‘দাদা তুমি গোষ্ঠ পালের রোলটা করবে?’, রাহুলকে নিয়ে কলম ধরলেন টোটা রায়চৌধুরী
তারপর বছর দেড়েক বাদে ফোন করে বলল, টোটাদা, ১৯১১ সালের মোহনবাগানের সেই ঐতিহাসিক শিল্ড জয় নিয়ে একটা ছবি করার কথা ভাবছি। তুমি গোষ্ঠ পালের রোলটা করবে? আমি এক কথায় রাজি হওয়াতে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল; ইয়ে, কত বাজেট ধরব তোমার? আমি হেসে বললাম, তোমার পছন্দের সংখ্যা চেক-এ বসিয়ে দিও। খানিক নিস্তব্ধতার পর ওর স্বভাবসিদ্ধ উচ্ছাস সমেত একটা জোরালো থ্যাংক ইউ!

রাহুলের মৃত্যুর খবর প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি অভিনেতা টোটা রায়চৌধুরী। ভেবেছিলেন, কেউ রসিকতা করছেন বা ভুয়ো খবর। কিন্তু যখন সত্যিটা জানতে পারলেন, পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গিয়েছিল টলিউডের ফেলুদার। চোখের সামনে তাঁর ধরা দিচ্ছিল একের পর এক ছবি, রাহুলের সঙ্গে প্রথম দেখা, প্রথম অভিনয়। সব কিছুই যেন চোখের পর্দায় ধরা দিচ্ছিল। সেই সব নস্টালজিয়াকে একসঙ্গে করে টোটা ফেসবুকে কলম ধরলেন। লিখলেন, রাহুলের কথা।
কী লিখলেন টোটা?
ফেসবুকে এক লম্বা পোস্টে টোটা লিখলেন, ”ফোনে খবরটা শুনে বেশ রূঢ়ভাবেই বললাম যে এ ধরনের স্থূল রসিকতা শোনার বয়স বা মানসিকতা কোনোটাই আমার নেই। অপর প্রান্তে ইন্ডাস্ট্রির এক অনুজ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ধরা গলায় বলল সোশ্যাল মিডিয়া খুলে দেখতে। নির্ভরযোগ্য দুটো খবরের পোর্টাল পড়ে অবসন্ন হয়ে পড়লাম। টুকরো টুকরো কতকগুলো ঘটনা যেন চোখের সামনে দিয়ে দ্রুতগতিতে বেরিয়ে যেতে লাগল।”
চিরদিনই তুমি যে আমার মুক্তির আগে রাহুলের সঙ্গে প্রথম দেখা টোটা রায়চৌধুরী। প্রথম দেখাতেই রাহুলকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন টোটা। প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়েছিলেন রাহুলের সারল্য় ও ভদ্রতায়। টোটা লিখলেন, ”১৩ই অগাস্ট ২০০৮। বুধবার। তারিখটা মনে আছে তার কারণ ঠিক দুদিন পরেই বিজয়গড় কলোনির এক সাধারণ ছেলে রাতারাতি বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের নয়নের মণি হয়ে উঠবে। সম্ভবত ইস্টবেঙ্গল মাঠে, ফুটবল ভেটেরেন্স বনাম আর্টিস্ট ফোরামের এক প্রদর্শনী ম্যাচ। খেলা শুরু হবার আগে হঠাৎ করে আমাদের টিমের এক সহ খেলোয়াড় ঝুপ করে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, দাদা আমি অরুণোদয়। আমি হতচকিত হয়েও সামলে নিয়ে বললাম, তোমার ছবির ট্রেলারটা দারুণ লাগলো। আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল। ও তখন হাত দুটো ধরে বলল, আশীর্বাদ করো দাদা। সেই প্রথম দর্শনেই ওর সারল্য ও ভদ্রতা আমায় মুগ্ধ করেছিল। তারপর বছর দেড়েক বাদে ফোন করে বলল, টোটাদা, ১৯১১ সালের মোহনবাগানের সেই ঐতিহাসিক শিল্ড জয় নিয়ে একটা ছবি করার কথা ভাবছি। তুমি গোষ্ঠ পালের রোলটা করবে? আমি এক কথায় রাজি হওয়াতে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল; ইয়ে, কত বাজেট ধরব তোমার? আমি হেসে বললাম, তোমার পছন্দের সংখ্যা চেক-এ বসিয়ে দিও। খানিক নিস্তব্ধতার পর ওর স্বভাবসিদ্ধ উচ্ছাস সমেত একটা জোরালো থ্যাংক ইউ! না, ছবিটা হয়নি কিন্তু তারপর যতবার দেখা হয়েছে ফুটবল নিয়ে বিশেষ করে বাংলার ফুটবল নিয়ে অল্প হলেও আলোচনা হত। ফুটবলপাগল বলতে যা বোঝায় ও তাই ছিল।”
এই পোস্টেই টোটা আরও লিখলেন, ”তবে ওকে অনেকটা ভালো করে চিনলাম দার্জিলিং জমজমাট সিরিজের আউটডোরে। বড়দিঘি বাংলোয় শুটিং চলছিল। অভিনেতাদের ভাগ করে দুটো ঘর দেওয়া হয়েছিল। পরদিন থেকে রাহুল যে ঘরে ছিল সবাই সেই ঘরেই। শুটিং এর বিরতিতে চলত তুমুল আড্ডা, হইহই মজা। এতটাই যে আমাদের সিরিয়াস পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় একদিন কৌতূহলবশত ঘরে ঢুকতেই রাহুলের সশব্দ আহ্বান; সৃজিতদা ওয়েলকাম টু নরক গুলজার, শুনে ফিক করে হেসে ফেলেছিল। এবং আড্ডায় এতটাই মশগুল হয়ে গিয়েছিল যে সহকারীকে মনে করিয়ে দিতে হয়েছিল যে অনেকটা কাজ পড়ে আছে। সেবারেই উপলব্ধি করেছিলাম যে এই আদ্যপান্ত আমুদে মানুষটাই অতীব স্নেহশীল ও সংবেদনশীল এক পিতা। পুত্র সহজের কথা বলার সময় মুখের ভাব ও কণ্ঠস্বর তৎক্ষণাৎ কোমল হয়ে উঠত। দার্জিলিঙে শেষ সিন শুট করার পর ও-ই একটা ছবি তোলার অনুরোধ করেছিল। ওকে মধ্যমণি করেই আমরা ছবিটা তুলেছিলাম। সেটাই ওর সঙ্গে তোলা আমার সংগ্রহে একমাত্র ছবি। কিছু মানুষ আসে ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুধু নিতে। কিছু মানুষ আসে যাদের কাছ থেকে ইন্ডাস্ট্রির অনেক কিছু পাওয়ার থাকে। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর পর্যায়ভুক্ত। অনেক কিছু পাওয়ার ছিল ওর কাছ থেকে — অভিনেতা হিসেবে, লেখক হিসেবে, মানুষ হিসেবে। বড় তাড়াতাড়ি চলে গেলে ভাই, বড় তাড়াতাড়ি…।”
