপুর ২টোর সময় হাজির হতে বলা হয়েছিল অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত সব পক্ষকেই। নোটিসে জানানো হয়েছিল, সুশান্তের অভিযোগের ভিত্তিতে সকলকে তলব করা হচ্ছে। সব পক্ষকে নিজেদের দাবি কিংবা অভিযোগের সপক্ষে প্রয়োজনীয় নথি-প্রমাণ নিয়ে যেতেও বলা হয়েছিল। কিন্তু নোটিস পেয়েও নির্দিষ্ট দিনে, অর্থাৎ গত বুধবার কার্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে হাজিরা দেননি অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়।
এরপরই ফের জেলা পরিষদের তরফে অমিত বন্দ্যোপাধ্যায়কে নোটিস দিয়ে জানানো হয়, আমতলার এই সুবিশাল কার্যালয় ভেঙে ফেলা হবে। সেই মতো শনিবার সকাল থেকে সম্পূর্ণ অ্যাকশনে নামে জেলা পরিষদ এবং জেলা ভূমি রাজস্ব দফতর। এদিন কার্যালয়টি ভাঙা শুরু হতেই জড়ো হতে শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরা একের পর এক অভিযোগ তুলে সরব হন।
আমতলার অভিষেকের কার্যালয় ভাঙা নিয়ে বিজেপি সাংসদ সুকান্ত মজুমদার বলেন, “আগে শাসকের আইন চলত। রাজ্যকে নিজেদের জমিদারির অংশ ভাবতেন। সেজন্য অবৈধ নির্মাণ হয়েছে। এখনের আইনের শাসন চলছে। সেজন্য অবৈধ নির্মাণ ভাঙা হচ্ছে।” যদিও তাঁর কার্যালয় ভাঙা নিয়ে অভিষেক বর্তমান শাসকদলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় এসব করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হবেন বলে জানিয়েছেন।
