কলকাতা: একুশের বিধানসভা ভোটে বাম-কংগ্রেস-আইএসএফের ‘যৌথমঞ্চ’ মুখ থুবড়ে পড়ার পর একাধিকবার প্রদেশ সভাপতি অধীর চৌধুরী (Adhir Chowdhury) বলেছেন, আইএসএফের সঙ্গে তাঁদের কোনও জোট ছিল না। জোট ছিল সিপিএমের সঙ্গে। অন্যদিকে বাম শরিকরাও এই জোটে আইএসএফের থাকা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছিল। তবে বারবার আইএসএফকে এভাবে ‘কাঠগড়া’য় তোলা হলেও, নওশাদ সিদ্দিকি (Naushad Siddiqui) জোরালভাবে কোনওদিনই এ নিয়ে কিছু বলেননি। তবে এবার টিভি নাইন বাংলায় এ নিয়ে অধীরকে খোলামেলা নিশানা করলেন একমাত্র আইএসএফ বিধায়ক তথা সংযুক্ত মোর্চার একমাত্র জয়ী প্রার্থী নওশাদ সিদ্দিকি। তাঁর স্পষ্ট কথা, আচমকা একদিনে সংযুক্ত মোর্চা তৈরি হয়ে গিয়েছে এমন নয়। বাম ও কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনার পরই একুশের সেই সংযুক্ত মোর্চা তৈরি হয় বলে এদিন স্পষ্ট করেন নওশাদ।
রাজ্য রাজনীতি নিয়ে যারা ওয়াকিবহাল, ২০২১-এর ব্রিগেডের সেই ছবি তাদের চোখের সামনে এখনও স্পষ্ট। রবিবারের এক দুপুর। চারদিক লাল পতাকা ও হাত পতাকায় ছয়লাপ। মঞ্চে তখন বক্তব্য রাখছেন কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী। রয়েছেন সূর্যকান্ত মিশ্র, বিমান বসুরা। হঠাৎই মহম্মদ সেলিমের হাত ধরে সেই ব্রিগেড মঞ্চে উঠলেন আইএসএফ প্রধান আব্বাস সিদ্দিকি। সঙ্গে নওশাদও। ‘ভাইজান ভাইজান’ বলে তারস্বরে চিৎকার দর্শকের আসন থেকে। আব্বাসকে দেখে এগিয়ে এলেন সূর্যকান্ত মিশ্র। আব্বাসের সঙ্গে হাত মেলালেন বিমান বসুও। এরপরই আচমকা মঞ্চের পরিবেশে বদল। বক্তব্য থামিয়ে দিলেন অধীর চৌধুরী। বোঝাই গিয়েছিল, কোথাও তাল কাটল। এরপর জল গড়িয়েছে বহু দূর। সে তাল এখনও বেতালই।
বুধবার টিভি নাইন বাংলাকে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি স্পষ্ট জানান, আইএসএফের সঙ্গে কংগ্রেসের জোটের কোনও প্রশ্নই নেই। অন্যদিকে সিপিএম বারবারই আইএসএফের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার পক্ষে। নওশাদ সিদ্দিকি গ্রেফতার হওয়ার পর পথে নেমেছিল তারা। এই আবহে পঞ্চায়েত ভোটের আগে বীরভূমের সিউড়িতে আজ এক মঞ্চে সভা সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ও প্রদেশ সভাপতি অধীর চৌধুরীর। আরও এক ভোটের আগে জোটের বার্তার সম্ভাবনা প্রবল। তাহলে এ ভোটে কি একাই লড়তে হবে আইএসএফকে? এ প্রশ্নের জবাবে টিভি নাইন বাংলাকে দলের একমাত্র বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি বলেন, একুশের ভোটের আগে যে সংযুক্ত মোর্চা তৈরি হয়েছিল, তা হঠাৎ করে হয়নি। একাধিকবার বাম-কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই হয়েছে।
এর আগে বারবারই অধীর চৌধুরী দাবি করেছেন, সিপিএমের সঙ্গে আইএসএফ জোট করেছিল, কংগ্রেস নয়। কিন্তু নওশাদ সিদ্দিকির বক্তব্য, “একাধিকবার বামেদের শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা আব্দুল মান্নান, প্রদীপ ভট্টাচার্যের সঙ্গে বসে আসন নিয়ে আলোচনার ভিত্তিতেই হয়েছে। সুতরাং এখন যদি কেউ বলে আইএসএফের সঙ্গে কারও জোট ছিল না, তিনি কতটা অসত্য কথা বলছেন, কতটা সত্যি বলছেন, সেটা মান্নানসাহেব, প্রদীপবাবুরাই ভাল বলতে পারবেন। তখন কিন্তু কেউ কোথাও বিরোধিতা করেননি। অধীরবাবুকেও বিরোধিতা করতে দেখা যায়নি।”
২০২১ সালে রাজ্য বিধানসভা থেকে মুছে যায় সিপিএম, কংগ্রেস। হালে সাগরদিঘি উপনির্বাচনে বায়রন বিশ্বাসের জয় কংগ্রেসকে একটা আসন দিল। একুশের ফল খারাপ নিয়ে আইএসএফকে ‘দোষারোপ’ করা হলেও নওশাদ এ দায় কাঁধে নিতে নারাজ। তাঁর কথায়, “রেজাল্ট খারাপ হয়েছিল। তৃণমূল, বিজেপিকে আমরা হারাতে পারিনি। একইসঙ্গে বুথস্তর পর্যন্ত জোটের গুরুত্ব বোঝাতে না পারার জন্য ফল খারাপ হয়েছে। সেটাকে নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মন্তব্য করা হয়েছে। তেমনই আমাদের মধ্যেও সমস্যা ছিল। জোট করলে বাংলার মানুষ কী পেতে পারে আমরা তো বুথস্তরে তা মানুষকে বোঝাতে পারিনি। আমরা বরং একে অপরের সঙ্গে জোটে থাকার পরও সহযোগিতা করিনি। তার জন্যই তো জোটের সুফল হয়নি। জোটের গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে যদি ভোটের ময়দানে থাকতাম, আশা করছি ভাল ফল হতো। প্রাধান্য দিইনি। ধরি মাছ না ছুঁই পানি হয়েছে। মান্নানসাহেব, প্রদীপবাবুরা জোট করছেন আর অধীরবাবু বা অন্য কংগ্রেস নেতা বলছেন আমরা জোট করিনি। কংগ্রেস কর্মীরা দ্বিধায় পড়েছেন। সাধারণ ভোটারও দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। অন্যদিকে ফরওয়ার্ড ব্লকের মতো দলেও অবাঞ্ছিত মন্তব্য করে বেড়াচ্ছিল। সমগ্র বিষয়টাকে নিয়ে একটা হচপচ হয়ে গিয়েছিল।”
এদিন নওশাদ বুঝিয়ে দিলেন, কোনওভাবেই আর আইএসএফকে কাঠগড়া তুলে হারের দায় ‘বাইপাস’ করা যাবে না। ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়কের কথায়, “কেউ বলেছিল ভোট শেষ জোট শেষ। কেউ বলছে জোট ছিল না। ও নিয়ে ভেঙে পড়ি না। মানুষের অধিকারের জন্য রাজনীতি করি। তার জন্য ত্যাগেও রাজি। তবে আত্মসম্মান বিকিয়ে নয়। আমরা আমাদের জায়গায় প্রার্থী দেব। সেটা মালদহ, মুর্শিদাবাদ হোক, দিনাজপুর, হাওড়া, হুগলি, দুই ২৪ পরগনা থেকে বাঁকুড়া, নদিয়া, বীরভূম। আমরা যেখানে প্রার্থী দেব, সেই সব জায়গাগুলোতে আমরা সংগঠন মজবুত করেছি।”
বৃহস্পতিবার বীরভূমে সেলিম-অধীর এক মঞ্চ থেকে বক্তব্য রাখলেও ডাক পাননি নওশাদ। তাহলে কি এবার আর জোটের মঞ্চে ডাক পাবেন না তাঁরা? নওশাদের কথায়, মানুষের দাবির পাশাপাশি সময়েরও দাবি, সরকার বিরোধী জোট হোক। এ নিয়ে আইএসএফের রাজ্য কমিটিতে আলোচনাও হচ্ছে। তবে শুধু কংগ্রেস, সিপিএম নয়, প্রয়োজনে সমমনস্ক যে কোনও দলই জোটে শামিল হতে পারে। নওশাদের কথায়, “কোন জোট কতটা সফল তা মানুষের উপর নির্ভর করবে। তবে আমি পজিটিভ চিন্তাধারায় বিশ্বাসী। আশা করব ভালই হবে। তবে সমস্ত স্তরে সঠিক বার্তা পৌঁছনো খুব দরকার। না হলে যে যার হাত ধরুক, ভোটের বাক্সে সে ফল আসবে না। আর ওই ধরি মাছ না ছুঁই পানি মার্কা কথাবার্তা আমার ভাল লাগে না।”