‘ঘড়ঘড়’ আওয়াজ করে আর আলো জ্বলে না! একসময় সাইকেলের চাকা ঘুরলেই কীভাবে জ্বলে উঠত এই ‘বোতল ডায়নামো’?
Bicycle bottle dynamo: এলইডি বা রিচার্জেবল লাইট নয়, চাকার সঙ্গে ডায়নামোর অবিরাম ঘর্ষণের চেনা ‘ঘড়ঘড়’ সুরেই একসময় আলোকিত হতো রাতের পথ। পুরনো দিনের সাইকেলে কীভাবে ম্যাজিকের মতো কাজ করত এই ছোট্ট জেনারেটর?

এখনকার সাইকেলের হ্যান্ডেলবারে লাগানো স্লিক ইউএসবি এলইডি লাইটের সঙ্গে এর কোনও তুলনাই চলে না। বিশ শতকের পুরনো সাইকেলে রাতের রাস্তায় সাইকেল ছোটানোর সংজ্ঞাটাই ছিল একেবারে আলাদা। কোনও ব্যাটারির বালাই ছিল না, পাওয়ার ব্যাঙ্কের ভাবনাও ছিল না। পথ চলতে ভরসা ছিল বিজ্ঞানের নিখাদ ম্যাজিক আর পায়ের জোর। সেই নস্টালজিক সন্ধ্যার স্মৃতিতেই আজও উজ্জ্বল এক যন্ত্র, ‘বোতল ডায়নামো’।
আজকের ভিন্টেজ সাইকেল সংগ্রাহকদের কাছে এই বোতল ডায়নামোকে আস্ত এক রোমাঞ্চ বলা চলে। ছবিতে দেখতে পাওয়া রূপোলি রঙের মেটালিক সিলিন্ডারগুলোতেই লুকিয়ে থাকত সেই পুরনো দিনের জাদু। ‘বারকো’ কিংবা ‘বোয়েন’-এর মতো বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এই কিটগুলো তখন সাইকেলপ্রেমীদের কাছে বেশ পরিচিত ছিল।
কীভাবে কাজ করত এই মিনি জেনারেটর?
প্রযুক্তিটা যে খুব জটিল ছিল তা একেবারেই নয়, অথচ একেবারে নিখুঁত ছিল। সাইকেলের পেছনের ফ্রেমে আটকানো থাকত ছোট বোতলজাতীয় যন্ত্রটি। অন্ধকার নামতেই ওপরের ছোট্ট খাঁজকাটা চাকাটি হাত দিয়ে ঠেকিয়ে দেওয়া হত টায়ারের সাইডওয়ালে। এবার প্যাডেলে পা চালিয়ে সাইকেল এগোনোর পালা। চাকার ঘূর্ণনে ডায়নামোর মাথার ছোট রোলারটিও দ্রুত গতিতে ঘুরত। ভেতরে থাকা চুম্বক ও কয়েলের আপেক্ষিক গতির ফলে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ইন্ডাকশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হত। সরু তার বেয়ে সেই শক্তি পৌঁছে যেত হ্যান্ডেলবারের টর্পেডো ধাঁচের ক্রোম হেডলাইটে। ব্যস, হলুদ নরম আলোয় ভরে উঠত গোটা রাস্তা।
এই ডায়নামো লাইটের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কিছু অভিজ্ঞতাও:
যত গতি, তত দ্যুতি: প্যাডেল যত জোরে ঘুরত, সাধারণত ডায়নামোর বিদ্যুৎ উৎপাদনও তত বাড়ত এবং হেডলাইটের তেজও বাড়ত। গতি কমলে আলোও নিভু নিভু হয়ে যেত।
পায়ের বাড়তি কসরত: ডায়নামোটি চাকার গায়ে চেপে বসতেই টায়ারের সঙ্গে রোলারের ঘর্ষণ তৈরি হত। ফলে প্যাডেলিং কিছুটা ভারী হয়ে যেত। সাইকেল চালাতে একটু বাড়তি কসরত করতেই হত।
হঠাৎ ব্ল্যাকআউট: পুরনো অনেক ডায়নামো লাইট সাইকেল চলার সময়ই বিদ্যুৎ তৈরি করত। তাই সাইকেল থামলে আলোও নিভে যেত। সিগন্যালে দাঁড়ালে কিংবা কোনও কারণে থেমে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই সামনে অন্ধকার নেমে আসত।
চেনা ‘ঘড়ঘড়’ আওয়াজ: টায়ারের সঙ্গে রোলারের অবিরাম ঘর্ষণেই তৈরি হত সেই গমগমে শব্দ। সেটাই ছিল রাতের নিঃশব্দ পথের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সুর।
কালের নিয়মে রিচার্জেবল লাইটের ভিড়ে ভারী ডায়নামো হয়তো ইতিহাস হয়ে গিয়েছে। যদিও এখন আধুনিক ভাবে কোথাও কোথাও এই ডায়নামোর দেখা মিলছে। কিন্তু টায়ারের খাঁজে আটকানো সেই রূপোলি বোতল আর প্যাডেলের জোরে পথ আলো করার অনুভূতি আজও সাইকেলপ্রেমীদের স্মৃতির সেলুলয়েডে অমলিন।
