পৌরাণিত কাহিনি অনুসারে, শ্রীবিষ্ণু ভারতের দক্ষিণে অবস্থিত রামেশ্বরম ধামে স্নান করেন, উত্তরে অবস্থিত বদ্রীনাথ ধামে ধ্য়ান করে মন শান্ত করেন, দেশের পূর্বে অবস্থিত পুরী ধামে ভোজন করেন। অন্যদিকে পশ্চিমে অবস্থিত দ্বারকায় শয়ন করেন।
এই চারধামের মধ্যে জগন্নাথদেবের ভোজন যে রাজকীয় হবে , তা বলাই বাহুল্য। তাই পুরীর ভোগের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই জানেন যে, ভগবান জগন্নাথের নিত্যসেবায় ৫৬ রকমের ভোগ রান্না করে পরিবেশন করা হয়। এই ভোগকে ছাপ্পান্ন ভোগ বলা হয়।
কথিত আছে, এই ভোগ প্রতিদিন জগন্নাথদেবের জন্য এই ভোগ রান্না করেন স্বয়ং লক্ষ্মীদেবী। রথযাত্রা ও উল্টোরথাত্রাতেও বন্ধ থাকে না ছাপ্পান্ন ভোগের আয়োজন। পুরীর প্রসাদ পেতে বহু মানুষ হাপিত্যেশ করে থাকেন।
জগন্নাথদেবের ভোগ রান্না করার পর মূল গর্ভগৃহে ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাকে পরিবেশন করা হয়। এরপর মন্দিরের বিমলাদেবীর কাছে ভোগ নিবেদন করা হয়। উভয় মন্দিরে ভোগ নিবেদন করার পরই সেই প্রসাদ মহাপ্রসাদে পরিণত হয়।
চৈতন্য চরিতামৃত অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদিত অন্নকেই ভোগ বলা হয়য আর সেই ভোগ কৃষ্ণ গ্রহণ করলে তা প্রসাদ হিসেবে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। আর সেই প্রসাদ ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হলে সেই প্রসাদ মহাপ্রসাদে পরিণত হয়।
মহাপ্রসাদ কোনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত ভোগ নয়। সেই মহাপ্রসাদ সকলের মধ্যে ভাগ করে বিতরণ করাই হল পূণ্যের কাজ। ভক্তদের মধ্যে মহাপ্রসাদ অত্যন্ত জনপ্রিয়। অনেকেই জানেন না. এই মহাপ্রসাদ শব্দটি প্রথম প্রচলন করেন শ্রীচৈতন্য।
শ্রীক্ষেত্রে ভোগ রান্নার প্রণালী বেশ চমকপ্রদ। ভীমপাক, নলপাক, সৌরিপাক ও গৌরীপাক, এই চার প্রণালীতে ভোগ রান্না করা হয়। খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, রান্না করা পর গর্ভগৃহে নিয়ে যাওয়ার সময় কোনও সুগন্ধ বের হয় না। প্রসাদ হিসেবে যখন ভক্তদের মধ্য়ে ছড়িয়ে পড়ে তখন তা সুস্বাদু ও সুবাসে ছড়িয়ে পড়ে চারিদিক।
মহাপ্রসাদ সম্পূর্ণরূপে সাত্বিক, নিরামিষ হয়। রান্নায় ব্যবহৃত সব শাকসবজি মন্দিরের নিজস্ব বাগানেই চাষবাস করা হয়। জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ দুই ধরনের। সঙ্কুরি মহাপ্রসাদ ও সুখীলা মহাপ্রসাদ।
সঙ্কুরি মহাপ্রসাদে থাকে সাদা ভাত, মিষ্টি অরহর ডাল, ঘি ভাত, জিরে হিং-আদা- নুন দিয়ে তৈরি ভাত, শাকভাজা, সবজি ডাল, যব ইত্যাদি। সুখীলা মহাপ্রসাদে থাকে শুকনো হরেকরকমের মিষ্টি। এছাড়া রয়েছে নির্মলা প্রসাদ।
এই নির্মলা মহাপ্রসাদে থাকে শুকনো চাল, যা মন্দিরের কাছে কোইলি বৈকুন্ঠে তৈরি করা হয়ে থাকে। কথিত আছে, এই অনন্য প্রসাদ যদি কোনও মৃত ব্যক্তিকে নিবেদন করা হয়, সেই ব্যক্তি মোক্ষ লাভ করেন ও পাপ থেকে মুক্তি লাভ করেন।
জগন্নাথদেবকে দিনে ৬ বার ভোগ দেওয়া হয়। উল্টোরথেও দেওয়া হয় একই নিয়ম মেনে। সকাল ৮টায় গোপাল বল্লভ ভোগ, বেলা ১০টায় সকাল ধূপ, বেলা ১১টায় ভোগ মণ্ডপ, দুপুর সাড়ে ১২টায় মধাহ্ণ ধূপ, সন্ধ্যে সাতটায় সন্ধ্যে ধূপ, রাত ১১টায় বড় সিঙ্ঘারা ভোগ নিবেদন করা হয়।