‘গজু, আর কটা দিন সহ্য করো’, মুম্বই থেকে গৌরীদেবীকে লিখেছিলেন উত্তম, কী সহ্য করার কথা বলেছিলেন মহানায়ক?
তিনি স্বামীর সঙ্গে মুম্বইয়ে গিয়ে থাকতে চান। কিন্তু কলকাতা আর মুম্বইয়ের জীবনযাপনের ফারাকটা মহানায়ক হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। স্ত্রীর আবদার আর বাস্তব পরিস্থিতির চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত মুম্বই থেকেই একটি দীর্ঘ চিঠি লেখেন প্রিয় 'গজু'কে (গৌরী দেবীকে ভালোবেসে এই নামেই ডাকতেন তিনি)।

ভবানীপুর আর ময়রা স্ট্রিট—মহানায়কের জীবনটা এই দুই মেরুতে বিভক্ত ছিল। প্রতি রবিবার ভবানীপুরে মা আর স্ত্রীর কাছে ফিরে যেতেন তিনি, কাটিয়ে আসতেন কিছু পারিবারিক মুহূর্ত। গৌরী দেবীও স্বামীর এই ‘দোটানা’ মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের এই দূরত্ব কি কেবল শারীরিক ছিল? না কি চিঠির আদান-প্রদানে ছিল এক গভীর অন্তরের টান? সম্প্রতি মহানায়কের লেখা একটি চিঠি সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিচ্ছে।
উত্তম কুমার তখন মুম্বইয়ের (তখন বম্বে) মায়ানগরীতে নিজের ভাগ্য অন্বেষণ করছেন। কলকাতায় তখন তাঁকে নিয়ে হাজারো গুঞ্জন। এদিকে স্ত্রী গৌরী দেবী নাছোড়বান্দা, তিনি স্বামীর সঙ্গে মুম্বইয়ে গিয়ে থাকতে চান। কিন্তু কলকাতা আর মুম্বইয়ের জীবনযাপনের ফারাকটা মহানায়ক হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। স্ত্রীর আবদার আর বাস্তব পরিস্থিতির চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত মুম্বই থেকেই একটি দীর্ঘ চিঠি লেখেন প্রিয় ‘গজু’কে (গৌরী দেবীকে ভালোবেসে এই নামেই ডাকতেন তিনি)।
চিঠির ছত্রে ছত্রে ধরা পড়েছে এক অসহায় যোদ্ধার প্রতিচ্ছবি। কলকাতায় অর্ধেক শেষ হওয়া ছবিগুলো মুম্বই বা মাদ্রাজে নিয়ে এসে শেষ করতে চেয়েছিলেন উত্তম কুমার। কিন্তু মুম্বইয়ের মাটি অতটা সহজ ছিল না। চিঠিতে তিনি আক্ষেপ করে লিখেছেন:
“মানুষ ভাবে এক, আর হয় এক। ভেবেছিলাম তোমাকে এনে রাখার জন্য দুটো ঘরের একটা ফ্ল্যাট নেব। কিন্তু হাতে যদি টাকাই না আসে, তবে কার ভরসায় ফ্ল্যাট ভাড়া করব? আর আমিই বা না খেয়ে কতদিন এখানে পড়ে থাকব?”
সেই সময় মুম্বইয়ে একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া ছিল ৬০০-৭০০ টাকা, যা মহানায়কের জন্য সেই মুহূর্তে ছিল বিলাসিতা। বাজারের দেনা আর রোজকার খরচের চাপে কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
চিঠির শেষে ছিল এক পরম মমত্ববোধ আর আশ্বাসের বাণী। তিনি জানতেন, কলকাতায় তাঁকে নিয়ে নানা মুখরোচক গল্প চলছে। তাই গৌরী দেবীকে সতর্ক করে লিখেছিলেন, কোনো গুঞ্জনে যেন তিনি কান না দেন। মহানায়কের আকুতি ছিল—”তুমি মন খারাপ করলে তোমার শরীর খারাপ হবে। আমার জন্য তো অনেক কষ্টই সহ্য করেছ, আর কটা দিন একটু সহ্য করো… ভালো থেকো, ভালোবাসা নিও।” মুম্বইয়ে নতুন সংসার পাতার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মহানায়ককে ফিরতে হয়েছিল কলকাতাতেই। সুপ্রিয়া চৌধুরী আর গৌরী দেবীর মাঝখানের সেই দোটানা তাঁর জীবনের চিরস্থায়ী ছায়াসঙ্গী হয়ে রয়ে গিয়েছিল। সেই অপূর্ণ ইচ্ছে আর না মেটা জেদ আজ কেবল হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠির পাতায় এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে বেঁচে রয়েছে।
তথ্যসূত্র- উত্তম একশো, কৃত্তিবাস
