Ramayana Actor: অরুণ গোভিল, রণবীরের বহু আগে ৯ বার সিনেপর্দার রাম, মৃত্য হয় ব্রেন হেমারেজে, জানেন কে এই অভিনেতা?
Ramayan actor history: অভিনেতা প্রেম আদিব রুপোলি পর্দায় মোট ৯টি চলচ্চিত্রে ভগবান রামের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। তিনি চরিত্রটিকে এতটাই নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে দর্শকরা অন্য কোনও রূপে তাঁকে কল্পনাই করতে পারতেন না। সিনেপর্দাকে যেন এক শান্ত ভক্তিময় আবহে ভরিয়ে তুলেছিলেন তিনি।

পরিচালক নিতেশ তিওয়ারির আসন্ন ছবি ‘রামায়ণ’-এ (২০২৬-২০২৭) রণবীর কাপুর পর্দায় রাম হিসেবে হাজির হওয়ার অনেক আগে, কিংবা ১৯৮৭ সালে রামানন্দ সাগরের মহাকাব্যিক ‘রামায়ণ’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে অরুণ গোভিল কোটি কোটি মানুষের কাছে ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’-এর প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠার বহু আগেই— এক অভিনেতা চরিত্রটিকে নিজের করে নিয়েছিলেন। অভিনেতা প্রেম আদিব রুপোলি পর্দায় মোট ৯টি চলচ্চিত্রে ভগবান রামের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। তিনি চরিত্রটিকে এতটাই নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে দর্শকরা অন্য কোনও রূপে তাঁকে কল্পনাই করতে পারতেন না। সিনেপর্দাকে যেন এক শান্ত ভক্তিময় আবহে ভরিয়ে তুলেছিলেন তিনি।
রাম হিসেবে তাঁর রূপোলি পর্দার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪২ সালে বিজয় ভাট পরিচালিত ‘ভারত মিলাপ’ ছবির মাধ্যমে। ছবিটি দর্শকদের মন জয় করে নেয়। এর পরেই পরের বছর (১৯৪৩) বিজয় ভাট তাঁকে ‘রাম রাজ্য’ ছবিতে আবারও একই চরিত্রে অভিনয় করান। এই ছবিটির এক বিরল ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে— এটিই একমাত্র চলচ্চিত্র যা মহাত্মা গান্ধী তাঁর জীবদ্দশায় দেখেছিলেন।
পর্দায় তাঁর সেই শান্ত, সংযত উপস্থিতি দেখতে দর্শকরা বারবার প্রেক্ষাগৃহে ভিড় জমাতেন। একে একে প্রেম আদিব রাম হিসেবে ফিরে আসেন ‘রামবাণ’, ‘রাম বিবাহ’ (যেটি তিনি নিজেই প্রযোজনা ও পরিচালনা করেছিলেন), ‘রাম নবমী’, ‘রাম হনুমান যুদ্ধ’, ‘রাম লক্ষ্মণ’, ‘রাম ভক্ত বিভীষণ’ এবং ১৯৫৪ সালের ‘রামায়ণ’ (যা আসলে বিজয় ভাটের আগের তিনটি ছবির সংকলন) চলচ্চিত্রে। সব মিলিয়ে মোট ৯ বার তিনি রামের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ট্রিলোক কাপুর, মহিপাল বা শাহু মোদকের মতো অভিনেতারাও রামের চরিত্রে অভিনয় করলেও প্রেম আদিবের মতো গভীর ছাপ আর কেউ ফেলতে পারেননি।
![]()
এই ছবিগুলির মধ্যে ‘রাম বিবাহ’ চলচ্চিত্রটি ছিল অত্যন্ত বিশেষ। ছবিটির প্রযোজক প্রেম আদিব, পরিচালক প্রেম আদিব এবং এতে রামের ভূমিকাতেও ছিলেন খোদ প্রেম আদিব। যে গল্প তাঁর পরিচয় তৈরি করে দিয়েছিল, সেই গল্পের ওপর কোনও অভিনেতার এই ধরনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত। ১৯৪৩ থেকে ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত রাম ও সীতার ভূমিকায় প্রেম আদিব এবং শোভনা সমর্থের জুটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, তৎকালীন ধর্মীয় পত্রিকা, ক্যালেন্ডার এবং এমনকী বাসাবাড়ির ঠাকুরঘরে বা মন্দিরেও তাঁদের ছবি স্থান পেত।
পর্দায় এই অভূতপূর্ব সাফল্যের আগে প্রেম আদিবের নিজের জীবনকাহিনিটি ছিল বেশ শান্ত কিন্তু দৃঢ় সংকল্পে ভরা। ১৯১৭ সালে এক কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারে জন্ম নেন শিব প্রসাদ আদিব। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাঁর ঠাকুরদাকে অওধের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ ‘আদিব’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। বহু প্রজন্ম আগেই তাঁদের পরিবার কাশ্মীর থেকে উত্তর প্রদেশে চলে আসে।
ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি এক গভীর ভালোবাসা ছিল তরুণ শিব প্রসাদের। কলেজের গণ্ডি পেরোতেই সেই টান আর উপেক্ষা করতে পারেননি তিনি। পরিবারকে না জানিয়েই বোম্বে (বর্তমান মুম্বই) চলে আসেন এবং তৎকালীন সময়ে অন্যান্য অভিনেতাদের মতো কঠিন লড়াই শুরু করেন। ১৯৩৬ সালে পরিচালক মোহন সিনহা তাঁকে ‘রোম্যান্টিক ইন্ডিয়া’ ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ দেন এবং তাঁর নাম বদলে রাখেন প্রেম আদিব।
প্রেম আদিব অন্যান্য ছবিতে অত্যন্ত স্টাইলিশ ও আধুনিক চরিত্রে অভিনয় করলেও রামের ভূমিকায় নামার সঙ্গে সঙ্গে যেন সম্পূর্ণ বদলে যেতেন। চরিত্রটির জন্য প্রয়োজনীয় মার্জিত ভাব ও গাম্ভীর্যের মধ্যে তিনি নিজেকে এমনভাবে বিলীন করে দিতেন যে, পরবর্তী প্রজন্ম ভুলেই গিয়েছিল যে তিনি অন্য কোনও সাধারণ চরিত্রেও অভিনয় করতে পারেন।
তবে সব গল্পের পরিণতি সুন্দর হয় না। ১৯৫৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের (ব্রেন হেমারেজ) কারণে মাত্র ৪২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা।
আজ যখন বিশাল বাজেট, বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও নতুন মুখের ছোঁয়ায় ভারতীয় চলচ্চিত্রে মহাকাব্যিক গল্প ফের নতুন করে পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠছে, তখন আধুনিক প্রচারের আলো ছাড়াই যিনি এক সম্পূর্ণ প্রজন্মের কাছে ‘রাম’ হয়ে উঠেছিলেন, তাঁকে স্মরণ করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বিনোদন জগত হয়তো প্রতিনিয়ত নতুন ঈশ্বর গড়ে তোলে, কিন্তু প্রেম আদিবের এই অনন্য নীরব রেকর্ড আজও অটুট।
