
এক সময়ে ফরাসিদের রাজত্ব চলেছে এই ছোট্ট রাজ্যে। এখন আলোর দাপাদাপিতে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার পালা। বরাবরই আলোর শহর হিসেবে পরিচিত চন্দননগরে মাতৃরূপে পূজিত হন জগজ্জননী জগদ্ধাত্রী। উমা হেমাবতী এখানে পূজিত হন।

বাঙালি হিন্দু সমাজে জগদ্ধাত্রী পুজো একটি বিশিষ্ট ধর্মীয় অনুষ্ঠান বলা যেতে পারে। ধর্মীয় মানসে রাজসিক দেবী দুর্গা ও তামসিক দেবী কালীর পরেই সত্ত্বগুণের দেবী জগদ্ধাত্রীর স্থান। জগদ্ধাত্রী পূজা তান্ত্রিক পূজা।

দুটি প্রথায় এই পূজা হয়ে থাকে। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী – এই তিন দিন জগদ্ধাত্রীর পূজা হয়ে থাকে।। কোথাও কোথাও প্রথম বা দ্বিতীয় পূজার পর কুমারী পূজারও আয়োজন করা হয়। দুর্গাপূজার ন্যায় জগদ্ধাত্রী পূজাতেও বিসর্জনকৃত্য বিজয়াকৃত্য নামে পরিচিত।

চাউলপট্টি, কাপড়েপট্টি, বাজারের মত অন্যতম প্রাচীন ও সেরা পুজো হলে ভদ্রেশ্বরের তেতুঁলতলা জগদ্ধাত্রী পুজো। স্থানীয়দের মত, পুজোর অধিষ্ঠিত দেবী অত্যন্ত জাগ্রত। তাই নিষ্ঠাভরে ও নিয়ম মেনে পুজো করার রীতি রয়েছে। পুজোয় পুরোহিতই থাকেন প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন। অত্যন্ত জাঁকজমক করে পুজো করা হয় এখানে।

পুজোর দিনে বিশেষ করে নবমীর দিন এখানে বলি দেওয়ারও রেওয়াজ ছিল। বর্তমানে এই নিয়ম না থাকলেও কুমড়ো, শসা বলি দেওয়া হয়। পুজোর দিনে দেবীকে সাজানোর জন্য সোনা, রূপোর গয়না, দামি বেনারসি শাড়ি পরানো হয়। এছাড়া আরও ১৫০টিরও বেশি বেনারসি দিয়ে দেবীর বস্ত্র তৈরি করা হয়।

দেবীর গায়ের রং প্রভাতসূর্যের মতন। এই মূর্তি ত্রিনয়না, চতুর্ভূজা, রক্তাম্বরা, সালংকারা, নাগযজ্ঞোপবীতধারিনী ও দেব-ঋষিগণ কর্তৃক অভিবন্দিতা এক মঙ্গলময়ী মহাদেবীর মূর্তি। তিনি সিংহবাহিনী, তবে দুর্গার মতো জগদ্ধাত্রী দশভূজা নন চতুর্ভুজা, নানা আভরণভূষিতা, অরুণকিরণবৎ বর্ণযুক্তা এবং সর্পরূপ যজ্ঞোপবীতধারিণী। তাঁর বাম দিকের দুহাতে থাকে শঙ্খ ও ধনু এবং ডান দিকের দুহাতে থাকে চক্র ও পঞ্চবাণ। রক্তবর্ণের বস্ত্র তাঁর পরিধানে।

তেঁতুলতলার পুজোয় পুরুষরা দেবীকে বিদায়ের সময় বরণ করেন। হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন। মহিলাদের মত আটপৌরে করে শাড়ি পরে , সিঁদুর পরে দেবীবরণ করেন তাঁরা। কিন্তু কেন এই ব্যতিক্রমী নিয়ম নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক।

জানা যায়, ১৭৬৩ সাল রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দেওয়ান দাতারাম সুর এই পুজোর সূচনা করেন। কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির পুজোর একবছরের পরই এখানে জগদ্ধাত্রী পুজো চালু হয়। বর্তমানে এই পুজোর বয়স ২৩০ বছর। দাতারামের দুই কন্যা ছিলেন। তাঁরাই পুজোর সব কাজ করতেন। কিন্তু মেয়েদের প্রয়াণের পর ভদ্রেশ্বরের মানুষরা পুজোর ভার নেন। ২ কন্যার স্মরণেই মহিলার বেশে পুরুষরা বরণের এই অভিনব প্রথা চালু করেন।

আবার অনেকে বলেন, পুজোর সময় ফরাসিরা ও পরবর্তীকালে ইংরেজরা এই পুজো দেখতে আসতেন। বাড়ির মেয়েরা বিদেশিদের সামনে বের হবেন না বলে পুরুষরাই পুজোর সব দায়িত্ব নিয়ে নেন। সেই থেকেই এই প্রথা এখনও অব্যাহত। এমন প্রথা দেখা যায় চাউলপট্টির আদি মায়ের পুজোতেও।