Deoriatal Trek: শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, দেউরিয়াতালই ভরসা! সুগভীর খাত, আটহাজারি শৃঙ্গের মাঝে অজানা গ্রামের রহস্যভেদ
Haridwar Tourism: দেওরিয়াতালের পাঁচশ মিটার আগে শেষ ক্যাম্পসাইট। আসলে তালটি নন্দাদেবী বায়োস্ফিয়ারের অন্তর্গত হওয়ার এর নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে নিশিযাপন নিষিদ্ধ করেছে উত্তরাখণ্ড সরকার।

প্রান্তিকা আড়ি, স্কুলশিক্ষিকা
(প্রথম পর্ব)
যখন ক্লান্ত, নিত্য নৈমিত্তিক জীবনে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে আমি, ঠিক তখনই প্রতিবারের মত হিমালয়ের ডাকটা বেশি রকম যেন শুনতে পাই। পাহাড়ের ডাক অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আর তার থাকুক আমাদের মত ভবঘুরেদের নেই। শুরু হল বাঙালি দম্পতির প্ল্যান প্রোগ্রাম। এবারের ছুটি কম তাই ঠিক হল এমন এক জায়গায় যাব, যেখানে কম কষ্টে ( মানে কম পায়ে হেঁটে) হিমালয়কে উপভোগ করা যাবে।
খুঁজতে খুঁজতে পেলাম এক ‘তাল’কে মানে হ্রদকে, যেটি প্রায় ৮০০০ ফুট উচ্চতায়। আর এই হ্রদটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল ” শীত, গ্রীষ্ম- বর্ষা/ দেউরিয়াতাল ভরসা” ( যেকোনও সময়ে যাওয়া যায়)।
হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে পৌঁছে গেলাম হরিদ্বার।সেখান থেকে বাসে হৃষিকেশ হয়ে তখন উখিমঠে পৌঁছলাম তখন সূর্য প্রায় পাটে বসার তোড়জোড় করছে। এমনিতেই পাহাড়ে সন্ধ্যা বেশ তাড়াতাড়িই নামে। এখানে ভারত সেবাশ্রম সংঘের আশ্রমে এক রাতের জন্য আশ্রয় নিলাম। সংঘটি খুব সুন্দর জায়গায় অবস্থিত। পেছনের দিকটি রাস্তার সঙ্গে যুক্ত আর সামনের দিকে খাতের দিকে মুখ করে অবস্থিত।মনে হবে পুরো বাড়িটা যেন ঝুলে আছে পাহাড়ের গায়ে। বাড়িটার সামনের দিকে লোহার খাঁচা দিয়ে ঘেরা বারান্দা (অবশ্যই বাঁদরের উৎপাত থেকে বাঁচতে) যেখান থেকে দৃশ্যমান নীচের সুগভীর খাত, সেখানে বহু দূর থেকে বয়ে আসা দুটি উচ্ছল খরস্রোতা পাহাড়ি নদী এসে একে অপরের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ কলকল শব্দে কত না প্রাণের কথা বলতে বলতে সাগরের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছে।
পরদিন ভোরে যাত্রা শুরু সারি গ্রাম এর উদ্দেশ্যে। প্রায় ঘণ্টা তিন পর সারি পৌঁছলাম ভাড়ার গাড়িতে। সারিগ্রাম একটি ছোট্ট উপত্যকায় অবস্থিত। এখান থেকে একটা ছোট্ট ট্রেক রুট গিয়েছে দেউরিয়াতাল। পায়ে হাঁটাই এই একমাত্র সম্বল এই পথে।
সারি গ্রামকে বাঁ হাতে ছেড়ে পাহাড়ে চড়ার শুরু হল। সেই সকালের নরম আলোয় পাহাড়ের নীচের উপত্যকায় সারি গ্রামকে ছবির মত লাগছে। গ্রামটিতে সব মিলিয়ে খান ত্রিশেক ঘর, একটা স্কুল যার ঠিক পিছনের থেকেই শুরু পাহাড়ের খাত।
যাই হোক, অনেকটা খাড়াই ভাঙতে হবে সেই মনে করেই পথ হাঁটা শুরু হল। তবে হিমালয়ের সেই মায়া দর্পন ” দেউরিয়াতাল” কে দেখতে পাব সেই আনন্দে মনের মধ্যে কোনও পিছুটান ছিল না। স্নিগ্ধ জলের দর্পনে হিমালয়ের বেশ কিছু আটহাজারি শৃঙ্গ ( নীলকণ্ঠ, ত্রিশূল, চৌখাম্বা ইত্যাদি) প্রতিদিন অঙ্গসজ্জা করে এই লেকে। সারি গ্রামকে বিদায় দিয়ে এগিয়ে চলতে লাগলাম আমরা।বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটি শিবমন্দির আর তার লাগোয়া এক বাড়ি। মন্দিরটি গারোয়ালী ধাঁচে তৈরি আর পাঁচটা মন্দিরের মতই। ভিতরে কালো পাথরের শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত । আমরা তখন কৌতুহলবশত ওখানে গিয়ে পৌঁছায় তখন মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা আর পূজারী সবে ছিলিমে টান দিয়েছেন। বাঙালি শুনে উনি অতি উৎসাহিত হয়ে ওনার ভারতীয় ফৌজৈর চাকরি জীবনে কলকাতায় একটা সময়ে কাজ করার কথা জানালেন। সে কাহিনি যেন আর শেষই হয় না। কিন্তু কলকাতার গুণগান শুনতে কার না মন্দ লাগে।
ওনার থেকে বিদায় নিয়ে এগিয়ে চললাম খাড়াই পথে। রাস্তা পায়ে চলার, ঘোড়া বা খচ্চর এই রাস্তায় চলাচল করে না। তাই দিনে কিছু আমাদের মত হাতেগোনাই ভ্রমণ করে। রাস্তা বেশ বন্ধুর কিন্তু প্রশস্ত কোথাও কোথাও। তাই দুজন পাশাপাশি যাওয়া যায়। তবে পথ থেকে চোখ সড়ালেই হোঁচট খাবার প্রবল সম্ভাবনা। যত উপরের দিকে এগোতে লাগলাম, তত সারি গ্রাম চোখের আড়ালে চলে গেল। পড়ে রইল দুধারের জঙ্গল আর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। যতদূর চোখ যায় ততদূর দেখা যায় ঢেউ খেলানো পাহাড় আর সবুজ বনানী।এরই মাঝে মাঝে কত যে নাম না জানা পাখি আর রঙ-বেরঙ এর প্রজাপতির উড়োউড়ি। দেখে যেন চোখ ও মন দুটোই খুশিতে নেচে ওঠে ওদের তালে তালে। বন্ধুর পথের দুপাশে নাম না জানা হরেক রঙের ফুলের ঝোপ তা বলার নয়। দেখে মনে হবে কোনও এক কাল্পনিক জগতে প্রবেশ করে ফেলেছি। যেমনটা স্বপ্ন দেখেছিলাম, ঠিক তেমনটাই যেন চোখের সামনে সব হাজির হয়েছে।কত ছোট ছোট ঝোড়া থেকে জল চুঁইয়ে নেমে আসছে আর তার গায়ে কত রকমের ছত্রাক, মস- সেই সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। এটাই তো হিমালয়ের বৈশিষ্ট্য, যা আমাদের ক্লান্ত শহুরে তপ্তজীবনে শান্তির বারি বর্ষন করে।
একটু করে এগোয় আর বিশ্রাম নিই। পাহাড়িদের মত কলিজার জোর সমতলীদের মধ্যে কোথায়? এই কিলোমিটার ছয়েক পাহাড়ি রাস্তায় পানীয় জলের কোথাও ঝর্না নেই। তাই আমরা দুজনের জন্য লিটার চারেক জল, কিছু শুকনো খাবার নিয়েছি। এই রাস্তার দু- তিন জায়গায় দেখলাম হোমস্টের ব্যবস্থা আছে, তবে একটা দুটো পরিবারের জন্য।যারা হিমালয়ের নিস্তব্ধতাকে ভালোবাসে, তাদের জন্যে আদর্শ জায়গা।
(ক্রমশ প্রকাশ্য)





