বিশ্লেষণ: তালিবানকে শক্তিশালী বানাল কারা? নেপথ্যেই বা কে?

Taliban: তালিবানের (Taliban) ফিরে আসা কিছুটা প্রহসন। বাকিটা দীর্ঘ দু'দশকের রাজনীতি এবং কূটনীতিকে আবার 'ব্যাক টু স্কোয়ার ওয়ান'। এই প্রেক্ষিতে একটু ফিরে দেখা যাক তালিবানকে এত শক্তিশালী বানানোর মূলে কারা...

বিশ্লেষণ: তালিবানকে শক্তিশালী বানাল কারা? নেপথ্যেই বা কে?
অলংকরণ: অভিজিৎ বিশ্বাস

শৌর্য ভৌমিক: “হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেল্ফ, ফার্স্ট অ্যাজ় আ ট্র্যাজেডি, দেন অ্যাজ় ফার্স।” অথবা, “দা মোর থিংস চেঞ্জ, দা মোর দে স্টে দা সেম।” দার্শনিক কার্ল মার্ক্স এবং সাহিত্যিক-সাংবাদিক Jean-Baptiste Alphonse Karr -এর কালজয়ী উক্তি যেন দগদগে সত্য হয়ে উঠেছে আফগানিস্তানে (Afghanistan)। তালিবানের (Taliban) ফিরে আসা কিছুটা প্রহসন। বাকিটা দীর্ঘ দু’দশকের রাজনীতি এবং কূটনীতিকে আবার ‘ব্যাক টু স্কোয়ার ওয়ান’। এই প্রেক্ষিতে একটু ফিরে দেখা যাক তালিবানকে এত শক্তিশালী বানানোর মূলে কারা…

ফিরে দেখা:

সালটা ১৯৯৪। আফগানিস্তানে চলছে কাবুল দখলের তীব্র লড়াই। আর পাকিস্তানের অর্থনীতিতে ডামাডোল। এরইমধ্যে তালিবানের জন্ম এবং উত্থান।তাজিক বুরহানুদ্দিন রব্বানীর কাবুলের তখতে। কিন্তু দেশের উত্তর-পূর্ব কিছু অঞ্চল এবং কাবুল শহরের চারপাশে সীমিত তাঁর ক্ষমতা। দক্ষিণে গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার। নজর তাঁর কাবুলের ওপর। যোগ্য সঙ্গী উজবেক রশিদ দোস্তম। তাঁর দখলে উত্তরে মাজার-ই-শরীফ এবং সংলগ্ন ৬টি প্রদেশ। দু’জনে দৈনন্দিন আক্রমণ হানছেন কাবুলের ওপর। পশ্চিমে হেরাট এবং আর তিন প্রদেশ রয়েছে ইরানের বন্ধু ইসমাইল খানের কব্জায়। দেশের পূর্ব প্রান্ত, পাকিস্তানের লাগোয়া পশতুন প্রধান তিন প্রদেশ চালাচ্ছে এক পরিষদ। আরবি ভাষায় সুরা। তাদের ক্ষমতার ভারকেন্দ্র জালালাবাদ।

এদিকে ইসলামাবাদে তখন বেনজির ভুট্টো দ্বিতীয়বার ক্ষমতায়। তাঁর স্বামী আসিফ আলি জারদারি ক্যাবিনেট মন্ত্রী। যদিও তিনি বেশি পরিচিত ব্যবসায়ী হিসাবে। বস্ত্রশিল্প তখন পাকিস্তানের অর্থনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। মোট কর্মী সংখ্যার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এই শিল্পে কর্মরত। প্রায় ১০ শতাংশ জিডিপি আসে বস্ত্রশিল্প থেকে। নিউ ইয়র্কস টাইমস থেকে বিরোধীদের মতে, ক্ষমতা অপব্যবহার করে জারদারি আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত। সামরিক চুক্তি, সরকারি সম্পত্তির বিক্রি, বেসরকারিকরণ, সম্প্রচার লাইসেন্স, সরকারি এয়ারলাইনের বিমান কেনা, বাদ যাচ্ছেনা কিছুই। সবেতেই কিকব্যাক বা ‘কাট মানি’। তাঁর ব্যবসার আর এক অঙ্গ বস্ত্র রফতানির কোটা বিতরণ এবং নিয়ন্ত্রণ।

কিন্তু জারদারির বস্ত্র ব্যবসায় বাধ সাধলো কীটপতঙ্গ। ১৯৯৪-তে পাকিস্তানে পেস্ট আক্রমণে প্রায় ১০ লক্ষ হেক্টর তুলো চাষের জমি নষ্ট হয়। পাকিস্তানে তুলো হলো সাদা সোনা। আর তুলো ছাড়া বস্ত্রশিল্প অসম্ভব। তাহলে উপায়?

ব্যবসার ক্ষেত্রে সংকট আবার সুযোগ। জারদারি পুরো তুর্কমেনিস্তানের উৎপাদিত তুলো কিনে নিলেন। ততদিনে শিয়া-সুন্নি বিভাজন এবং বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীর কোন্দলে ইরান পাকিস্তান সম্পর্কেও চিড় ধরেছে। জারদারি ঠিক করলে জলপথে ইরান হয়ে তুলো না এনে, আনবেন আফগানিস্তানের হেরাট, কন্দহর হয়ে পাকিস্তানের কোয়েট্টা। কিন্তু রাস্তায় ডাকাত এবং আঞ্চলিক সেনাপতিদের থেকে সুরক্ষা দেবে কে? পাক সেনা এবং আইএসআই লোক পেয়ে গেল। তার নাম মোল্লা ওমর। একদিকে ওমর। অন্যদিকে জারদারি, ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশন্স পারভেজ মুশারফ-এর মতো চরিত্র।

১৯৮৯ থেকে ১৯৯২, নাজিবুল্লাহর বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা ওমর ততদিনে মানসিক এবং শারীরিকভাবে জখম। ‘৮৯-এ জালালাবাদের যুদ্ধে ডান চোখ হারিয়েছেন, কপাল এবং গাল-ও ক্ষতবিক্ষত। ইসলামিক আইনশাস্ত্র পড়েছে পাকিস্তানে। মিলিটেন্সির পাঠ শেইখ আব্দুল্লাহ আজমের কাছে। সেই আজম, যিনি সোভিয়েতের বিরুদ্ধে জিহাদের অন্যতম আদর্শগত সংগঠক এবং কারিগর। ওসামা বিন লাদেনের গুরু।

তালিবানি উত্থানের নেপথ্য কারণ:

যেকোনও অত্যাচারী নেতার উত্থানের পেছনে থাকে দেশে চলতে থাকা সামাজিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কাহিনি। এবং এর সঙ্গে যোগ হয় ওই নেতা এবং তাঁর অনুগামীদের তৈরি করা এক মনগড়া গল্প। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই গল্পের একমুখী ধাঁচ থাকে- ভগবানের থেকে পাওয়া অন্তর্দৃষ্ট। ওমর তখন কন্দহরের এক অঁজপাড়াগায়ে মাদ্রাসার শিক্ষক। আর আফগানিস্তান জুড়ে ‘জোর যার মুলুক তার’। চারদিকে খুন, রাহাজানি, ডাকাতির রমরমা। ওমর-ও পেলেন এরকম দিব্যদৃষ্টি। যেমন পেয়েছিলেন হিটলার। ওমর পায় হজরত মুহম্মদ-এর আদেশ। দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার নির্দেশ।

ওমর পরে বলেন, আফগানিস্তান মানে তখন দুর্নীতি, খুন, হিংসা, ডাকাতি এবং নৈতিকতার সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি । প্রফেটের বাণীর ওপর আস্থা রেখে ওমর বেরিয়ে পড়লেন মোটরসাইকেল চড়ে। ছাত্র, অথবা আরবি ভাষায় তালিবদের খোঁজে। গেলেন একের পর এক মাদ্রাসা-তে । কিছুদিন পরেই প্রায় ২০০ ছাত্র ওমরের পাশে। আর ৬ মাসে সংখ্যাটা পৌঁছল ২০০ থেকে ২০,০০০-এ । ১৯৯৪ এর শেষে গিয়ে জ্যামিতিক অগ্রগতিতে সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি ।

এবং তালিবানি উত্থান:

কন্দহরের স্পিন বোলডাক জেলা। দিন ৪০ আগে এখানেই তালিবানের হাতে নিহত হন পুলিৎজার জয়ী ভারতীয় চিত্রসাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকি। স্পিন বোলডাক থেকে পাকিস্তানের চমন শহরের দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। আজ থেকে ২৭ বছর আগে, অক্টোবর ১৯৯৪-তে এই স্পিন বোলডাক জেলায় এক অস্ত্রভাণ্ডার দখল করে তালিবানরা। পাকিস্তানের যোগ্য সহায়তায়। হাতে আসে ২০,০০০ কালাশনিকভ রাইফেল (কয়েকটি সূত্রের মতে ৮০,০০০) এবং ১২০টি কামান। আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ হয় তালিবানের।

অক্টোবরের শেষেই (২৯ অক্টোবর) প্রথম তুলোর কার্গো পৌঁছয় তুর্কমেনিস্তান থেকে পাকিস্তান। ঠিক ১ সপ্তাহ পর, ৪ নভেম্বর, ১৯৯৪-তে তালিবানের দখলে কন্দহর। টাকা এবং অস্ত্রের যোগান পাকিস্তানের। আইএসআই অবশ্য একটু সন্দিহান ছিল তালিবানের প্রতি। আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের সমর্থন ছিল হেকমতিয়ারের দিকে। এবার তাঁরাও নতুন বিকল্প পেল। জারদারি, ভুট্টো সরকার এবং সেনার তরফে মুশারফ ইতিমধ্যেই সহানুভূতিশীল। এবার আইএসআই ও হাত মেলাল। তালিবানকে প্রশ্রয় দেওয়ার সেই শুরু।

১৯৯৪-এর শেষ মাসে গিয়ে আইএসআই-এর সাথে যোগাযোগ আরও নিবিড় তালিবানের। আইএসআই-এর ইসলামাবাদ হেডকোয়ার্টারে ডিরেক্টর জেনারেল জাভেদ আশরাফ কাজির সাথে সরকারিভাবে দেখা করে তালিবান। দাবি একটাই,- মুজাহিদীনদের আর কোনো সাহায্য দেওয়া যাবে না।

এদিকে কন্দহর দখলের কিছুদিনের মধ্যে হেরাট এবং জালালাবাদ দখল করে তালিবান। কাবুল দখল ১৯৯৬-তে। ১৯৯৭ পৌঁছে তালিবান ফুলেফেঁপে ৫০,০০০ সৈন্য, ৪০,০০০ প্রশিক্ষিত সৈন্য রিসার্ভ বেঞ্চে, ৩০০ ট্যাঙ্ক এবং কিছু মিগ্ যুদ্ধবিমান। তালিব যোগানের জায়গা পাকিস্তানের আটোক, করাচি, পেশোয়ার এবং বালোচিস্তানের মাদ্রাসা।

তালিব কারা?

জামাত-ই- ইসলাম তখন ভুট্টো সরকারের জোটসঙ্গী। তাদের পরিচালিত মাদ্রাসা থেকে বেরোচ্ছে একের পর এক তালিব। কারা এই তালিব? ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ অবধি চলা আফগান যুদ্ধের কারণে প্রায় ৩০ লক্ষ শরণার্থী আসে পাকিস্তানে। এরমধ্যে অনেকেই অনাথ। নেই কোনও আশ্রয়। সুফি মাজার বন্ধ করে চালু হল মাদ্রাসা। আর্থিক সাহায্য? কেন সৌদি আরব। এই মাদ্রাসাগুলোতে চলছে ওয়াহাবি অনুযায়ী দীক্ষা। লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে পাকিস্তানের আধা সেনা ফ্রন্টিয়ার কন্সট্যাবুলারি কোর। তালিবানের প্রয়োজন অনুযায়ী ক্লাস বন্ধ হচ্ছে। ছাত্ররা বাসে করে রওনা দিচ্ছে কন্দহর, জেহাদের উদ্দেশে।

তালিবানের অগ্রগতি:

১৯৯৬ সাল। ৯০ শতাংশ আফগান ভূমি ওমরের কব্জায়। তালিবানের অগ্রগতিতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন তাবড় নেতারা। ইসমাইল খান এবং হেকমতিয়ার ইরানে নির্বাসিত। দোস্তম তুরস্কে। আহমেদ শাহ মাসুদ উত্তর আফগানিস্তানের কিছু অংশে লড়ে যাচ্ছেন। ভারতের সহযোগিতা রয়েছে। আহমেদ শাহ মাসুদের হাতে ধরাও পরে পাক সেনা। যারা তালিবানের পাশে উপস্থিত আফগানিস্তান দখলের লড়াইতে। কিন্তু ১৯৯৬-তেই এমন এক ঘটনা ঘটলো যার জন্য তালিবানের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। তালিবান ক্ষমতায় আসতেই সেই দেশে আশ্রয় পেলেন ওসামা বিন লাদেন!

Click on your DTH Provider to Add TV9 Bangla