বিশ্লেষণ: মেয়েদের পায়ে বেড়ি দিতেই কি ‘শরিয়ত’! কেন এত ভরসা তালিবানের?

TV9 Explained: সরকার গঠনের কাজ শুরুর পর থেকেই একের পর এক ফতেয়ায় উল্টো চিত্রটাই ধরা পড়েছে। অধিকাংশ অফিস থেকেই মহিলা কর্মচারীদের বের করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্য়ালয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা ফতেয়া জারি করা হয়।

বিশ্লেষণ: মেয়েদের পায়ে বেড়ি দিতেই কি 'শরিয়ত'! কেন এত ভরসা তালিবানের?
শরিয়ত আইন ও তালিবান, অলঙ্করণ: অভীক দেবনাথ

কাবুল:  আফগানিস্তানে (Afganistan) সদ্যই নতুন সরকার ঘোষণা করেছে তালিবান। সরকার ঘোষণা করার পরেই তালিব প্রধান হিবাতুল্লা আখুন্দজাজা জনিয়ে দিয়েছেন, দেশে শরিয়তি আইন প্রতিষ্ঠা করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।

একটি বিবৃতিতে আখুন্দজাজা বলেন, “আমাদের ২০ বছরের সংগ্রামের দুটি লক্ষ্য ছিল। প্রথমত, বিদেশি শাসনমুক্ত করে স্বাধীন আফগানিস্তানের আত্মপ্রকাশ। দ্বিতীয়ত, দেশে স্থায়ী ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা। এই নীতি মেনেই সরকার চলবে। সব সিদ্ধান্ত শরিয়তি আইন মেনেই নেওয়া হবে।”

১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে তালিবানি শাসন শরিয়তি আইন (Sharia Law) মেনেই চলত। এ বারেও তালিবান সরকার গঠনের প্রস্তুতি পর্বেই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল আগের নিয়মেই চলবে তারা। সে আশঙ্কা সত্যি হল।

প্রশ্ন ওঠে কী এই শরিয়ত আইন?

‘শরিযত’ শব্দটির বুত্‍পত্তি ‘শারি আহ্’ বা ‘শারি আত’ থেকে, ইসলামি পরিভাষায় যার অর্থ কর্মপদ্ধতি। ইসলামি পরিভাষাকোষ অনুযায়ী, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এবং নবি মুহাম্মাদ যেসব আদেশ-নিষেধ, নিয়ম-নীতি ও পথনির্দেশনা মুসলমানদের জন্য প্রদান করেছেন, তার সমষ্টিই হচ্ছে শরিয়ত।

এটি ইসলাম ধর্মের নিয়ম-কানুন হতে উৎসরিত, প্রধানত কোরান ও হাদিস থেকে, যা ইসলামের দৃষ্টিতে যথাক্রমে আল্লাহ ও মহম্মদের দিকনির্দেশনার উৎস। আরবিতে, স্রষ্টার অমোঘ স্বর্গীয় আইন বোঝাতে শরিয়ত শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

Shariyah-law-afganistan gfx

শরিয়ত কী? অলঙ্করণ: অভীক দেবনাথ

কোরানের ‘সুরাতুল জাসিয়া’-য় শরিয়ত সম্পর্কে ‘আল্লাহর’ উক্তিটি এরকম—

অতঃপর আমি আপনাকে (মহম্মদকে) কর্মপদ্ধতির উপর (শরিয়তের উপর) প্রতিষ্ঠিত করেছি। সুতরাং আপনি তাই অনুসরণ করুন। আপনি মূর্খদের খেয়ালখুশির দ্বারা অনুসৃত হবেন না।’

কোরানে আরও বলা হচ্ছে, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পরিপূর্ণ করলাম (অর্থাৎ শরিয়তে আল্লাহ কর্তৃক সকল বিষয়বস্তু সংযোজন সম্পন্ন হল), তোমাদের উপর আমার অনুগ্রহ পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের (একমাত্র) ধর্ম হিসাবে মনোনীত করলাম।”

বলা হয়, শরিয়তের প্রধান ও মৌলিক উত্‍স দুটি। যথা-‘আল্লাহর’ বাণী কোরান এবং মহম্মদের বাণী ও কর্ম সুন্নাহ অর্থাত্‍ হাদিস। পরবর্তীকালে, শরিয়তের গ্রহণীয়তা ও স্বীকৃতি গৃহীত হয় আরও দুইটি ক্ষেত্রে। একটি ইজ়মা, অন্যটি কিয়াস।

মুসলিমদের কাছে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান লাভের একমাত্র উত্‍স হচ্ছে শরিয়ত। এই ইসলামিক দর্শনে যে পাঁচটি শব্দবন্ধ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হল,

হালাল– হালাল একটি আরবি শব্দ যার অর্থ হচ্ছে: বৈধ, উপকারী ও কল্যাণ ইত্যাদি। মানুষের জন্য যা কিছু উপকারী ও কল্যাণময় সেই সকল কাজ ও বস্তুকে ‘আল্লাহ’ মানুষের জন্য হালাল বা বৈধ করে দিয়েছেন। যেমন: নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, ইত্যাদি। অর্থাৎ পবিত্র কোরান ও সুন্নাহর ওপর ভিত্তি করে যে সব বিষয়কে ইসলামে বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে, ইসলামি পরিভাষায় তাই হালাল।

হারাম– ইসলামী পরিভাষায় হারাম বলতে মূলত মন্দ কর্মকে বোঝানো হয়েছে। কতিপয় কাজ হারাম বলে চিহ্নিত। শরিয়া কর্তৃক শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া ইসলাম অনুযায়ী হারামে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য মৃত্যু পরবর্তী সময়ে শাস্তির কথা বলা আছে। হারাম কাজের মধ্যে রয়েছে মানুষ হত্যা, চুরি-ডাকাতি, মদ্যপান, সুদের লেনদেন, ঘুষ আদানপ্রদান, ধর্ষণ, ব্যভিচার, মৃত পশুপাখির মাংস খাওয়া প্রভৃতি।

ফরজ– সরাসরি মুসলিম সমাজের সাথে সম্পৃক্ত, একটি আরবি শব্দ যা অবশ্য কর্তব্য কোন ধর্মীয় আচারকে নির্দেশ করে। ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা আন-নূূূর এর ১নং আয়াতে ব্যাবহারের কারণে, ফরজকে একটি কুুুরআনিক শব্দেও অভিহিত করা হয়।

ওয়াজিব– মহম্মদের মুখ নিঃসৃত এই শব্দের অর্থ কর্তব্য। কিছু ইসলামি বিশেষজ্ঞদের মতে, যা করার আদেশ জন্নী দলীল তথা ফরজের তুলনায় দুর্বল দলীল দ্বারা প্রমাণিত, তাকে ওয়াজিব বলে। ফরজের পরই ওয়াজিব এর স্থান।

তত্ত্ব থেকে তথ্যে নজর

কথায় রয়েছে ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’। যদিও, সে ধর্ম মানব ধর্ম, সততার ধর্ম, তবুও ‘ধর্ম’ বা Religion- এই বিশেষ কাল্টটি বারবার কেবল পরিবর্তিত হয়েছে এমন নয়, পরিবর্ধিতও হয়েছে।

হিন্দু ধর্ম থেকে শুরু করে পৃথিবীর যে-কোনও ধর্মবিশ্বাসই এমন একাধিক কাহিনীর সংগ্রাহক যেখানে স্পষ্ট কিছু শ্রেণির মানুষের সুবিধা চরিতার্থে কীভাবে তা বদলে বদলে গিয়েছে। সেখানে ধর্মের দ্বারা সৃষ্ট, বা ইসলাম ধর্ম নির্ভর শরিয়ত আইন যে এক ব্যতিক্রম নয় তা স্পষ্ট।

এ প্রসঙ্গে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আব্দুল মতিন বলেন, “গোটা পৃথিবীতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বহু আগে এই শরিয়ত বা শরিয়তি আইন তৈরি হয়। সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বারবার ইসলাম সেই আইনকে নিজেদের মতো আত্মস্থ করেছে, বদলেছে, গ্রহণ বা বর্জন করেছে। কোরান বা হাদিসে বর্ণিত শরিয়ত আইন-ই যে বলবত্‍ হয়েছে এমনটা বলা চলে না।”

তালিবান আফগানিস্তান সরকার প্রতিষ্ঠার পরেই যে আতঙ্ক গ্রাস করেছে তা হল শরিয়তি আইনের জেরে আফগানবাসীর বাক স্বাধীনতা, স্বাধিকার ক্ষুণ্ণ হবে। ইতিমধ্য়েই, রুক্ষ পাহাড়ের দেশের একাধিক ছবিও ভাইরাল যেখানে দেখা গিয়েছে তালিবান কীভাবে কোন অপরাধে শাস্তি দেয়।

তালিবানের ‘আইন’

ক. তৈরি হবে প্রমোশন অফ ভার্চু এবং প্রিভেনশন অফ ভাইস মন্ত্রক

খ. অ-ইসলামিক জীবনযাপনের ওপর হ্রাস টানবে এই মন্ত্রক

গ. গানবাজনা এবং টেলিভিশনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি

ঘ. পুরুষদের দাড়ি ছেট হলে হবে জেল

ঙ. পরকীয়া সম্পর্কের জন্য শাস্তি পরিবারের সামনে বেধড়ক মার।

চ. প্রাক ইসলামি পশতুন বিধি অনুযায়ী রাস্তায় ন্যায় প্রণয়ন ।

ছ. শরিয়া আইন-এর ওয়াহাবি ইসলাম মোতাবেক বিচারধারা।

জ. চুরি করার অপরাধে হাত কেটে নেওয়া।

Shariyah-law-taliban-gfx

তালিবানের শরিয়ত আইন, অলঙ্করণ: অভীক দেবনাথ

মহিলাদের জন্য আরও কঠোর নিয়ম

ক. মাথা থেকে পা অবধি মোড়া থাকতে হলে বোরখায়।

খ. ৮ বছর বয়স থেকে বোরখা বাধ্যতামূলক।

গ.মহিলারা চাকরি করতে পারবেন না।

ঘ.পুরুষ আত্মীয় ছাড়া বাড়ি থেকে বেরনো যাবে না।

ঙ. না মানলে শাস্তি জুটবে বেত্রাঘাত অথবা পাথর ছুড়ে মারা বা পাথরে ফেলে মারধর।

এ প্রসঙ্গে, সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের ‘কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ’ বইটির কথা মাথায় আসে। সুস্মিতা তালিবদের শাসনে নিজের জীবনের জীবন্ত দলিল তুলে ধরেছেন সেই বইতে। উল্লেখ করেছেন, কীভাবে দিনের পর দিন তালিবানের প্রতিরোধ করায় অত্যাচারিত হয়েছেন। তালিবদের হাতে টানা ১১ দিন ধর্ষিত হওয়ার পর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় সুস্মিতার শরীর।

এই পাশবিক হিংস্রতা কি শরিয়ত আইনের অন্তর্ভুক্ত? কোন আইনে প্রতিবাদীদের কণ্ঠস্বর এভাবে রুদ্ধ করে দেওয়ার নিদান রয়েছে?

এ প্রসঙ্গে, গবেষক মতিন বলেন, “শরিয়ত আইনের সবটাই খারাপ এমনটা বলা যায় না। শরিয়ত আইনে অন্য়ায় করলে বা ন্যায়ধর্ম থেকে বিচ্যুত হলে শাস্তির নিদান রয়েছে। কিন্তু তা কখনোই প্রাণঘাতী নয়। পাথর মারা বা রাস্তায় বেত্রাঘাত করার মতো শাস্তির নিদান প্রস্তরযুগের চিন্তাভাবনা। তারসঙ্গে একুশ শতককে মিলিয়ে দিলে হবে না।”

মতিন আরও বলছেন, “আফগানিস্তানের হাজ়ারা, আজি, পশতুনের মতো আদি ও অভিজাত গোষ্ঠীগুলি কিন্তু শরিয়ত আইনকে নিজেদের মতো গড়েপিটে নিয়েছেন। এমনকী, তাঁদের ন্যায়ধর্মে বা বিচারে কোথাও এমন কোনও পাশবিক শাস্তি বা নিদানের ব্যবহার নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিবর্তন স্বাভাবিক।”

taliban-fighters living on Donations of Locals

ফাইল চিত্র।

ভারতেও কি শরিয়ত আইনে এমন কঠোর বিধি নিষেধ জারি রয়েছে?

এ প্রসঙ্গে গবেষকের মন্তব্য়, “কোরান বা হাদিসে এই ধরনের কোনও শাস্তির কথা উল্লেখ নেই। ৮ বছর বয়স থেকেই মেয়ে হলে তাঁকে বোরখায় মুড়ে থাকতে হবে এমন কোনও নিদান কোরান বা হাদিস দেয়নি। বোরখা পরা বা না পরা কোনও নারীর নিজের ইচ্ছাধীন। মুশকিল হল, ধর্মতন্ত্র বরাবরই এক বিশেষ শ্রেণির সুবিধায় বদলে গিয়েছে। বিশেষ করে ধর্মের ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষতান্ত্রিকতার প্রভাব প্রকট।”

তিনি আরও বলেন, “কোরান বা হাদিসে মহিলাদের শালীনতার কথা বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে, ইসলামিক সমাজ নিজের মতো করে সেই শালীনতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে। কেউ বলেন, কেবল মাথার চুল দেখা যেতে পারে, কেউ বলেন শুধু চোখ দেখা যেতে পারে। কেউ বা বলেন বোরখাতে পুরো দেহ মুড়ে রাখতে হবে। এটা অনেকটাই নির্ভর করে সেই দেশের সামাজিক পরিকাঠামোর উপর।”

প্রসঙ্গত, শরিয়তি আইনের জেরেই ইসলাম সমাজে কখনও তালাক হয়ে যেত মুখে মুখে, কখনও বা চিঠিতে। ইসলামি রেওয়াজ অনুযায়ী, বিয়ের সময়ে স্বামীর স্ত্রীকে মেহের বা অর্থ দেওয়ার কথা থাকলেও, পরে তা হয় নাম কা ওয়াস্তে। অথচ সেই টাকাই একটা সময়ে স্ত্রীর নিরাপত্তা হিসেবে বিচার করা হত। তাই মুসলিম মেয়েদের আইনি নিরাপত্তার জন্য শরিয়তের মধ্য়ে তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট বিধি তৈরির দাবি করে ‘ভারতীয় মুসলিম মহিলা সংগঠন’। ২০১৯-এর জুলাই মাসে মুসলিম মহিলাদের অধিকার রক্ষার স্বার্থে তাৎক্ষণিক তিন তালাককে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা ‘প্রোটেকশন অফ রাইটস অন ম্যারেজ’ নামে বৈধতা পেয়েছে। সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্য়সভায় পাস হওয়া সেই বিলে শিলমোহর দিয়েছেন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ।

TEEN TALAQ LAW

তিন তালাক আইন, ফাইল ছবি

কিন্তু অধুনা তালিব ডেরা আফগানিস্তানে কি এই আইন প্রণয়ন হতে পারে?

সেখানে মহিলাদের পক্ষে আইন প্রণয়ন তো দূরস্ত, জীবনধারণের স্বাধিকার টুকুও ছিনিয়ে নেওয়া হবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলের। অন্তত, সাম্প্রতিককাল থেকে ইতিহাস তাই বলছে।

মুখে নারী শিক্ষা ও স্বাধীনতার কথা বললেও সরকারে মহিলাদের সামিল করতে রাজি নয় তালিবান। বৃহস্পতিবার তালিবানের এক মুখপাত্র সাফ জানিয়ে দিলেন, মহিলাদের সন্তান জন্ম দেওয়ার কাজের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।

মঙ্গলবার রাতে সরকার গঠনের ঘোষণা করার পরই দেখা যায়, মন্ত্রিসভায় কোনও মহিলা নেই। সমস্ত সরকারি পদেই স্থান পেয়েছেন কেবল পুরুষরাই। এরপরই প্রতিবাদে পথে নামেন আফগান মহিলারা। কাবুল, কান্দাহার, হেরাট সহ একাধিক জায়গায় সরকার বিরোধী মিছিল বের হয়।

মহিলাদের এই দাবি ও আন্দোলনের প্রসঙ্গেই বৃহস্পতিবার টোলো নিউজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তালিবান মুখপাত্র সইদ জেকরুল্লাহ হাশিমি বলেন, “একজন মহিলা মন্ত্রী হতে পারেন না। যেই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না, তা মহিলাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে না।”

তিনি আরও যোগ করে বলেন, “মন্ত্রিসভায় মহিলাদের থাকা আবশ্যক নয়, মহিলাদের সন্তানধারণের কাজেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।” দেশের বিভিন্ন স্থানে মহিলাদের যে মিছিল বের হচ্ছে, সেই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “কয়েকজন মহিলা আন্দোলনকারী গোটা আফগানিস্তানের মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।”

সরকার গঠনের কাজ শুরুর পর থেকেই একের পর এক ফতেয়ায় উল্টো চিত্রটাই ধরা পড়েছে। অধিকাংশ অফিস থেকেই মহিলা কর্মচারীদের বের করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্য়ালয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা ফতেয়া জারি করা হয়। ফতেয়ায় বলা হয়েছে, মহিলারা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারলেও তারা ছাত্রদের সঙ্গে একই কক্ষে বসতে পারবেন না। স্বামী বা রক্তের সম্পর্ক রয়েছে, এমন কোনও পুরুষ সঙ্গীর তত্বাবধানেই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন।

ছাত্রীদের জন্য আলাদা ক্লাসরুম ও মহিলা শিক্ষকের ব্যবস্থা করতেব হবে। যদি আলাদা ক্লাসরুমের ব্যবস্থা না করা যায়, তবে ১৫ জনের বেশি পড়ুয়া থাকলেও মাঝখানে পর্দা টাঙিয়ে দিতে হবে। মহিলাদের ক্লাসও ৫ মিনিট আগে শেষ করতে হবে, যাতে বেরনোর সময় পুরুষদের সঙ্গে দেখা না হয়। মহিলাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার জন্য আবায়া ও নিকাব পরতে হবে।

সাংস্কৃতিক কমিশনের ডেপুটি প্রধান আহমাদুল্লাহ ওয়াসিকও নয়া নির্দেশিকা ঘোষণা করে বলেছেন, “মহিলাদের খেলাধুলোর কোনও প্রয়োজন নেই। এতে শরীর প্রদর্শন হয়, যা আইন বিরুদ্ধ”।

মঙ্গলবারই বহু আফগান মহিলা সহ অন্তত ৭০ জন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ দেখান। তাদের হাতে ছিল ব্যানার, ইসলামাবাদ তথা আইএসআই-এর বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিলেন তাঁরা। সেই মিছিলে গুলি চালায় তালিবরা। বুধবারও মিছিলে অংশগ্রহণকারী মহিলাদের খুঁজে বের করে বেত ও চাবুক দিয়ে আঘাত করতে দেখা যায়।

ইতিহাস কী বলছে?

১৯৯৫

২২৫ মহিলাকে একত্রে বেত্রাঘাত
কারণ তাঁরা তালিবানের পোশাক বিধি মানেননি

১৯৯৮

৮ বছরের উপরের মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ
কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে মহিলাদের পড়াশোনা থেমে যায়

মে, ২০০১

বিদেশি টাকায় চলা কাবুলের হাসপাতাল বন্ধ
কারণ মহিলা এবং পুরুষ কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করতেন

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০১

পঞ্চম শতাব্দী খ্রিস্টাব্দ-তে তৈরি বামিয়ানের বুদ্ধ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ভারী গোলাবর্ষণ করে একমাস সময় নিয়ে ভাঙা হয় সেই বুদ্ধ। পাকিস্তান থেকে ভারত, কারুর কথা শোনেনি তালিবান।

Shariyah-law-web-3 GFX

ইতিহাস কী বলছে,? অলঙ্করণ: অভীক দেবনাথ

ইতিহাস থেকে সাম্প্রতিককাল যখন এত অনভিপ্রেত তখন কি তালিবানে আস্থা রাখা সম্ভব? বিশেষ করে বরাবর যে শরিয়ত আইনের দোহাই দিয়ে তালিব গোষ্ঠীক রাজ চলছে আফগানিস্তানে, সেখানে পদে পদে অনিশ্চয়তা ও জীবন-মৃত্য়ু দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হতে হবে আফগানবাসীকে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

তালিবান সরকার নিয়ে গঠন নিয়ে সম্প্রতি মুখ খুলেছেন জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি। তিনি বলেছেন, “তালিবানের উচিত আসল শরিয়া আইন অনুসরণ করা, যেখানে নারী-পুরুষ সকলেরই অধিকার সুনিশ্চিত হবে।”

পিডিপি নেত্রীর কথায়, “তালিবানের হাতে দেশশাসনের ঘটনাটি সত্য়ি হয়ে উঠেছে। আগের তালিব সরকারের ভাবমূর্তি ছিল মানবাধিকার-বিরোধী। যদি ওরা আফগানিস্তান শাসন করতে চায়, তবে কোরানে উল্লেখ আসল শরিয়া আইন অনুসরণ করতে হবে যেখানে নারী, শিশু ও বয়স্কদের অধিকার সুনিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।”

যদি মদিনার শাসক মহম্মদ যেভাবে দেশ শাসন করতেন, তার উদাহরণ অনুসরণ করেব চলে তালিবান, তবে গোটা বিশ্বের তা নজির গড়বে, এমনটাই জানান জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, “যদি আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে বাণিজ্য করতে বা নতুন সম্পর্ক স্থাপন করতে চায় তালিবান, তবে তাদের ইসলাম ও শরিয়া আইনের কট্টরপন্থী দিকগুলি না তুলে ধরাই ভাল। যদি তা অনুসরণ না করা হয়, তবে আফগানবাসীদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।”

মুফতির সমসুরেই কথা বলেছেন, গবেষক আবদুল মতিন। তাঁর স্পষ্ট দাবি, তালিবান শাসন, তালিবান নিয়োজিত শরিয়ত আইন ভাল না মন্দ তা স্পষ্ট হবে তালিব গোষ্ঠীর নিজস্ব উদারতা ও চিন্তার প্রসারের উপর। পৃথিবীতে এমন বহু দেশ রয়েছে, এমনকী প্রথম বিশ্বের একাধিক দেশে যে ইসলাম গোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন তাঁদের নিয়োজিত শরিয়ত আইনের সঙ্গে কিন্তু প্রস্তর যুগের সেই চরম শাস্তি প্রদায়ক শরিয়তির কোনও মিল নেই। সময়ের সঙ্গে তা বদলে গিয়েছে। এমনকী, ভারতবর্ষেও এ হেন কোনও কঠোর বিধি নিষেধ নেই। যদিও, সংখ্যালঘুদের জন্য দেশে আলাদা আইন প্রণিত হয়েছে। কিন্তু সেই আইন স্বাধিকার ভঙ্গের নয় বলেই দাবি করেছেন গবেষক।

তালিবান শাসন আফগানিস্তানের জন্য কি তাহলে ভাল হল?

এ প্রসঙ্গে গবেষক আব্দুল মতিন বলেন, “আফগানিস্তান কেমন ছিল, খারাপ ছিল না ভাল তাই হল সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। পরে কী হবে সেটা তো পরের বিষয়। আসলে ভাল বলতে ঠিক কী বোঝায়, তার মাপকাঠি কি তা স্পষ্ট রূপায়িত হওয়া প্রয়োজন।”

আফগানিস্তান ১৯২১ সালে স্বাধীনতা পাওয়ার পর দেখা গিয়েছে প্রথম বিশ্বের দেশের মাধ্য়মে পরিচালিত হয়েছে। তালিবান শাসন যে বিরোধের থেকে জন্ম নিয়েছে সেখানে মানবাধিকার ঠিক কতটা পূর্ণ হবে?

গবেষকের কথায়, “প্রত্যেক দেশের নিজের মানবাধিকার পালনে জাতীয় আইন রয়েছে। সেই আইন মেনেই কাজ করা উচিত। তবে, তালিবানের ক্ষেত্রে যেহেতু একটা বিরাট অসমর্থন রয়েছে, সেক্ষেত্রে ভোটপর্ব বিশেষ কাজ করতে পারে।”

ইসলামিক রাষ্ট্রে ভোটপর্ব ঠিক কতটা গুরুত্ব পায়?

সেক্ষেত্রে, গবেষক জানিয়েছেন, ইসলামিক রাষ্ট্র মানেই এমন নয় যে নির্বাচনে অনীহা রয়েছে। দুই ধরনের নির্বাচন একসঙ্গে কাজ করে। একটি জনমতের ভিত্তিতে, অন্যটি শরিয়তি আইনের ভিত্তিতে। ইরান-সহ একাধিক ইসলামিক রাষ্ট্রে নিয়ম এমনটাই।

আফগানিস্তানে প্রতিটি প্রদেশ এক-একটি সরকার চলত। ফলে, ঘানি সরকারের পক্ষে সংযোগ ও সমন্বয় স্থাপন হয়ে উঠছিল দুষ্কর। তাই দ্রুত সরকার পতন বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। সেখান তালিবান গোটা আফগান প্রদেশকেই দেখছে একটি একক রাষ্ট্র হিসেবে। ফলে তালিবানের একটি সামাজিক বৈধতা গৃহীত হয়েছে। পাশাপাশি, তালিবানদের উত্থানে সাহায্য করেছে বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাজার।

কুড়ি বছর আগের তালিবান বদল এনেছে ভাষায়ও। সম্মুখীন হচ্ছে সংবাদমাধ্য়মের। যা মূলত কূটনতিক চাল বলেই মনে করছেন গবেষক। এই ধরনের পদক্ষেপ করে আসলে তালিবান স্পষ্ট করতে চাইছে নিজের অস্তিত্ব। তবে সবটাই সময়ের উপর নির্ভরশীল বলেই মনে করছেন গবেষক আব্দুল মতিন।

আরও পড়ুন: Exclusive Manoj Jha: মমতা বড় নাম, তবে মুখের রাজনীতি চান না আরজেডি-র ‘ভাইরাল সাংসদ’ মনোজ ঝাঁ

আরও পড়ুন: Exclusive: ফের কি ফুল বদল? খবর শুনেই চটলেন চন্দনা

Read Full Article

Click on your DTH Provider to Add TV9 Bangla