AQI
TV9 Network
User
Sign In

By signing in or creating an account, you agree with Associated Broadcasting Company's Terms & Conditions and Privacy Policy.

Bengali Emotion in West Bengal Politics: কে কত বড় বাঙালি? নববর্ষে কতটা ধার বাড়ল বাঙালিয়ানার?

BJP West Bengal Elections: বাংলা নববর্ষের আবহে যখন চারদিকে উৎসবের মেজাজ, ঠিক তখনই রাজনীতির ময়দানেও চলছে 'বাঙালি আবেগ' ছোঁয়ার এক আপ্রাণ চেষ্টা। নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বিজেপি শীর্ষ নেতারা এবার সরাসরি হাতিয়ার করছেন বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, একইসঙ্গে কাজে লাগানো হচ্ছে নববর্ষের সেন্টিমেন্টকে।

Bengali Emotion in West Bengal Politics: কে কত বড় বাঙালি? নববর্ষে কতটা ধার বাড়ল বাঙালিয়ানার?
রাজনৈতিক মহলে চাপানউতোর Image Credit: TV 9 Bangla GFX & Gemini
| Edited By: | Updated on: Apr 15, 2026 | 3:09 PM
Share

কমল খিলেগি, নাহ! এবার ভোটে পদ্ম ফুটবে… বলছেন বিজেপি নেতারা। বহিরাগত নয় বরং ভূমিপুত্রই হবেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। বঙ্গাল নয়, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। এবারের ভোট প্রচারে বিজেপির একেবারে শীর্ষনেতাদের বাচনভঙ্গিতে পরিবর্তনটা লক্ষ্য করেছেন? টানা বাংলা বলছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর তাও আগের থেকে অনেক অনেকটাই স্পষ্ট। শুভেন্দু বলছেন, অঙ্গ-কলিঙ্গ আগেই হয়েছে এবার রাম নাম করে বঙ্গ জয়টাও হয়ে যাবে। কিন্তু যে ভাজপাকে বারবরই বহিরাগত, হিন্দি বলয়ের শক্তি হিসাবে দেগে দিয়েছে তৃণমূল-বামেরা, তাঁরাই কিন্তু এখন লাইন বদলে কবেই যেন ‘বঙ্গ বিজেপি’ হয়ে উঠেছে। 

বাংলা নববর্ষের আবহে যখন চারদিকে উৎসবের মেজাজ, ঠিক তখনই রাজনীতির ময়দানেও চলছে ‘বাঙালি আবেগ’ ছোঁয়ার এক আপ্রাণ চেষ্টা। নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বিজেপি শীর্ষ নেতারা এবার সরাসরি হাতিয়ার করছেন বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, একইসঙ্গে কাজে লাগানো হচ্ছে নববর্ষের সেন্টিমেন্টকে। সোজা কথায়, তৃণমূলের ‘বহিরাগত’ তত্ত্বকে ভোঁতা করতে এবার বিজেপির হাতিয়ার ‘বাঙালি আবেগই’। হিন্দি বলয়ের দল, এই পরিচিতি ভেঙে বাংলার মানুষের মন বুঝতে এবং বোঝাতে সরাসরি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আশ্রয় নিচ্ছেন মোদী-শাহরা। ভোট প্রচারের শুরু থেকেই একের পর এক প্রচারে বাংলায় কথা বলতে দেখা গিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে।  

ভোটের ময়দানে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে পদ্ম-শিবিরের মুখে ‘বাংলা’ বন্দনা। জনসভা থেকে শুরু করে ভার্চুয়াল বৈঠক— সব জায়গাতেই উঠে আসছে বাংলা ভাষা আর বঙ্গ সংস্কৃতির কথা। মোদীজি তাঁর দলের কর্মীদের স্পষ্ট বলেই দিয়েছেন, ‘যেখানেই যাবেন মানুষের সঙ্গে দেখা করবেন, তাদের বলবেন, মোদীজি এসেছিলেন, আর মোদীজি পরিবারের সবাইকে পয়লা বৈশাখের শুভকামনা জানিয়েছেন।’ 

বাঙালি আবেগেই ভোঁতা হবে বহিরাগত তত্ত্ব? 

আসলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত কয়েক বছরে একটি বড় মাপের রূপান্তর দেখা গিয়েছে। একসময় যেখানে বামপন্থী মতাদর্শ, শ্রেণি সংগ্রাম বা নিছক উন্নয়নই ছিল ভোটের মূল নির্ণায়ক, সেখানে বর্তমানে ‘বাঙালি আবেগ’ বা ‘বাঙালি অস্মিতা’ রাজনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। এই তো কদিন আগে একের পর এক রাজ্যে বাঙালির পরিযায়ী শ্রমিক হেনস্থায় বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছিল তৃণমূল। বেছে বেছে কেন বাঙালিদেরই বাংলাদেশি বলে টার্গেট করা হচ্ছে সেই প্রশ্ন তোলা হয়েছিল রাজপথে। যদিও সেসব এখন কিছুটা অতীত। উল্টে বাঙালি আবেগকেই ভোটের ঠিক আগে পুরোদমে শান দিতে চাইছে বিজেপি। সোজা কথায়, শেষ বিধানসভা ভোট বা লোকসভা ভোট থেকে যে শিক্ষা নিয়েছিল বিজেপি সেটাই এবার ময়দানে কাজে লাগাতে চাইছে। কীরকম শিক্ষা? 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দাক্ষিণাত্যের মতো বাংলারও যে হিন্দির প্রতি একটা সহজাত প্রতিরোধ রয়েছে তা আগে টের না পেলেও বা টের পেলেও খুব একটা পাত্তা দিতে চায়নি বঙ্গ বিজেপি। বারবার প্রচারে উড়ে এসেছেন ভিন রাজ্যের পদ্ম নেতারা। টানা প্রচার করে গিয়েছেন হিন্দিতে। কিন্তু এবারও কী ভিন রাজ্যের সব স্টার ক্যাম্পেনাররা আসেননি? এসেছেন তো, এই যেমন যোগী আদিত্যনাথ, স্মৃতি ইরানির মতো তাবড় তাবড় নেতারা। ফোকাসেও থেকেছেন। কিন্তু দেখবেন মূল ফোকাসটা কিন্তু অন্যত্র। উল্টে অনেক বেশি জোর মোদী-শাহের প্রচারে। প্রথম দফাযতেই নরেন্দ্র মোদীর ১১টি কর্মসূচি। অমিত শাহর কর্মসূচির সংখ্যা সেখানে ৩০টি। সেখানে বাংলা বলা বিপ্লব কুমার দেবের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা সেখানে ৮টি। আর মানিক সাহার ক্ষেত্রে কিন্তু ৯। 

আর শুরু থেকে শেষ, মোদীর ডেপুটি শাহের কিন্তু একটা প্রতিজ্ঞা– অনুপ্রবেশকারী দূর হাটো। অর্থাৎ, বাঙালি বিপন্ন বাংলাদেশি অনুুপ্রবেশকারীদের হাতেই। আর বিজেপি এলেই নির্মুল হবে এই সমস্যা। গোটা বাংলা জুড়ে সোচ্চারে বলে চলেছেন সেই কথা। এদিকে বাঙালি বরাবরই তার নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভোটের আবহে রাজনৈতিক দলগুলি এই সংবেদনশীলতাকেই কাজে লাগিয়েছে। আগের ভোটগুলির দিকে নজর দিলে দেখা যাবে তৃণমূলের মতো দলগুলি বরাবরই বিজেপির মতো দলগুলির বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের সংযোগহীনতাকেই প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তৃণমূলের সোজা কথা, বাংলার সেন্টিমেন্ট তোমরা বোঝো না। উল্টে, “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়”-এর মতো স্লোগান ব্যবহার করেই প্রচারের ময়দানে ঝড় তুলেছিল তৃণমূল। বাঙালির সঙ্গে তাঁদের আবেগ ঠিক কতটা গভীর গাঁথা তাই বোঝানো হয়েছে একের পর এক প্রকল্পের নামে, প্রচারে, স্লোগানে। ‘কন্যাশ্রী’, ‘রূপশ্রী’ বা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো প্রকল্পগুলির নামকরণের মধ্যেই বাংলার নিজস্ব পারিবারিক এবং সাংস্কৃতিক ছোঁয়া রয়েছে। এসেছে ‘জয় বাংলার’ মতো স্লোগান। একদিকে বহমান ইতিহাস অন্যদিকে ঘটমান রাজনীতি। মিলেমিশে একাকার। সমাজ চিন্তন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের, এই কায়দায় প্রচার যে সাধারণ বাঙালির মনস্তত্ত্বে গভীরভাবে প্রভাব ফেলবে তা জানে তৃণমূল। কারণ, চায়ের ঠেকে তুমুল তর্ক সেরে বাড়ি ফিরে সলিল চৌধুরী, দীর্ঘদিন থেকে এই লাইনেই বাজিমাত করে এসেছিল বামেরা। এবার তৃণমূলের সেই চেনা ছকটা যেন অনেকটাই ধরে ফেলেছে বিজেপি। সে কারণে শুরু থেকেই বাঙালিয়ানায় শান। 

অমিত শাহ তো বলেই দিয়েছেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলছি, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে কোনও বহিরাগত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হবেন না। বাংলায় জন্ম, বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করেছেন, এ রকমই কোনও বাঙালি বিজেপি নেতা এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হবেন।’ 

‘আবার জিতবে বাংলা?’

কিন্তু তৃণমূল বলছে, ‘যতই করো হামলা আবার জিতবে বাংলা’। এবার তাঁদের প্রচারের অন্যতম লাইন এটাই। কেন্দ্রীয় বঞ্চনা থেকে শুরু করে বাঙালি হেনস্থা, ইডি-সিবিআই, সব কিছু নিয়েই তোপের পর তোপ দেগে চলেছেন মমতা-অভিষেক। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা স্বামী বিবেকানন্দের মতো মণীষীদের নাম, তাঁদের আদর্শ বারবার হয়েছে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার। মুখ্যমন্ত্রীর নববর্ষের প্রচারের সুরটাও যেন সেই একই লাইনে বাঁধা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখছেন – ‘আমাদের বাংলা যেমন শিল্প-সংস্কৃতির পীঠস্থান, তেমনই সর্বধর্ম সমন্বয়ের পীঠস্থান। কিছু অশুভ শক্তি এই বাংলাকে কলুষিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে দিল্লির জমিদাররা। মনে রাখবেন, এদের গণতান্ত্রিকভাবে জবাব দিতে হবে।’ 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভাষা ও আঞ্চলিক আবেগ ধীরে ধীরে একটি নরমপন্থী আঞ্চলিকতাবাদের জন্ম দিয়েছে, যা সাধারণ ভোটারদের মনে এই বিশ্বাস তৈরি করে যে, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষারক্ষার জন্য আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির প্রতি সমর্থন প্রয়োজন। আবার অন্যদিক থেকে দেখলে জাতীয় স্তরে ধর্ম বা জাতপাতের ভিত্তিতে যে মেরুকরণের রাজনীতি দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গে তার মোকাবিলা করার জন্য বরাবরই বাঙালি আবেগকে একটি রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সর্বভারতীয় হিন্দুত্বের আখ্যানের বিপরীতে ‘বাঙালি হিন্দু’ বা ‘বাঙালি মুসলিম’-এর যে একটি নিজস্ব ধর্মনিরপেক্ষ, উৎসবমুখী এবং মিশ্র সংস্কৃতির ইতিহাস রয়েছে, ভোটের ময়দানে তাকেই বারবার তুলে ধরা হয়। এখন বিধানসভা ভোটের আবহে ‘বাঙালি আবেগ’ আর কেবল সাহিত্য বা সংস্কৃতির মধ্যে আবদ্ধ নেই, এটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এখন দেখার দিল্লির ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের বিপরীতে তৃণমূলের বাংলার স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে ভোট বাক্সে কোন দল কতটা ছাপ ফেলতে পারে। 

Follow Us