Freedom Fighter Story: ব্রিটিশদের হাতে কানমোলা খেয়েছিলেন, হরতাল পোস্টার লাগিয়ে জরিমানা হয়েছিল ৬ টাকা, আজও স্বাধীনতার স্মৃতি উজ্জ্বল নবতিপর গুণধরের মনে
Independence Day: জীবনে কোনওদিন ফুলপ্যান্ট পরেননি তিনি। আজও পরেন সাদা খদ্দরের ধুতি ও পাঞ্জাবি। গান্ধীজিকে দেখেই এই জীবনচর্চা শুরু। বাবার মৃত্যুর পর গুণধর বাবুর বোনের বিয়ে হয় বলাগড়ে। তখন থেকেই তিনি চলে আসেন বলাগড়ে।

হুগলি: ব্রিটিশ পুলিশের হাতে কান মোলা খেয়েছিলেন, সরকারি অফিসে পোস্টার লাগাতে গিয়ে জরিমানা হয়েছিল ৬ টাকা ২৫ পয়সা। কোনদিনও ফুলপ্যান্ট পরেননি, আজও খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি পরেন বলাগড়ের স্বাধীনতা সংগ্রামী গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায়।
দেশে ৮০তম স্বাধীনতা দিবসের প্রস্তুতি চলছে। হর ঘর তিরঙ্গার কর্মসূচিও চলছে। সেই সময় বলাগড়ের গ্রামে বসে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলি মনে করছেন এক বৃদ্ধ। ৯২ বছর বয়সেও খদ্দর, সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতেই তাঁকে দেখা যায়। স্বাধীনতার স্মৃতি আর গান্ধীর আদর্শ আঁকড়ে থাকা মানুষটি আজও এলাকার কাছে এক প্রেরণার নাম।
স্বাধীনতার লড়াইয়ের দিনগুলি আজও স্মৃতিতে টাটকা। বলাগড়ের কামারপাড়ার বাসিন্দা গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সময়েরই জীবন্ত দলিল। তাঁর আদি বাড়ি ছিল হাওড়া জেলার আমতায়। গোটা পরিবারই ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
গুণধর বাবুর বাবা জয় কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও সামিল ছিলেন স্বাধীনতার আন্দোলনে। জয় কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়রা দুই ভাই। অপরজন বিজয় কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজয় কৃষ্ণের বড় ছেলে ঘনশ্যাম বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন গান্ধীজির অনুসারী। বাড়িতে চরকায় সুতো কাটতেন। ঘনশ্যাম বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর বন্ধুরা “মাতৃ পূজা”, “পলাশীর পরে’র মতো দেশাত্মবোধক যাত্রা ও গান করতেন।
জ্যাঠতুতো দাদা ঘনশ্যাম বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই স্বদেশী আন্দোলন শুরু করেন গুণধর। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকে পাঠশালায় পড়ার সময়েই যুক্ত হন আন্দোলনের সঙ্গে। মেদিনীপুরের আমদান গ্রাম থেকে পাঠশালায় পড়াতে আসতেন সত্য ও বিমান নামে দুই শিক্ষক। তাঁরাই ছাত্রদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করতেন। ২০ জন ছাত্রকে নিয়ে একটি দলও গঠন করেছিলেন।
স্বাধীনতা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ-
কিশোর বয়সেই বিপ্লবীদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতেন গুণধর। রাতের অন্ধকারে দোকানে ও সরকারি অফিসে “হরতাল” লিখে পোস্টার টাঙিয়ে আসতেন। একবার সরকারি অফিসে পোস্টার লাগানোর জন্য ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে ৬ টাকা ২৫ পয়সা জরিমানা করে। ১০ বছর বয়সে ব্রিটিশদের হাতে কান মোলাও খেতে হয়েছিল তাঁকে।
হুগলি তখন বিপ্লবীদের অন্যতম আস্তানা। দাদা ঘনশ্যামের মাধ্যমেই বৃন্দাবন চট্টোপাধ্যায়, প্রফুল্ল সেন, অজয় মুখোপাধ্যায়, ভূপতি মজুমদার, অতুল্য ঘোষের মতো নেতাদের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। একসময় মহাত্মা গান্ধী বাংলাদেশের নোয়াখালী যাওয়ার পথে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বজবজের চড়িয়ালে একটি সভায় এসেছিলেন, সেই সময় গুণধর বাবু তাঁকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ পান।
স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হন গুণধর বাবু। ১৯৬৪ সালে মহিপালপুর পঞ্চায়েতের উপপ্রধান নির্বাচিত হন। ১৯৭০-৭১ সাল থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত একই পঞ্চায়েতের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব সামলান। উপপ্রধান থাকাকালীন গ্রামের উন্নয়ন ও আলোচনার জন্য “গান্ধী ঘর” তৈরি করেন। ২৪টি গ্রামের মানুষ সেখানে বসে আলোচনা করতেন। এই কাজে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন ক্যাপ্টেন শচীন্দ্র লাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
জীবনে কোনওদিন ফুলপ্যান্ট পরেননি তিনি। আজও পরেন সাদা খদ্দরের ধুতি ও পাঞ্জাবি। গান্ধীজিকে দেখেই এই জীবনচর্চা শুরু। বাবার মৃত্যুর পর গুণধর বাবুর বোনের বিয়ে হয় বলাগড়ে। তখন থেকেই তিনি চলে আসেন বলাগড়ে।
দেশ গড়ার কাজে অবদানের জন্য অগ্রজ বিপ্লবী প্রফুল্ল সেন ও শান্তিমোহন রায়ের কাছ থেকে “রক্তরাঙা” একটি মেডেল পেয়েছিলেন গুণধর বাবু। সেই মেডেল আজও তাঁর কাছে স্বযত্নে রাখা আছে।
গুণধর বাবুর চামড়া কুঁচকে গিয়েছে বয়সের ভারে। মাথার চুলে সাদা পাক ধরেছে। শ্রবণশক্তিও কিছুটা কমেছে। চোখের চশমার পাওয়ারটা একটু বেড়েছে। তবুও মনের শক্তি এক ফোঁটাও কমেনি।
কাঁপা কাঁপা গলায় গুণধর বাবু বলেন, “হ্যাঁ আমি স্বাধীনতার লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। নয় বছর বয়স থেকেই বিপ্লবীদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করতাম। শিক্ষকরা আমাদের যেভাবে বুঝিয়ে দিতেন, আমরা সেই ভাবেই পোস্টার লাগাতাম। চারটি শব্দের হরতাল লিখে টাঙিয়ে দিয়ে আসতাম দোকানে। পোস্টার দিতে গিয়ে আমার নামে জরিমানা হয়ে গিয়েছিল। আমার পরিবার স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কোনওদিন প্যান্ট পরিনি। কারণ আমি গান্ধীজির আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলাম। বাড়িতে চরকায় সুতো কাটা হত। খদ্দরের কাপড় পরতাম। সেই সময়ে ৬ টাকা ২৫ পয়সা জরিমানা করেছিল ব্রিটিশ পুলিশ।”
গুণধর বাবুর তিন ছেলে। ছোট ছেলে মাধব বন্দ্যোপাধ্যায় স্কুল শিক্ষক। তিনি বলেন, “আমাদের পরিবারের সকলেই গান্ধীজির স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। বাড়ির মেয়েরাও চরকায় সুতো কাটার কাজে যুক্ত ছিলেন। বাবা যাদের কাছে পাঠশালায় পড়তেন, সেই শিক্ষকরাও ছিলেন বিপ্লবী। ছোটবেলা থেকেই বাবা গান্ধীর আদর্শ সামনে রেখে চলেন, তাই এখনও পর্যন্ত ফুল প্যান্ট পরেননি। খদ্দরের ধুতি পাঞ্জাবি পড়েন।”
বলাগড়ের আঞ্চলিক গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “স্বাধীনতা সংগ্রামী গুণধর বন্দ্যোপাধ্যায়। ছাত্র অবস্থাতেই তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন।”
