AQI
Sign In

By signing in or creating an account, you agree with Associated Broadcasting Company's Terms & Conditions and Privacy Policy.

CPM-ISF-Congress: এবার কি একলা হাঁটবে সিপিএম?

Bengal Politics: ভোট এলেই বাংলায় বারবার ফিরে ফিরে এসেছে থার্ড ফ্রন্টের ছবিটা। লড়াইয়ে থেকে বাম কংগ্রেস। একুশের বিধানসভায় বাংলা দেখেছে বাম কংগ্রেস আইএসএফের সংযুক্ত মোর্চা। কিন্তু এবার ছাব্বিশের ভোটে কী ফের সেই জোটের ছবি দেখা যাবে? জল কোন দিকে গড়াচ্ছে? চলুন একবার ৩৬০ ডিগ্রি অ্য়াঙ্গেলে ঘুরে দেখি কী বলছে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট থেকে ফুরফুরা শরিফ।

CPM-ISF-Congress: এবার কি একলা হাঁটবে সিপিএম?
চাপানউতোর রাজনৈতিক মহলে Image Credit: TV 9 Bangla GFX
| Updated on: Jan 26, 2026 | 6:55 PM
Share

তৃণমূল বনাম বিজেপি– লড়াইটা যে মূলত দ্বিমুখী সেটা স্পষ্ট হতে আর কিছুই বাকি নেই। এগারোর আগেও বাংলা দেখেছিল সেই দ্বিমুখী লড়াইয়ের ছবিটাই। এগারোর পরিবর্তনের পর বাংলার মসনদে বসেছে তৃণমূল। তখন বিরোধীদের আসনে বামেরা। যদিও ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের পর থেকে অঙ্কটা ধীরে ধীরে বদলে যায়। তারপর শুধুই গেরুয়া উত্থান। ২০১৯ এর লোকসভা থেকে ছবিটা একেবারে জলের মতো স্পষ্ট। কিন্তু ভোট এলেই বাংলায় বারবার ফিরে ফিরে এসেছে থার্ড ফ্রন্টের ছবিটা। লড়াইয়ে থেকে বাম কংগ্রেস। একুশের বিধানসভায় বাংলা দেখেছে বাম কংগ্রেস আইএসএফের সংযুক্ত মোর্চা। কিন্তু এবার ছাব্বিশের ভোটে কী ফের সেই জোটের ছবি দেখা যাবে? জল কোন দিকে গড়াচ্ছে? চলুন একবার ৩৬০ ডিগ্রি অ্য়াঙ্গেলে ঘুরে দেখি কী বলছে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট থেকে ফুরফুরা শরিফ। 

পদ্ম পাতায় জল 

এসআইআর শেষ হতে আর মাত্র কটা দিন। তারপরেই ভোট ঘোষণা! এরইমধ্যে বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর সঙ্গে মাসখানেক আগে প্রাথমিক আলোচনা করেছিলেন আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। কোথায় কোথায় তাঁরা দাঁড়াতে চান মানে তাঁদের প্রার্থী দিতে চান তার এক খসড়া লিস্টও জমা দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়। কংগ্রেসের কাছেও সেই লিস্ট পৌঁছেছিল। কিন্তু তারপর? তার আর পর নেই। মানে এই মুহূর্তে যা খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে জোটের ভবিষ্যৎ যেন ওই পদ্ম পাতায় জলের মতো। টলমল টলমল করছে। নওশাদ থেকে বিমান বসু, সবাই বলছেন জোট চাই, আলোচনা চলছে। কিন্তু করবে কে?

বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বলছেন, আলোচনা চলছে। বাইরে বলার মতো কোনও অবস্থা তৈরি হয়নি বলে বাইরে কিছু বলছি না। আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী বলছেন, কংগ্রেস সিপিএম-কে তো আমরা আনুষ্ঠানিক বার্তা অনেক আগেই দিয়েছি। 

‘একলা চলোর’ পক্ষে কংগ্রেস? 

আমরা যদি একুশের বিধানসভা ভোটের দিকে একবার নজর ঘোরাই তাহলে দেখব সেইবার জোট করতে অনেক বেশি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী। তারপর গঙ্গা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। হাতের  হাত ধরে বিধানসভায় খাতাই খুলতে পারেনি বামেরা। তৃণমূলের ধাক্কায় হাতের হাতেও ফোস্কা। উল্টে ভাঙড় জিতে কোনওমতে মুখ রক্ষা করেছিলেন বাম-কংগ্রেসের সবেধন নীলমনি নওশাদ সিদ্দিকী। এখন আবার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্বে শুভঙ্কর সরকার। সূত্র মারফত যা খবর পাওয়া যাচ্ছে শুভঙ্কর শিবির সওয়াল করছে একলা চলো নীতির পক্ষেই। অর্থাৎ, জোটা তাঁরা নিমরাজি। অন্যদিকে অধীর শিবির চাইছে জোট হোক। ও, এর মধ্যে একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? কিছুদিন আগে মৌসম বেনজির নুরের যখন কংগ্রেসে ঘরওয়াপসি হল তখন তাঁর পাশে দেখা গিয়েছিল গোলাম মীর, জয়রাম রশেমদের। ছিলেন শুভঙ্করও। তাঁদের বাংলায় জোট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তাঁদের একটা কথা ছিল ‘আমরা এখন নিজেদের উদ্বুদ্ধ করতে চাইছি’। ওদের ভাবগতিক দেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তো বলতে শুরু করেছিলেন কংগ্রেস এখন অন্যের ঘর ভেঙে নিজেদের ঘর গোছাতে অনেক বেশি তৎপর। উল্টে কংগ্রেস নেতারা নির্বাচন পরবর্তী জোটের দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ভোটের পর কার কেমন ক্ষমতা সেই বুঝে একসঙ্গে চলা, কর্মসূচি নেওয়ার কথা বলছিলেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে ওই দিনের সাংবাদিক সম্মেলনে কিন্তু অধীর চৌধুরীকে দেখা যায়নি। দলীয় সূত্রে খবর, তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন। 

অর্থাৎ কংগ্রেস এখন কী করবে তা এখনও খুব একটা স্পষ্ট নয়। চাপানউতোর পুরোদমে চলছে দলের অন্দরে। অন্যদিকে আলোচনার রাস্তাও যে পুরোমাত্রায় খোলা আছে তা নেতাদের কথাতেই স্পষ্ট হয়েছে। কংগ্রেস মুখপাত্র সৌম্য আইচ বলছেন, “আমাদের সিদ্ধান্ত উপরে যায়। সেখান থেকেই সিলমোহর আসে। আমাদের সিদ্ধান্ত এখান থেকে হয় না। আমাদের আলোচনা চলছে। কারণ আমরা এখান থেকে কিছু সিদ্ধান্ত নিই না। জোট হবে কী হবে না সেটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনও আসেনি।” 

একে লড়ে লাভ নেই আইএসএফের? 

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন আগেরবারের ভোটে আইএসএফের জন্য মাঠ অনেকটাই খোলা ছিল। কিন্তু এবার যেন খেলাটা অনেকটাই আলাদা। একা লড়লে মুসলিম ভোট টানতে অনেকটাই বেকায়দায় পড়তে হতে পারে নওশাদদের। পকেটে পকেটে বাম-কংগ্রেসের যে মুসলিম ভোট ব্যঙ্ক রয়েছে সেটা অনেকটাই আসে আইএসএফের খাতায়। কিন্তু একা লড়লে সেই অঙ্ক অনেকটাই ঘেঁটে যেতে পারে। তার উপর এবার এবার হুমায়ুন কবীর নতুন দল খুলে মাঠে নেমেছেন। মুসলিম অধিকার রক্ষার দায়িত্ব এক্কেবারে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। সেখানে তাঁদের সঙ্গে জোট নিয়েও বামেরাও এখনও দোলাচলে। আর সব অঙ্ক বুঝেই নওশাদরা মনে হয় বারবার জোটের চেষ্টাই করে যাচ্ছেন। নওশাদ যেমন বলছেন, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। দ্রুততার সঙ্গে এই জোট প্রক্রিয়াকে এই মাসের মধ্যে যাতে শেষ করা যায় সেই চেষ্টা করব। বামেদের উগ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলছেন, আমরা ফিডব্যাক নিই মানুষের কাছ থেকে। তাঁরা কী চাইছে বোঝার চেষ্টা করি। সেই অনুযায়ী কাজ করি। 

একটা জিনিস মনে হয় আপনাদের মনে আছে, চব্বিশের লোকসভা ভোটেও বামেদের সঙ্গে আইএসএফের জোট নিয়ে জোরদার তরজা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর আসন সমঝোতা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গিয়েছিল। নওশাদ এখন যদিও বারবার বলছেন ৩০ জানুয়ারির ডেডলাইনের কথা। জোট হবে কি না জানা নেই, তার আগে জানুয়ারি ডেডলাইন কি বামের উপর চাপ বাড়ানোর কৌশল ISF-র? নওশাদ বলছেন, বামেদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমরা বলেছি সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে একসঙ্গে নিয়ে চলতে হবে। বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে যাঁরা লড়াই করতে চাইছে তাঁদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বামেদের উদ্যোগ অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। 

মহম্মদ সেলিম বল ঠেলছেন কংগ্রেসের কোর্টে। তিনি বলছেন, কংগ্রেসকে ঠিক করতে হবে। এখনও ওরা কিছু ঠিক করেনি। কংগ্রেসের সমর্থকরা চায়, জেলা স্তরের নেতারা চায় জোট হোক। কিন্তু উপরতলাকে ঠিক করতে হবে। 

শূন্যের শাপ ঘুচবে বামেদের? 

গত দুবারের লোকসভা নির্বাচন হোক কি বিধানসভা নির্বাচন, খাতা খুলতে পারেনি বামেরা। এ রাজ্যে ক্রমেই ফিকে হয়েছে লাল। শিবরাত্রির সলতে হয়ে জ্বলছে শুধুমাত্র তাহেরপুর পুরসভা। এখন শূন্য মুছতে মরিয়া বামফ্রন্ট আবার খানিক নিজের শক্তি বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে। শরীক দলগুলোর সঙ্গে ইতিমধ্যেই আসন সমঝোতা নিয়ে বৈঠক করছে সিপিএম। জেলায় জেলায় নিজেদের ভোটব্যাঙ্কের সমীক্ষা চালিয়ে নিজেদের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করেছে সিপিএম। সূত্রের খবর, খাতা খুলতে প্রবল সম্ভাবনাময় আসনগুলোতে হেভিওয়েট প্রার্থী দেওয়ার অঙ্ক কষছে আলিমুদ্দিন। অর্থাৎ, যাঁরা দলের অত্যন্ত পরিচিত মুখ তাঁদেরকেই শক্তিশালী আসনগুলিতে দাঁড় করিয়ে এনে জয় ছিনিয়ে আনার চেষ্টা। অর্থাৎ যে করেই হোক শূন্যের শাপ ঘোচাতে মুখিয়ে রয়েছে বিমান ব্রিগেড। আলিমুদ্দিনে প্রায় রোজই চলছে বৈঠক। 

বামেদের তরুণ নেতাদের পরিচিত মুখ হিসাবে বরাবরই উঠে আসে মীনাক্ষী মুখার্জি, দীপ্সিতা ধর, সৃজন ভট্টাচার্য, শতরূপ ঘোষ, সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়, সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়দের নাম। অন্যদিকে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, সুজন চক্রবর্তীরাও হেভিওয়েট নাম। সূত্রের খবর, এঁদের দিয়েই শূন্য মোছার প্রাথমিক পরিকল্পনা শুরু বামেদের অন্দরমহলে। ২০২১ বিধানসভায় চারটে আসনে দ্বিতীয় হয়েছিল সিপিএম। বাকি আসনগুলিতে তৃতীয়। ভগবানগোলা এসেছিল ২১.১৫ শতাংশ ভোট। ডোমকলে ৩৫.৫৭ শতাংশ ভোট। জলঙ্গিতে ২০.০৬ শতাংশ ভোট। যাদবপুরে ২৭.৫ শতাংশ ভোট। এছাড়াও আলাদা করে বালি, উত্তরপাড়া, দমদম উত্তর, রানিনগরের মতো আসনগুলিতে জোর দিচ্ছে সিপিএম। জোর দেওয়া হচ্ছে মানিকচক, হরিশচন্দ্রপুর, পাণ্ডুয়া, কামারহাটিতেও। সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ স্পষ্টতই বলছেন, “আমাদের লক্ষ্য এমন সংখ্যক বিধায়ক নিয়ে বিধানসভায় যাওয়া যাতে সামনের ৫ বছর আমাদের বাদ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সরকার চলতে না পারে।” 

ছাব্বিশের মহাযুদ্ধে জোট, সমঝোতা, কথা চালাচালি এই দলগুলিকে ঘিরেই। কিন্তু দল গঠনের পর থেকেই হুমায়ুন জোটের জন্য নিয়মিত বার্তা দিচ্ছেন। কখনও সংবাদমাধ্যমের সামনে। কখনও নেতার বাড়ি গিয়ে। ঘুরে এসেছেন ফুরফুরা শরিফ থেকেও। তবে নওশাদ বা আব্বাস কারও দেখাই পাননি।

হুমায়ুনের ‘ডেডলাইন’ 

JUP মানে জাপের সঙ্গে জোটের জন্য ভরতপুরের বিধায়কের আহ্বানকে পত্রপাঠ খারিজ না করলেও, তার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রবীণ বাম নেতা। জাপের সঙ্গে জোটের বিষয় নাকি বামফ্রন্টের আলোচনাতেই আসেনি! কিন্তু, জোটের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন হুমায়ুন। প্রায় একই কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন নওশাদও। হুমায়ুন বলছেন ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত কংগ্রেস, আইএসএফ, বাম, মিম সবার জন্য দরজা খোলা।  

এদিকে জাপ, আইএসএফের বাইরে, বিহারের সীমাঞ্চলে ফের সাফল্য পাওয়া আরও একটা দল ভোটমুখী বাংলায় জোটচর্চায়। তা হল মিম। মিমের দাবি তাঁরা নাকি জোটের বিষয়ে বামেদের সঙ্গে কথা বলে তেমন সাড়া পায়নি। তা মানছেন না সেলিম। ভাব বুঝে মিম বলছে, হুমায়ুনই তাদের বন্ধু! এদিকে অন্য় একাধিক রাজ্যের ভোট সমীকরণে নজর দিলে দেখা যাবে পকেট ভোটের খেলায় বারবারই সিদ্ধহস্ত মিম। একবার যে আসনে পা রেখেছে জিতে এসেছে সেখানে অন্যদের নাক গলানো বড্ড কঠিন হয়ে যায়। যে হুমায়ুনকে নিয়ে এত গদগদ মিম, সেই হুমায়ুনই আবার বলছেন বিজেপির সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী হতে আপত্তি নেই। এবার বিজেপির ছাপ মারা হুমায়ুনকে নিয়ে চললে চাপে পড়বে না তো বামেরা? অস্বস্তি বাড়বে না তো? প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। 

এদিকে জোট নিয়ে জাপ, মিম, আইএসএফ, বামের এমন মতিগতি দেখে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ নয, যেন বিদ্রুপে ব্যস্ত জোড়াফুল ও পদ্মফুল। তৃণমূল মুখপাত্র তন্ময় ঘোষ যেমন হুমায়ুনের আইডেন্ডিটি পলিটিক্সের কথা মনে করাচ্ছেন বামেদের। অন্যদিকে শুভেন্দু আবার বামেদের বলছেন তৃণমূলের বি টিম। তাঁর সাফ কথা, সিপিএম তো হিন্দু পাড়ায় ভোট কাটে। একই সুর সজল ঘোষ, শঙ্কর ঘোষদের গলাতেও। তাহলে তৃণমূল বিজেপির কথায় কি কান দেবেন বিমান-নওশাদ-হুমায়ুনরা? নাকি জোটের রাস্তায় হাঁটবেন? আর জোট যদি হয় তাহলে কবে? ভোট ঘোষণা হয়ে গেলে নাকি কেন্দ্রীয় বাহিনীর বুটের আওয়াজ শোনা গেলে? প্রশ্ন ঘুরলেও এখনও উত্তর নেই।