
নয়া দিল্লি ও ঢাকা: খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে হাজির ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর শেষকৃত্যে গিয়ে তাঁর ছেলে তারেক রহমানের পাশে দাঁড়ালেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী, হাতে তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাতে লেখা আন্তরিক চিঠি। কূটনীতিকরা বলছেন, বিএনপি নেতার সঙ্গে এই সাক্ষাৎ এবং জীবনের কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর যে আন্তরিকতা দেখিয়েছে ভারত, তা দুই দেশের সম্পর্কে মোড় আনতে পারে। তিক্ত হয়ে যাওয়া সম্পর্ক আবার মধুর হতে পারে আগের মতো।
পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির মেয়ে খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর আসতেই শোক প্রকাশ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপরই জানা যায়, তাঁর শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকবেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। কোনও দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর শেষকৃত্যে দেশের বিদেশমন্ত্রীর উপস্থিত থাকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং নজিরবিহীন। বিশেষ করে সেই দেশ যদি বাংলাদেশ হয়। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাস অনেক পুরনো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত যদি পাশে না দাঁড়াত, তাদের হয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে না লড়ত, তাহলে প্রতিবেশী দেশের স্বাধীন হওয়া হত না। দীর্ঘ বহু দশক ধরেই দুই দেশের মধ্যে সুমধুর সম্পর্ক ছিল, তা সে যে সরকারই থাকুক না কেন। ছন্দ কাটে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরই।
২০২৪ সালের অগস্ট মাসে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পড়ে যখন প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা এবং প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় নেন, তখন থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে ক্রমে অবনতি হতে থাকে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার, লাগাতার ভারতের বিভিন্ন অংশ দখলের হুমকি সম্পর্কে ফাটল আরও চওড়া করে। কিছুদিন আগে ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পরও ভারতের দিকেই আঙুল তুলেছিল বাংলাদেশ, সেভেন সিস্টার্স দখল করে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল বাংলাদেশি নেতারা। সেখানেই খালেদা জিয়ার মৃত্যু হঠাৎ সম্পর্কের সমীকরণ যেন বদলে দিল।
বাংলাদেশ এখন অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে নিয়ন্ত্রিত। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন। বর্তমানে যেহেতু বাংলাদেশে আওয়ামী লিগ নিষিদ্ধ, তাই প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বলতে শুধু বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি বা বিএনপি, যার নেত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। তাঁর অবর্তমানে পুত্র তারেক রহমানই এখন সর্বেসর্বা। বাংলাদেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি-রই জেতার সম্ভাবনা বেশি। প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন তারেক রহমান। আর সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আবার ভাল হওয়ার আশা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও তাঁর চিঠিতে ১০ বছর আগে বেগমের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং দুই দেশের সম্পর্ক মজবুত করতে তাঁর অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন। বিদেশমন্ত্রীও তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খালেদা জিয়ার অবদানের কথা যেমন স্মরণ করেছেন, তেমনই আগামিদিনে দুই পড়শি দেশের সম্পর্ক আবারও মজবুত করার আশা প্রকাশ করেছেন।
On arrival in Dhaka, met with Mr Tarique Rahman @trahmanbnp, Acting Chairman of BNP and son of former PM of Bangladesh Begum Khaleda Zia.
Handed over to him a personal letter from Prime Minister @narendramodi.
Conveyed deepest condolences on behalf of the Government and… pic.twitter.com/xXNwJsRTmZ
— Dr. S. Jaishankar (@DrSJaishankar) December 31, 2025
দুই দেশের সম্পর্ক শোধরানোর আশা শুধু কূটনীতিকরাই দেখছেন না, এ কথা বলছেন বাংলাদেশের হাই কমিশনারও। বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করের চার ঘণ্টার ঝটিকা সফর নিয়ে রিয়াজ হামিদুল্লাহ লিখেছেন, “ভারত ও বাংলাদেশ পারস্পরিক স্বার্থ, বাস্তববাদ এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায় রচনার দিকে তাকিয়ে থাকবে, যেমনটি আজ বিকেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় উঠে এসেছে।“
অন্যদিকে, বাংলাদেশের মাটিতেই পাকিস্তানের সংসদের স্পিকার সর্দার আয়াজ সাদিকের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয় বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করের। অপারেশন সিঁদুরের পর এটাই প্রথম সাক্ষাৎ ছিল। এক ঘর ভর্তি নেতা-মন্ত্রীদের মাঝে এই সাক্ষাৎ হয়, তবে তা সৌজন্যের থেকে বেশি কিছু ছিল না বলেই সরকারি সূত্রে খবর।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের যেভাবে সখ্যতা বাড়ছে, তা যথেষ্ট চিন্তা বাড়িয়েছে ভারতের। তবে বাণিজ্য থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটাই ভারতের উপরে নির্ভরশীল, সেই দিক থেকে তারেকের হাত ধরে দুই প্রতিবেশী আবার নতুন অধ্যায় লিখতে পারে বলেই মত কূটনীতিকদের।