Third Gender: পৌরুষ দেখাতে অন্যকে হিজড়ের সঙ্গে তুলনা, সংবিধানকেই অপমান করছেন না তো দিলীপ-কুণালরা? প্রশ্ন বৃহন্নলাদের

'বাড়ি বাড়ি ঘুরে হাততালি কারা দেয়? জানেন তো?' দিলীপ ঘোষের এমন মন্তব্য়ের জবাবে কুণাল ঘোষ বলেছেন, 'শুভেন্দু অধিকারীর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরীক্ষা করে দেখুন!' কেন বৃহন্নলারা আজও অপমানের সমার্থক? কী বলছেন সমাজকর্মীরা?

Third Gender: পৌরুষ দেখাতে অন্যকে হিজড়ের সঙ্গে তুলনা, সংবিধানকেই অপমান করছেন না তো দিলীপ-কুণালরা? প্রশ্ন বৃহন্নলাদের
অলংকরণ- অভীক দেবনাথ

কলকাতা: ভারতে বছর কয়েক আগে তৃতীয় লিঙ্গের (Third Gender) মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন বৃহন্নলারা। শুধু তাই নয়, অনেক সরকারি বা বেসরকারি ক্ষেত্রেই ক্রমে স্বীকৃতি পাচ্ছেন সেই সব মানুষরা। চেনা চিত্রের বাইরে বেরিয়ে আজ বৃহন্নলারা সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। কেউ আইনজীবী, কেউ শিল্পী। তবু আজও তাঁদেরকে আর পাঁচজনের মধ্যে ফেলতে অসুবিধা হয় সমাজের একটা বড় অংশের মানুষের। কাউকে অপমান করার জন্য বৃহন্নলাদের প্রসঙ্গ টেনে আনা আজও একটা অভ্যাস। তবে রাজনৈতিক নেতা বা জন প্রতিনিধিদের মুখে এই ধরনের কথা খুব একটা অভিপ্রেত নয়। উদাহরণ রয়েছে ভুরি ভুরি। আজই একে অপরের দিকে কাদা ছোড়াছুড়ি করতে গিয়ে সেই বৃহন্নলাদেরই ইঙ্গিত করেছেন বিজেপি সাংসদ দিলীপ ঘোষ ও তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ।

এই মন্তব্যের নিন্দা করেছেন অনেকেই। প্রতিনিধিরাই যদি এমন কথা বলেন, তাহলে সাধারণ মানুষ কী ভাবে সম্মান করবে বৃহন্নলাদের? সেই প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে যখন সুপ্রিম কোর্ট স্বীকৃতি দিয়েছে, তখন কী ভাবে রাজনৈতিক নেতারা এমন কথা বলছেন!

বিজেপির কেন্দ্রীয় সর্বভারতীয় সহ সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, “তৃণমূল সাংসদরা অমিত শাহের বাড়ি গিয়ে হাততালি দিচ্ছেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে হাততালি কারা দেয়? জানেন তো?” এই মন্তব্যের জবাব দিতে গিতে পিছপা হননি কুণাল ঘোষও। স্ব-বিরোধী মন্তব্য করে বসেছেন তিনি। এক দিকে বড় গলা করে বলেছেন, “যাঁদের ইঙ্গিত করে কুরুচিকর মন্তব্য করলেন দিলীপ, তাঁরাও আমাদের সমাজের অঙ্গ।” আবার নিজেই সেই একই প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, “দিলীপবাবু হাততালি দিয়ে প্রতিবাদে যদি ওই ধরনের চিন্তা মাথায় আসে, তাহলে যান আপনাদের নব্য সনাতনী শুভেন্দু অধিকারী যেভাবে হাততালি দিয়ে নিজেকে সনাতনী প্রমাণে কীর্তন করেন, তাঁরও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পরীক্ষা করে দেখুন! আপনার ইঙ্গিতটা সেদিকেও যেতে পারে!”

এমন মন্তব্য যে আদতে সুপ্রিম কোর্টকে অপমান, সংবিধানকে অপমান, তেমনটাই মনে করছেন রূপান্তরকামী বোর্ডের সদস্য রঞ্জিতা সিনহা। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ দিন লড়াইয়ের পর আজ আমরা সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অধিকার পেয়েছি।’ তিনি নিজে সরকারি একটি হোম চালান যেখানে সেই সব বৃহন্নলাদের আশ্রয় দেওয়া হয়, যাঁদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরা লড়াই করে নিজেদের তাগিদটাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। সেখানে যাঁরা আমাদের নিয়ে কাজ করবেন, যাঁরা আমাদের প্রতিনিধি, তাঁরা এই ধরনের কথা বললে মানুষকে কী বোঝাব?’

বেশ কয়েক বছর আগে সিপিএমকে আক্রমণ করতে গিয়ে ফিরহাদ হাকিমও এমন কটূক্তি করেছিলেন বলে মনে করিয়ে দিয়েছেন রঞ্জিতা সিনহা। তিনি জানান, সে সময় তাঁরা মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তাঁর কথায়, ‘এখনও আমরা সমাজের সবথেকে পিছিয়ে পড়া সদস্য। যারা আমাদের প্রতিনিধি, যাঁদের কাজই আমাদের প্রতিনিধিত্ব করা, তাঁরা নিজেরা জানেন না, কী ভাবে পুরুষ বা মহিলাদের সম্মান দিতে হয়। সুপ্রিম কোর্ট যখন আমাদের পক্ষে রায় দেয়, তখন সেই রায়কে অবমাননা করার জন্য এদের প্রতি ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ, এদের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়া উচিৎ।’

তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ‘রাজ্য সরকারের ট্রান্সজেন্ডার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড হয়েছে। কেন্দ্র দেশব্যাপী হোম চালাচ্ছেন। সে সব কী তাহলে লোক দেখানো?’ রঞ্জিতা সিনহা বলেন, ‘এখন তো মানুষ পশুদের অধিকার নিয়েও এত কথা বলে, সেখানে কি আমাদের মানুষ বলে গণ্য করা হয় না? প্রতিনিধিরা যখন এমন কথা বলেন, তখন আমরা কোথায় প্রতিবাদ করব?’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতারা চুরি করলে তো আমরা হাসাহাসি করি না, করলে আমাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অথচ আমাদের অধিকার নিয়ে এ ভাবে হাসাহাসি করা হয়।’

সমাজকর্মী শাশ্বতী ঘোষ অবশ্য মনে করছেন, এ ঘটনা নতুন নয়। আর অপমান করতে গিয়ে রূপক হিসেবে যে শুধু রূপান্তরকামীদের কথা বলা হয় এমনটাই নয়। শাশ্বতী ঘোষ উল্লেখ করেছেন, রাজনৈতিক নেতারা ‘চুড়ি পরে থাকা’, ‘ঘোমটা দেওয়া’, এমন কথাও ব্যবহার করেন কাউকে অপমান করার জন্য। তাঁর কথায়, ‘রাজনীতির লোকেরা সব সময় ওই পুরুষ সিংহের বাইরে সবাইকেই নীচু দরের বলে মনে করেন।’ তাঁর দাবি, তৃণমূল নেত্রী নিজে যখন একজন মহিলা, তখন সেই দলের নেতাদের অপমানের জন্য ওই জনগোষ্ঠীকে টেনে আনতে হয়। তিনি বলেন, ‘কেউ কিছু বললে আমরা হইহই করি, বাকি সময় আমরাও মনের মধ্যে এই রকম ধারনা পোষণ করি।’

শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহারের মতে, ‘রাজনৈতিক নেতাদের কথা মানুষ শুনতে হয় বলে শোনে, তাঁদের কথায় যে বিশেষ গুরুত্ব দেয় এমনটা নয়।’ তিনি বলেন, ‘এমন কথা বলেছেন বলে আমার মনেও কোনও হতাশা জাগেনি। মানুষের মধ্যেও কোনও হতাশা জাগবে বলে মনে করি না। কারণ, এই নেতারা কখনই কোনও কথার মর্মার্থ উপলব্ধি করে বলেন না। এরা যে একটা ধারা তৈরি করছেন, তা সব শ্রেনির মানুষের জন্য হতাশাজনক।’ মীরাতুন নাহার উল্লেখ করেছেন, ‘হাততালি দেন বলে যাদের কথা বলা হয়েছে, তাঁরা তথাকথিক পুরুষ বা মহিলা নয়, তবে তাঁরা সর্বাঙ্গীন মানুষ, তাঁদের প্রতি কটাক্ষ করে এরা নিজেদের মূর্খতা প্রকাশ করেছেন, অহমিকা প্রকাশ করেছেন। তাই আমাদের কাছে দুজন শীর্ষ স্থানীয় নেতার ওই ধরনের মন্তব্য় নিন্দনীয়।’

উল্লেখ্য, শুধু বাংলা বা ভারত নয়, বিশ্ব জুড়ে তৃতীয় লিঙ্গের সম্মানের স্বার্থে লড়াই জারি রয়েছে। একজন মানুষের ন্যুনতম অধিকার থেকে তারা আজও বঞ্চিত হয় অনেক জায়গায়। আজও গালিগালাজ হিসেবে ব্য়বহার করা হয় বৃহন্নলাদের কথা। বিভিন্ন সময়ে গর্জে উঠেছেন অনেকে। একটু একটু করে বদলের লড়াই আজও তারা লড়ে যাচ্ছে। কিন্তু, আজ দিলীপ ঘোষ বা কুণাল ঘোষের বক্তব্য় মনে করিয়ে দিয়েছে ধারনা এখনও একই আছে, বদল শুধু খাতায় কলমে!

আরও পড়ুন: ‘নির্বাচন স্থগিত চরম এবং শেষ পদক্ষেপ’, ২৫ নভেম্বরই ত্রিপুরায় পৌরভোটের নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টে

Click on your DTH Provider to Add TV9 Bangla