বিশ্লেষণ: সরষের ভেতরেই ভূত! ১ বছরে রান্নার তেলের দাম বাড়ল ৬৩ টাকা, কীভাবে?

লকডাউনে কেন তেলের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করল টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল।

বিশ্লেষণ: সরষের ভেতরেই ভূত! ১ বছরে রান্নার তেলের দাম বাড়ল ৬৩ টাকা, কীভাবে?
গ্রাফিক্স: অভিজিৎ বিশ্বাস

কলকাতা: বাংলায় প্রবাদ আছে কলুর বলদ। সরষের তেলের (Mustard Oil) দাম যে হারে ক্রমবর্ধমান, গ্যাঁটের কড়ি খরচ করতে গিয়ে কার্যত ‘কলুর বলদই’ হতে হচ্ছে আমজনতাকে। আকাশছোঁয়া দাম সরষে তেলের। অন্যান্য ভোজ্য তেলও একই পথে হাঁটছে। বাজারে তেল কিনতে গিয়ে ছ্যাকা খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এক দশক আগে সরষের তেলের দাম ছিল ৬০ টাকা। এখন বেড়ে প্রায় ৩ গুণ। জ্বালানির তেলের মতো সরষে তেলের দাম কোথায় গিয়ে থামবে অনিশ্চিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পেট্রল-ডিজেলের মতো সরষে তেলের দামও ওঠানামা করে বিশ্ববাজারে উপর। সেই জন্য সরষের তেলের দাম এই মুহূর্তে আকাশছোঁয়া।

বিশ্ববাজারে উপর কীভাবে নির্ভর করে সরষের তেলের দাম? লকডাউনে কেন তেলের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করল টিভি নাইন বাংলা ডিজিটাল।

আগে জেনে নেওয়া যাক কোন তেলের কত দাম?

কেন্দ্রীয় ক্রেতা সুরক্ষা মন্ত্রকের পরিসংখ্যান বলছে, গত লকডাউনে (মে ২০২০ থেকে মে ২০২১) কার্যত সব ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। সরষের তেলের দাম বেড়েছে লিটার প্রতি ৬৩ টাকা। বাদাম তেলের দাম বেড়েছে লিটার প্রতি ৩০ টাকা। বনস্পতি তেল ৪১ টাকা। সয়াবিন তেল ৫৩ টাকা। প্রতি লিটারে সূর্যমুখী তেলের দাম বেড়েছে ৬২ টাকা ও তাল জাতীয় তেলের দাম বেড়েছে ৪৭ টাকা। সবথেকে বেশি দাম বেড়েছে সরষে তেলের। গোটা উত্তর-পূর্ব-মধ্য ভারতে সরষের তেলের ব্যবহার বেশি হওয়ার দরুন, আমজনতার হেঁসেলে টান তো পড়েছেই, মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই তেলের নাছোড় দাম বৃদ্ধি।

Mustard Oil Price

গ্রাফিক্স: অভিজিৎ বিশ্বাস

কেন সরষের তেলের দাম আকাশছোঁয়া?

উৎপাদনে ঘাটতি: দেশে মূলত সরষে উৎপাদন হয় রাজস্থানে। এ ছাড়া ঝাড়খণ্ড, পঞ্জাব, হরিয়ানা, মধ্য প্রদেশ, অসমে সরষে উৎপাদন হয়। কিন্তু ২০১৯-২০ কৃষিবর্ষে রাজস্থানে মূলত শিলাবৃ্ষ্টির ফলে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। প্রায় ১.৫ শতাংশ উৎপাদন কমে গিয়ে মোট উৎপাদন হয়েছে ৯১.২ লক্ষ টন। তাই বিদেশ থেকে তেল আমদানি বেড়েছে। সেই আমদানির ওপর শুল্ক,পরিবহণ খরচ বসেছে। ফলস্বরূপ দাম বাড়ছে সরষের তেলের। সাধারণত মোট তেলের চাহিদার ৮০ শতাংশই মেটায় দেশের উৎপাদিত সরষে। বাকি ২০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লকডাউনে সরষে উৎপাদনে প্রভাব পড়ায়, বাইরে থেকে আরও বেশি তেল আমদানি করতে হয়েছে।

mustard oil pricing

গ্রাফিক্স: অভিজিৎ বিশ্বাস

অসাধু মিশেল: ক্রেতার হাতে যে সরষের তেল আসে, তা কিন্তু নির্ভেজাল সরষের তেল নয়। সরষের তেলের সঙ্গে মেশানো হয় সয়া তেল বা পাম ওয়েল। যা অধিকাংশই বাইরে থেকে আমদানি করা হয়। সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে খোদ আদানি উইলমারের ডেপুটি সিইও অংশু মল্লিক জানিয়েছেন, সরষের তেলের সঙ্গে সয়া তেল, পাম ওয়েল ও রাইসব্রেন ওয়েল মেশানো হয়। অর্থাৎ পাম ওয়েল বা সয়া তেল বিদেশ থেকে বেশি দাম দিয়ে কিনে আনলে তার প্রভাবে দেশের বাজারে সরষের তেলেরও দাম বাড়ে।

১৯৯০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সরষের তেলের সঙ্গে অন্য়ান্য ভোজ্য তেল মেশানোয় অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে কম দামি পাম ওয়েল ৮০ শতাংশ মিশিয়ে বেশি মুনাফা লুটছে তেল কারবারিরা। তাই কেন্দ্র সরষে তেলের সঙ্গে অন্যান্য ভোজ্য তেলের মিশ্রন সম্পূর্ণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মেক ইন ইন্ডিয়া: কেন্দ্র চাইছে সরষের তেলের মাধ্যমে ভোজ্য তেলে আত্মনির্ভর হতে। তাই কৃষকদের জন্য সরষেতে বেশি ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ করেছে কেন্দ্র। এই অধিক ন্যূনতম সহায়ক মূল্যও সরষের তেলের দাম বাড়ানোয় প্রভাব ফেলেছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

পরিবহণ খরচ: সরষে মূলত উৎপাদন হয় রাজস্থান, মধ্য প্রদেশ, ঝাড়খণ্ডে। সেই তালিকায় নাম নেই বাংলার। তাই বাংলায় সরষের তেল অন্যান্য রাজ্য থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে যাতায়াতের খরচ ও আন্তরাজ্য কর চাপে সরষের ওপর। ডিজেলের অত্যাধিক মূল্যবৃদ্ধিও কিছুটা ত্বরাণ্বিত করে সরষের তেলের দাম।

Mustard Oil Price

গ্রাফিক্স: অভিজিৎ বিশ্বাস

অন্যান্য ভোজ্য তেলের দাম কেন বেড়েছে?

জোগানের অভাব: দেশে ভোজ্য তেলের পর্যাপ্ত উৎপাদন নেই। তাই দেশের ভোজ্য তেলের সিংহভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রকের পরিসংখ্যান বলছে ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ সালে দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদা ২৩৪.৮ লক্ষ টন থেকে ২৫৯.২ লক্ষ টন। সেখানে দেশে উৎপাদন হয় স্রেফ ৮৪.৩ লক্ষ থেকে ১০৬.৫ লক্ষ টন। অর্থাৎ প্রায় ৫৬ শতাংশ ভোজ্য তেলই বিদেশ থেকে আমদানি হয়। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে দেশের বাজারে।

আরও পড়ুন: বিশ্লেষণ: মৃত্যুহার ৬৫ থেকে ১০০ শতাংশ, ভয়ঙ্কর নিপা ভাইরাস থেকে বাঁচার উপায় কী?

২০১৯-২০ সালে ভারতে মোট ভোজ্য তেল উৎপাদন হয়েছিল ১০৬.৫ লক্ষ টন। আর দেশের চাহিদা ২৪০ লক্ষ টনের কাছাকাছি। অর্থাৎ প্রায় ১৩৪ লক্ষ টন তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়েছে। তাই আমদানি শুল্ক ও বিশ্ব বাজারে তেলের দাম মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে লাফিয়ে বেড়েছে ভোজ্য তেলের দাম।

আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম:

বিগত কয়েক মাস ধরেই আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম চড়া। ভারতে মূলত সয়াবিন তেল আমদানি হয় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল থেকে। তালজাতীয় তেল আসে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে, সূর্যমুখী তেল আসে আর্জেন্টিনা ও ইউক্রেন থেকে। একাধিক কারণে এই দেশে রফতানির সময় তেলের দাম বাড়িয়েছে। বিশ্ব বাজারে তাই ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে আর তারই প্রভাব পড়ছে ভারতের বাজারে। গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রতি টন তাল জাতীয় তেলের দাম বেড়েছে ভারতীয় মুদ্রায় ২৮ হাজার ৬০০ টাকারও বেশি। সয়াবিন তেলের দামও বিশ্ব বাজারে আকাশছোঁয়া। গত বছরের তুলনায় এ বছর বিশ্ব বাজারে সয়াবিন তেলের দাম প্রতি টনে বেড়েছে ৯৩ হাজার টাকারও বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে এই দাম বৃদ্ধিই ভারতে তেলের দাম তরতরিয়ে বাড়াচ্ছে।

কেন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ছে?

তেলের বিকল্প ব্যবহার: এ বিষয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক মহানন্দা কাঞ্জিলাল জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে একটি নতুন প্রবণতা এসেছে, যা হল ভোজ্য তেলকে জ্বালানি রূপে ব্যবহার করার চেষ্টা। ভোজ্য তেল অত্যন্ত অত্যাবশ্যকীয় একটি পণ্য। তাই লকডাউনে এর চাহিদা কমেনি। উল্টে বেড়েছে। সেই আবহে ব্রাজিল, আমেরিকার মতো একাধিক দেশ ভোজ্য তেলকে জ্বালানি রূপে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। যা আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম আরও বাড়াচ্ছে। ফলস্বরূপ বাড়ছে দাম।

চিনের দাদাগিরি: বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তাল জাতীয় তেল আমদানি করে ভারত। তারপরেই নাম চিনের। ২০২০-২১ অর্থবর্ষে চিন তাল তেলের আমদানি বিপুল বাড়িয়ে দিয়েছিল। ২০২০-২১ অর্থবর্ষে চিন ৪৫ লক্ষ টন পাম ওয়েল আমদানি করেছে, যা সাধারণের থেকে অত্যন্ত বেশি। পশুখাদ্য ও সাবান তৈরি জন্য চিন এই তেল ব্যবহার করেছে। চিন বেশি পরিমাণে তেল আমদানি করায়, অন্যান্য দেশ বেশি দামে তেল কিনতে বাধ্য হয়েছে। ফলে বেড়েছে দাম। মার্কিন কৃষি সংস্থা বলছে ২০২১-২২ অর্থবর্ষে চিন আরও বেশি পাম ওয়েল আমদানি করতে পারে। ২০২০-২১ এ চিনের আমদানিকৃত পাম ওয়েলের পরিমাণ হতে পারে ৭২ লক্ষ টন। এমনটা হলে নিঃসন্দেহে তেলের দাম আরও বাড়বে। কিন্তু চিন দাবি করেছে তারা ২০২১-২২ অর্থবর্ষে ৪২ লক্ষ টন তেল আমদানি করবে। কারণ তারা নিজেরা তেল উৎপাদনে সক্ষম হচ্ছে।

আরও পড়ুন: বিশ্লেষণ: করোনা কাঁটায় নির্বাচন না হলে প্রশ্নের মুখে মমতার মুখ্যমন্ত্রিত্ব! কী বলছে আইন?

উপরোক্ত দুই কারণ ছাড়াও উৎপাদনে ঘাটনি বিশ্ব বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বাড়াচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া রফতানি শুল্ক বৃদ্ধি ও ব্রাজিল, আর্জেন্টিনায় শ্রমিকের খরচ বেড়ে যাওয়াও ভারতে তেলের দাম পরোক্ষ ভাবে বাড়াচ্ছে বলে দাবি অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।

কীভাবে দাম কমাতে পারে কেন্দ্র?

আন্তর্জাতিক বাজার কেন্দ্রের হাতে নেই। তাই তেলের দামে সরকারের সরাসরি কোনও হাত নেই। কিন্তু পেট্রল-ডিজেলের মতো এখানেও বড় অবদান রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের করের। কেন্দ্র পাম ওয়েলে মোট ৫৯ শতাংশ শুল্ক চাপায়। যার মধ্যে থাকে আমদানি শুল্ক, কৃষি উন্নয়ন সেস ও সামাজিক উন্নয়ন সেস। একেই ভাবে সয়াবিন তেলে শুল্ক ৩৮ শতাংশ ও সূর্যমুখী তেলে শুল্ক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ তেলের দামের একটা বড় অংশ কেন্দ্রের পকেটে যায়। কেন্দ্র যদি এই শুল্ক কমায় তাহলে দেশের বাজারে কমবে ভোজ্য তেলের দাম। এ ছাড়া আত্মনির্ভর হওয়ার জন্য সরকার এই বাজেটে একাধিক ঘোষণা করেছে তেলের ওপর। যার মাধ্যমে ১ কোটি টন সরষের তেল উৎপাদন করে আমদানি কমাতে চাইছে কেন্দ্র। সেই মতো উৎপাদন বৃদ্ধিতেও যা যা করার তা করার কথা বলছে কেন্দ্রীয় সরকার। যদি সেই পরিকল্পনা কার্যকরী হয়, তাহলে সরষের তেলের দাম কমবে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

তবে অর্থনীতির অধ্যাপক মহানন্দা কাঞ্জিলালের মতে, পেট্রল-ডিজেলের মতো এ ক্ষেত্রেও শুল্ক কমানোর পক্ষে নয় কেন্দ্র। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রের দাবি, ভোজ্য তেলের দাম কমালে টাকা ও বিদেশি মুদ্রায় লেনদেনের মধ্যে সমস্যা হবে। হঠাৎই কমে যাবে কেন্দ্রের আয়। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোজ্য তেলে বসছে অধিক শুল্ক। সব মিলিয়ে যা তেলকে আরও মহার্ঘ করে তুলছে।

আরও পড়ুন: বিশ্লেষণ: ভেনেজুয়েলায় ১ টাকায় পেট্রল, ভারতে ১০২! নেপথ্যে কার কারসাজি?

Click on your DTH Provider to Add TV9 Bangla