দক্ষিণ আফ্রিকাকে উড়িয়ে তিলোত্তমায় রূপকথা লিখলেন ফিন!
গতকাল মিলিয়ে মার্কর্যাম আইসিসি প্রতিযোগিতায় নিজের ক্যাপ্টেন্সিতে মাত্র ২টো ম্যাচে হেরেছেন। এক, গতকাল ও দুই, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনাল ২০২৪। পরের বার কি দলে থাকবেন তিনি ? তাঁর আর এক সঙ্গী ডেভিড মিলারের জন্যও খারাপ লাগা বাধ্যতামূলক। নিজের কেরিয়ারে একটা বিশ্বকাপ পেলেন না মিলার। উল্টে, বাজিমাত করে দিয়ে গেলেন ফিন অ্যালেনরা।

কলকাতা : ইডেনের মায়াবী রাতে ফিন অ্যালেন শেষ বলের ৬টা মারতেই ক্যামেরায় দেখাল দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট অধিনায়ক টেম্বা বাভুমাকে। বলটা বাউন্ডারি পেরোতেই কমেন্ট্রিবক্সে কানের ইয়ারপিসটা খুলে ফেলে শরীরটা চেয়ারে এলিয়ে দিলেন টেম্বা। পাশে বসা প্রাক্তন অজি অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চও চুপ। কেউ যেন বুঝতেই পারছেন না, কোথায় ভুল হল। কোথায় হারল সাউথ আফ্রিকা ? যে সাউথ আফ্রিকা গোটা টুর্নামেন্টে অপরাজিত থেকে মাঠে নেমেছিল, তাদের এমন অসহায় আত্মসমর্পণ বোধহয় আশা করেনি ক্রিকেটবিশ্ব। ফিন অ্যালেন ও টিম সেইফার্ট ১২.৫ ওভারেই ১৭৩ রান তুলে হয়ত ভারত ও ইংল্যান্ড – দুই দলকেই আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে দিলেন।
“তারা ক্রিকেটের কি বোঝে, যারা শুধুই ক্রিকেট বোঝে ?” – বহুবছর আগে বলেছিলেন প্রাক্তন ক্রিকেটলিখিয়ে সি এল আর জেমস। কালকের ইডেনফেরত দর্শকরা হয়ত এই কথাই মনে রাখবে। বিশ্বকাপের আগে ইনস্টাগ্রাম রিলে ক্রিকেট দেখা জেন জি সমর্থকরা আদৌ ফিন অ্যালেনকে চিনতেন কিনা, লক্ষ টাকার প্রশ্ন। সেই ফিনই একা হাতে শেষ করলেন মার্কর্যামদের। প্রাক্তন কিউয়ি ব্যাটার কোরি অ্যান্ডারসন কি কালকের ম্যাচে চোখ রেখেছিলেন ? তাঁরই দেশতুতো ভাই যে তাঁর রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন, সেই খবর হয়ত এতক্ষনে কানে গেছে কোরির। কোরি রেকর্ড ভেঙেছিলেন শাহিদ আফ্রিদির। ২০১৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে করেছিলেন ৩৪ বলে শতরান। কাল ফিন করলেন ৩৩ বলে শতরান। সামনে একমাত্র এবি ডি’ভিলিয়ার্স। তিনি করেছেন ৩১ বলে শতরান। তবে কোরি, এবি, শাহিদ – তিনজনই ওয়ানডে ম্যাচে এই রেকর্ডের অধিকারী হয়েছেন। ফিন হলেন টি-টোয়েন্টিতে। এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে এর আগে দ্রুততম শতরান ছিল ক্রিস গেইলের। ৪৭ বলে শতরান করেছিলেন ২০১৬ বিশ্বকাপে। ঐতিহাসিক ইডেন হয়ত এসবেরই সাক্ষী থেকে যায়। সে দ্রাবিড়-লক্ষ্মণের পার্টনারশিপ হোক বা শচীনের ১৯৯তম টেস্ট ইনিংস, শোয়েব আখতারের সচিন বধ বা ২০১৬ ফাইনালে কার্লোস ব্রাথওয়েটের ৪ ছক্কা – ইডেনের ঘটনা কিছু অংশে এই কারণেই বাকি মাঠগুলোর চেয়ে আলাদা। গত রবিবারই এই মাঠে পুনর্জন্ম হল সঞ্জু স্যামসনের। তার ঠিক ৩ দিন পরেই নাইট সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটালেন ফিন ও সেইফার্ট।
পাওয়ারপ্লে শেষ হতেই নিউজিল্যান্ডের স্কোর ৮৪-০। একটু আগেই কুইন্টন ডি’কক মিস করেছেন এক সহজ ক্যাচ। সেই ক্যাচ ডি’ককের তালুবন্দি হলে গল্পটা আলাদা হত। এত তাড়াতাড়ি ম্যাচ জিতত না নিউজিল্যান্ড। দক্ষিণ আফ্রিকার সবথেকে বড় শক্তি মানা হত তাদের বোলিংকে। সেই তারাও কাল চূড়ান্ত ফ্লপ ! করবিন বশ রান দিলেন ২ ওভারে ৩৫। মার্কো জানসেন ২.৫ ওভারে ৫৩। যারা এর আগে গ্ৰুপ পর্বেই ১০ উইকেটে জিতেছে, তাদের জন্য যে প্রথমে ব্যাট করে ১৬৯ রান যথেষ্ট নয়, বুঝেছেন মার্কর্যাম । কাল নিউজিল্যান্ডকে জেতালেন কেকেআর ত্রয়ী – রাচীন রবীন্দ্র, টিম সেইফার্ট ও ফিন অ্যালেন। অ্যালেনের সেঞ্চুরির পাশাপাশি সেইফার্ট করলেন ৫৮ রান। রাচীন বলে ২ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাটে নট আউট রইলেন ১৩ রানে। তাঁদের নিয়েই ম্যাচের পর সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছে কেকেআর। লিখেছে,”আগামী গ্রীষ্মে যা ঘটতে চলেছে, তার ঝলক দেখলাম আমরা।”
গতকাল মিলিয়ে মার্কর্যাম আইসিসি প্রতিযোগিতায় নিজের ক্যাপ্টেন্সিতে মাত্র ২টো ম্যাচে হেরেছেন। এক, গতকাল ও দুই, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনাল ২০২৪। পরের বার কি দলে থাকবেন তিনি ? তাঁর আর এক সঙ্গী ডেভিড মিলারের জন্যও খারাপ লাগা বাধ্যতামূলক। নিজের কেরিয়ারে একটা বিশ্বকাপ পেলেন না মিলার। উল্টে, বাজিমাত করে দিয়ে গেলেন ফিন অ্যালেনরা। গোলিয়াথ ও ডেভিডের যুদ্ধে জিতেছিল ডেভিড। ইডেনে গোলিয়াথ জিতে প্রমান করল, ইডেন বরাবর আলাদা। ইডেনে প্রধান নায়ককে বাজিমাত করে বেরিয়ে যায় পার্শ্বচরিত্ররা। তাই ইডেন শচীনের নয়, দ্রাবিড়ের। ভাজ্জির নয়, নারিনের। আইএসএলে টানা ইস্টবেঙ্গলকে হারানো মোহনবাগানের সুপারজায়ান্টদের নয়, উমাকান্ত পালোধীর আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া ৫-০র ইস্টবেঙ্গলের। সূর্যের নয়, সঞ্জুর। কাল আরও একটা নাম যোগ হল। ডেভিড মিলারের নয়, ফিন অ্যালেনের। ইডেন যে এভাবেই নিজের নায়ককে বেছে নেয়!
