বঙ্গযুদ্ধ: চতুর্থ দফায় ভাগ্য পরীক্ষায় একাধিক হেভিওয়েট, জানুন ৪৪ টি আসনের হালহকিকত

এই দফায় মোট ৪৪ টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। এর মধ্যে ১৪ টি আসন কলকাতা থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরে উত্তরবঙ্গে দুই জেলা কুচবিহার জলপাইগুড়ির অন্তর্গত। জলপাইগুড়ির পাঁচটি এবং কোচবিহারের নয়টি আসনে ভোট হবে।

বঙ্গযুদ্ধ: চতুর্থ দফায় ভাগ্য পরীক্ষায় একাধিক হেভিওয়েট, জানুন ৪৪ টি আসনের হালহকিকত
ছবি- টুইটার

রাত পোহালেই চতুর্থ দফার ভোট রাজ্যে। এই দফায় ৬০% নতুন প্রার্থীদের ময়দানে নামিয়েছে তৃণমূল। অন্যদিকে বিজেপির ভরসা রাজবংশী এবং তৃণমূলের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা। চতুর্থ দফায় আগামিকাল প্রথমবার উত্তরবঙ্গের বিধানসভা আসনগুলিতে ভোট হতে চলেছে। এই দফায় মোট ৪৪ টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। এর মধ্যে ১৪ টি আসন কলকাতা থেকে ৬০০ কিলোমিটার দূরে উত্তরবঙ্গে দুই জেলা কোচবিহার জলপাইগুড়ির অন্তর্গত। জলপাইগুড়ির পাঁচটি এবং কোচবিহারের নয়টি আসনে ভোট হবে। এ বাদে দক্ষিণবঙ্গের বেশ কয়েকটি আসনে ভোট রয়েছে। যার মধ্যে হাওড়ার নয়টি বিধানসভা, হুগলির ১০ টি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার ১১ টি বিধানসভা রয়েছে।

২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস এই ৪৪ টি আসনের মধ্যে ৩৯ টি আসনে জয়লাভ করেছিল। এর মধ্যে দু’টি আসন পেয়েছিল সিপিআইএম এবং বিজেপি, কংগ্রেস ও ফরওয়ার্ড ব্লক একটি করে আসন জিতেছিল। কিন্তু, এই সমস্ত সমীকরণ সম্পূর্ণভাবে উল্টে দিয়েছে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন। গত লোকসভা ভোটের ফলাফলের নিরিখে এই ৪৪ টি আসনের মধ্যে মাত্র ২৫ টি আসনে এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল, বাকি ১৯ টি আসনেই এগিয়ে বিজেপি।

TV9 election intelligence and research wing এই আসনগুলি নিয়ে বিশ্লেষণ চালিয়ে যে তথ্য তুলে এনেছে তাতে স্পষ্ট, এখানে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে গত ১০ বছরের শাসনকালে যে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া তৈরি হয়েছে, তার মুখোমুখি হতে হবে।

একুশের নির্বাচনে কোচবিহার জেলার ৯ আসনের মধ্যে ৬ টি আসনের প্রার্থী এ বার বদলে ফেলেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের ফলাফল অনুযায়ী এই জেলার নয়টি বিধানসভা আসনের মধ্যে সাতটি আসনে পিছিয়ে রয়েছে তৃণমূল। একইভাবে জলপাইগুড়ি জেলার পাঁচটি আসনেও পিছিয়ে রয়েছে তৃণমূল। এখানেও প্রার্থী বদলের ফর্মুলা অনুসরণ করে পাঁচটি বিধানসভা আসনের চারজন নতুন প্রার্থীকে নামানো হয়েছে।

অন্যদিকে, গত লোকসভা ভোটের হিসেবে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ১১ টি আসনেই তৃণমূল এগিয়ে ছিল। কিন্তু এরমধ্যে পাঁচজন প্রার্থীকে বদলে ফেলা হয়েছে। হাওড়ার পরিস্থিতিও অনেকটা একই রকম। এই জেলায় সাতজন প্রার্থী বদলে ফেলেছেন মমতা। যদিও হাওড়ায় গত লোকসভা ভোটের হার অবশ্য তৃণমূলের জন্য স্বস্তিদায়ক। আগামী ১০ এপ্রিল হতে চলা চতুর্থ দফার ভোটে হাওড়া নয়টি বিধানসভা আসনের মধ্যে আটটি আসনে এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল। কিন্তু হুগলির ক্ষেত্রে ১০ টি আসনের মধ্যে মাত্র ৪ টি আসনে এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল। এই জেলাতেও ৫ প্রার্থী বদলে ফেলেছেন মমতা। মূলত প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার বিরুদ্ধে লড়তে মোট ৪৪ টি আসনের মধ্যে ২৭ জন প্রার্থীকে বদলে ফেলেছেন তৃণমূল নেত্রী।

এ বারে নজর দেওয়া যাক চতুর্থ দফার কারা প্রধান চর্চিত মুখ হতে চলেছেন। এই তালিকায় তৃণমূলের পক্ষ থেকে রয়েছেন কোচবিহার জেলার দিনহাটা বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী উদয়ন গুহ, দক্ষিণ ২৪ পরগনার টালিগঞ্জের বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, বেহালা পশ্চিমের প্রার্থী তথা রাজ্যের আরেক মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়, মধ্য হাওড়া আসনের প্রার্থী তথা মন্ত্রী অরূপ রায়। এ ছাড়াও হাওড়া জেলার শিবপুর কেন্দ্রের প্রার্থী তথা প্রাক্তন ক্রিকেটার মনোজ তিওয়ারি, এবং সিঙ্গুর আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম সঙ্গী বেচারাম মান্না, যিনি সিঙ্গুর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী হয়েছেন।

অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে যে বড় নামগুলি চতুর্থ দফা নির্বাচনে ভাগ্য পরীক্ষায় নামবেন তাঁরা হলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়, যিনি টালিগঞ্জ থেকে লড়বেন। এ ছাড়াও সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায় লড়বেন চুঁচুড়া থেকে, সাংসদ নিশীথ প্রামানিক লড়বেন দিনহাটা থেকে, রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় গেরুয়া জার্সিতে লড়বেন ডোমজুড় থেকে, চণ্ডীতলা বিধানসভা থেকে লড়বেন অভিনেতা যশ দাশগুপ্ত, যাদবপুর থেকে লড়বেন রিঙ্কু নস্কর, এবং বালি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে লড়বেন অনেক প্রাক্তন তৃণমূলী বৈশালী ডালমিয়া।

সংযুক্ত মোর্চার পক্ষ থেকেও রাশভারী কিছু নাম চতুর্থ দফায় ভাগ্য পরীক্ষার নামবে। যাঁদের মধ্যে অন্যতম মহম্মদ প্রাক্তন সাংসদ সেলিম যিনি চণ্ডীতলা থেকে লড়বেন। বালি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে লড়বেন দীপ্সিতা ধর, যাদবপুর থেকে লড়বেন সুজন চক্রবর্তী, চাঁপদানি থেকে লড়বেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নান, ভাঙ্গড় বিধানসভা থেকে লড়বেন আব্বাস সিদ্দিকির ভাই নওশাদ সিদ্দিকি ও আলিপুরদুয়ার থেকে লড়বেন কংগ্রেসের দেবপ্রসাদ রায়।

চতুর্থ দফায় যে ৪৪ টি আসনে বিধানসভা ভোট হবে তার মধ্যে সংখ্যালঘু অর্থাৎ মুসলিম ভোটারের হার প্রায় ২০%, এসসি ২৪% এবং এসটি ৪%। ৪৪ টি আসনের মধ্যে ১৮ টি আসনে মুসলিম ভোটারদের হার ২০ শতাংশের বেশি এবং দু’টি আসনে রাজবংশী ভোটারের সংখ্যা ২০ শতাংশের বেশি। এ বাদে তিনটি আসনে চা শ্রমিক ভোটারদের সংখ্যা ২০ শতাংশের বেশি।

উত্তরবঙ্গে মূলত রাজবংশী এবং চা শ্রমিকের ভোটের মেরুকরণের উপর ভরসা করছে বিজেপি। অন্যদিকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাগুলিতে যেখানে মুসলিমদের আধিক্য বেশি সেখানে আব্বাস সিদ্দিকি তৃণমূলের সংখ্যালঘু ভোটে ভাগ বসাতে পারলে তা বিজেপির জন্য লাভজনক হতে পারে। বাস্তবেও এমনটাই হবে বলে আশা করছে বিজেপি।

আরও পড়ুন: তৃণমূলকে ভোট দিলেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১০০০ টাকা!

চতুর্থ দফায় দক্ষিণবঙ্গের যে আসনগুলিতে ভোট হতে চলেছে সেখানে প্রত্যেকটি জনসভায় বেছে বেছে আমফান দুর্নীতি নিয়ে সরব হচ্ছে বিজেপি। অন্যদিকে হাওড়া জেলায় যেহেতু হিন্দি ভাষাভাষী ভোটারদের একটা বড় অংশের বসবাস, ফলে সেখান থেকেও কিছুটা লাভের আশায় রয়েছে গেরুয়া শিবির।

এ বাদে আরো কয়েকটি আসনে জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করা হয়েছে বিজেপির পক্ষ থেকে। যাদবপুর বিধানসভা কেন্দ্র যা লাল দুর্গ হিসেবে পরিচিত, সেখানে সেই দুর্গে ফাটল ধরাতে বিজেপি প্রাক্তন বামপন্থী নেত্রী রিঙ্কু নস্করকে প্রার্থী করেছে। যিনি সিপিএমের টিকিটেই লোকসভা নির্বাচন লড়েছিলেন ২০১৪ সালে। যদিও সেই নির্বাচনে হেরে গিয়ে ২০১৫ সালে কলকাতা পুরসভার নির্বাচনে জয়লাভ করেন রিঙ্কু। সম্প্রতি বিজেপিতে সামিল হন তিনি।

তবে বাংলার শাসক দলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার সম্মুখীন হওয়া। ঠিক যে কারণে ৬০ শতাংশের বেশি আসনে নতুন মুখদের প্রার্থী হিসেবে আনা হয়েছে। বেশ কয়েকটি আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল আবার পুরোপুরি নির্ভর করছে সংখ্যালঘু ভোটের উপর। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী এবং চা শ্রমিকদের মন পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে শাসকদলের পক্ষ থেকে। ইতিমধ্যেই চা শ্রমিকদের ঘর বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তৃণমূল।

আরও পড়ুন: কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে মন্তব্য কেন? জবাব চেয়ে ফের মমতাকে নোটিস কমিশনের

বিজেপির রাজবংশী সমাজকে কাছে টানতে কেন্দ্রীয় বাহিনীতে ‘নারায়ণী ব্যাটালিয়ন’ তৈরির কথা বলেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে ‘নারায়ণী ব্যাটালিয়ন’ তৈরির কথা বলেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অসমের রাজবংশী নেতা অনন্ত মহারাজের সঙ্গে সম্প্রতি দেখা করেন এবং দিনহাটা বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য রাজবংশী সম্প্রদায়ের নেতা তথা সাংসদ নিশীথ প্রামাণিককে প্রার্থী করেছেন।

অন্যদিকে বাম, কংগ্রেস, আইএসএফ-এর সংযুক্ত মোর্চা দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং হুগলিতে বিজেপি ও তৃণমূলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জোটসঙ্গীদের পক্ষ থেকে কয়েকটি আসনে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে হেভিওয়েটদের প্রার্থী করে। যার মধ্যে রয়েছে যাদবপুর, ভাঙ্গড়, আলিপুরদুয়ার, কসবা, টালিগঞ্জ, বেহালা পশ্চিম, চাঁপদানি, চণ্ডীতলা, বালির মতো বিধানসভা কেন্দ্র। সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থীরা দুর্নীতি, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধির মত বিষয়গুলিকে সামনে রেখে বিজেপি ও তৃণমূলের বিরোধিতা করছে। ভোটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে শেষ পর্যন্ত যা উঠে আসছে তাতে পরিষ্কার যে হুগলি, হাওড়া এবং কোচবিহার জেলায় টক্কর হবে সেয়ানে সেয়ানে। অন্যদিকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং জলপাইগুড়ি জেলায় তৃণমূলে এগিয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

আরও পড়ুন: কীভাবে মমতার পায়ে চোট? জল গড়াল সর্বোচ্চ আদালতে

Click on your DTH Provider to Add TV9 Bangla