
তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসেছেন নরেন্দ্র মোদী। তাঁর হাত ধরে ভারতের অর্থনীতি নতুন দিশা দেখবে, এমনই আশা সাধারণ মানুষের। আর সেই অর্থনীতির রূপরেখা কেমন হবে, তা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেল ২০২৪-এর সাধারণ বাজেটে। বাজেট পেশ করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। এই নিয়ে একটানা সপ্তমবার বাজেট পেশ করলেন তিনি, যা ভারতের ইতিহাসে অন্যতম রেকর্ড। কী কী বড় ঘোষণা হল, দেখে নিন একনজরে-
নতুন কর পরিকাঠামোয় বদল। ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বেতনের ক্ষেত্রে কোনও কর দিতে হবে না। ৩ থেকে ৭ লক্ষ বেতনের ক্ষেত্রে দিতে হবে ৫ শতাংশ বেতন, ৭ থেকে ১০ লক্ষে ১০ শতাংশ কর দিতে হবে।
২০২৪-২৫ আর্থিক বছরের লক্ষ্যমাত্রা কী, সেটাও উল্লেখ করে দিলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, বেশ কিছু ক্ষেত্রে শুল্কে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ওষুধ, চিকিৎসার সরঞ্জাম, এক্স রে মেশিন, মোবাইল ফোন, মোবাইল চার্জারে কমানো হচ্ছে শুল্ক। লিথিয়াম, কপার, কোবাল্টের মতো খনিজ পদার্থে তুলে নেওয়া হচ্ছে শুল্ক।
বিহারের মন্ত্রী দিলীপ জয়সওয়াল বলেন, “বিহারের জন্য এই ঘোষণা বিরোধীদের গালে সপাটে চড়। গঙ্গায় তৈরি হবে ব্রিজ, হাইওয়ে তৈরির জন্য দেওয়া হচ্ছে ২৬০০০ কোটি, খোলা হবে নতুন মেডিক্যাল কলেজ।”
পর্যটন প্রসঙ্গে বিশেষ ঘোষণা করা হল বাজেটে। সেখানেও গুরুত্ব পেল বিহার। বিষ্ণুপাদ ও মহাবোধি মন্দির করিডরের জন্য বিশেষ সাহায্য করবে কেন্দ্রীয় সরকার। তৈরি হবে কাশীর বিশ্বনাথ মন্দিরের মতো করিডর। এছাড়া বিহারের রাজগীরের কথা উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে উল্লেখ রাজগীর, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের কথা। এছাড়া ওড়িশার কথাও বলেছেন অর্থমন্ত্রী। সেখানে পর্যটনের উন্নতির জন্য আর্থিক সাহায্য করবে সরকার।
আবারও বিহারের কথা উল্লেখ করা হল বাজেটে। অর্থমন্ত্রী বলেন, “বিহারে বারবার বন্যা হয়। বন্যা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রকল্পে বরাদ্দ করা হবে ১১,৫০০ কোটি টাকা। অসমেও ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের জন্য দেওয়া হবে অর্থ সাহায্য। হিমাচল প্রদেশ ও হিমাচল প্রদেশে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণেও সাহায্য করবে সরকার।”
নির্মাণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ। অর্থমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। আগামী ৫ বছরেও সেই ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হবে। ১১১১১১১ কোটি টাকা ক্যাপিটাল এক্সপেনিচারে দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির ৩.৪ শতাংশ।
সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে বিশেষ যোজনার কথা উল্লেখ করলেন নির্মলা সীতারামন। তিনি উল্লেখ করেন, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে ১ কোটি বাড়িতে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্য পাওয়া যাবে। অন্তর্বর্তী বাজেটেই এ কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। এই স্কিমে ১.২৮ কোটি রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ও ১৪ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে।
বাজেটে ঘোষণা, আবাস যোজনার অধীনে ১ কোটি গরিব ও মধ্যবিত্তদের জন্য বাড়ি বানাতে ১০ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ। ঋণে দেওয়া হবে ভর্তুকি। এছাড়া জল সরবরাহের জন্য রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্মলা। তিনি আরও বলেন, “স্ট্যাম্প ডিউটি কমাতে হবে রাজ্য সরকারগুলিকে। আর মহিলারা কোনও সম্পত্তি কিনলে সেই খরচ কমাতে হবে আরও।”
অর্থমন্ত্রী জানান, আঞ্চলিক শিল্পীদের তৈরি প্রোডাক্ট বিদেশে বিক্রি করতে ই কমার্স এক্সপোর্ট হাব তৈরি করা হবে পিপিপি মোডে। এক ছাদের তলায় পণ্য বিক্রি ও রফতানি হবে। এছাড়া একটি বিশেষ স্কিম আনা হচ্ছে, যাক অধীনে আগামী ৫ বছরে ৫০০টি বড় সংস্থায় ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পাবেন ১ কোটি পড়ুয়া। ১২ মাস বা এক বছর ধরে হাতে-কলমে কাজ শিখতে পারবেন তাঁরা। প্রতি মাসে ৫০০০ টাকা দেওয়া হবে। সংস্থাগুলি যাতে সিএসআর ফান্ড থেকে ট্রেনিং-এর খরচ বহন করে, সে কথাই বলা হয়েছে বাজেটে।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এমএসএমই-র দিকে এবার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে মোদী সরকার। আনা হচ্ছে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম, যাতে মেশিন কেনার জন্য লোন নেওয়া যাবে। প্রত্যেক আবেদনকারীকে দেওয়া হবে গ্যারান্টি ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত গ্যারান্টি ফি। মুদ্রা লোন বাড়িয়ে ২০ লক্ষ টাকা করা হল।
বিহারের জন্য বিমানবন্দর তৈরির কথা ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া ১৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ দেওয়া হবে অন্ধ্রপ্রদেশকে। অন্ধ্রপ্রদেশের সড়ক পরিবহন পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য এবং শিল্প স্থাপনের জন্য আর্থিক সাহায্যের কথা উল্লেখ বাজেটে। জল, বিদ্যুৎ, রাস্তা ও রেলের উন্নতির জন্য অন্ধ্রকে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ প্যাকেজ।
পূর্বের রাজ্যগুলির উন্নতির জন্য বিশেষ স্কিমের কথা বললেন নির্মলা। সেই রাজ্যগুলির মধ্যে থাকবে বিহার, অন্ধ্র প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ। কলকাতা বিজনেস করিডরের কথাও উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী।
ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে প্রথম চাকরি পেলে ইনসেনটিভ দেওয়া হবে। ইপিএফও-র সঙ্গেই টাকা দেওয়া হবে কর্মী ও সংস্থাকে। অ্যাডিশনাল এমপ্লয়মেন্ট অর্থাৎ অতিরিক্ত নিয়োগ হলে সরকার প্রতি ৩০০০ টাকা করে প্রতি মাসে দেবে ইপিএফও-র সঙ্গে। ৫০ লক্ষ কর্মী এতে উপকৃত হবেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্যাকেজে তিনটি স্কিম আনা হচ্ছে কর্মসংস্থানের জন্য। সেখানে দেওয়া হবে ইনসেনটিভ। ইপিএফও-র ওপর নজর দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্ব দেওয়া হবে তাঁদের জন্য যাঁরা প্রথম চাকরি করছেন। নতুন চাকরিতে যোগ দিলে সব কর্মীকে এক মাসের বেতন দেওয়া হবে। তিনটি ইন্সটলমেন্টে দেওয়া হবে ওই বেতন। বহু চাকরিজীবী এতে উপকৃত হবেন।
অর্থমন্ত্রী বললেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিপিংয়র সমস্যার জেরে মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। সেখানেই ভারতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগোচ্ছে। ভারতের অর্থনীতির বৃদ্ধি হয়েছে। এবারের বাজেটে এবার বাজেটে ৯টি বিষয়ে ফোকাস করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী পদে বসার জন্য নরেন্দ্র মোদীকে শুরুতেই অভিনন্দন জানালেন নির্মলা সীতারামন। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী বাজেটে গরিব, মহিলা, যুব ও অন্নদাতাদের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছিল। আর এবার নজর দেওয়া হয়েছে কর্মসংস্থান, এমএসএমই ও মধ্যবিত্তদের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে।
শুরু হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক। প্রথামাফিক ক্যাবিনেট অনুমোদন দেওয়ার পরই পেশ হবে বাজেট।
নিয়ন্ত্রণে আসবে মূল্যবৃদ্ধি? কর্মসংস্থান বাড়তে তো? এই প্রশ্নই তুলছেন বিরোধীরা। কংগ্রেস সাংসদ প্রমোদ তিওয়ারি বলেন, “কৃষকের সমস্যা, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব নিয়ে কী বলবে কেন্দ্রীয় সরকার? ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প নিয়েও সরকারের কোনও পরিকল্পনা নেই। এই বাজেট কি হবে শুধুই মোদীর বন্ধুদের জন্য?”
সকাল ৯ টার পর রাষ্ট্রপতি ভবনে যান নির্মলা সীতারমন। বাজেট পেশের আগে প্রথা মাফিক রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করেন ও অনুমোদন নেন। এরপর সংসদে যান তিনি।
সকাল ১১ টায় বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তার আগেই অর্থমন্ত্রকের অফিসে পৌঁছলেন তিনি।
বয়স্কদের জন্য বড় ঘোষণা হতে পারে বাজেটে। লোকসভা নির্বাচনের সময়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বয়স্কদের জন্য ‘আয়ুষ্মান’ প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত করার কথা বলেছিলেন। এই বিষয়ে ঘোষণা করা পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ৭০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের আয়ুষ্মান প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। ফেব্রুয়ারির অন্তর্বর্তীকালীন বাজেটে প্রবীণদের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
বাজেট অধিবেশনে সরকারকে কোনঠাসা করতে এককাট্টা বিরোধীরা। বাজেট পেশ হওয়ার আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে সেই রণকৌশল। মঙ্গলবার সকালেই সংসদে বৈঠকে বসছে কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টি। রণকৌশল ঠিক করে দেবেন স্বয়ং কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। বাজেট পেশের পরেই সরকারকে আক্রমণের রণকৌশল চূড়ান্ত করতে বৈঠকে বসছে ইন্ডিয়া জোটও। মঙ্গলবার রাতে বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনে ইন্ডিয়া জোটের সংসদীয় দলের নেতাদের বৈঠক রয়েছে।
বাজেট অধিবেশনে সরকারকে কোনঠাসা করতে এককাট্টা বিরোধীরা। সকালেই সংসদে বৈঠকে বসছে কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টি। রণকৌশল ঠিক করে দেবেন স্বয়ং সনিয়া গান্ধী। বাজেট পেশের পরেই সরকারকে আক্রমণের রণকৌশল চূড়ান্ত করতে বৈঠকে বসছে ইন্ডিয়া জোটও। আজ রাতে বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খার্গের বাসভবনে ইন্ডিয়া জোটের সংসদীয় দলের নেতাদের বৈঠক।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন ইঙ্গিত দিয়েছেন, ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ করা হবে। প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক্স, এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV) উৎপাদনে এমএসএমইর সুযোগ রয়েছে।
মোদি সরকার পরিকাঠামো উন্নয়নে অনেক বেশি জোর দিয়েছে। সরকারের পরিকল্পিত ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার (capex) ১১.১ লক্ষ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ৯.৫ লক্ষ কোটি টাকা বেশি। সরকার পরিকাঠামো তৈরিতে জোর দিচ্ছে এবং রাজ্যগুলিকে ক্যাপেক্স বাড়াতে উৎসাহিত করছে।
চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি নিয়ম মেনে বাজেট পেশ করেছিল কেন্দ্র। তবে ভোট আসন্ন হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ হয়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাধারণ মানুষের জন্য এবার বড় ঘোষণা করতে পারেন অর্থমন্ত্রী। বিশেষত ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির মুখে বাজেট কোনও স্বস্তি দিতে পারে কি না, সেই প্রশ্নই থাকছে।