Sabyasachi-Aindrila: “এই মুহূর্তে, ঐন্দ্রিলা সুস্থ এবং বিপদমুক্ত”, শেষ খোলা চিঠিতে জানালেন সব্যসাচী

অস্ত্রোপচারে শরীর থেকে বাদ গেছে অর্ধেক ফুসফুস, হৃদপিণ্ডের ছাল অর্থাৎ পেরিকার্ডিয়াম এবং ডায়াফ্রামের একাংশ। জানিয়েছেন সব্যসাচী।

Sabyasachi-Aindrila: এই মুহূর্তে, ঐন্দ্রিলা সুস্থ এবং বিপদমুক্ত, শেষ খোলা চিঠিতে জানালেন সব্যসাচী
ঐন্দ্রিলা শর্মা ও সব্যসাচী চৌধুরী

প্রেমিকা ও অভিনেত্রী ঐন্দ্রিলা শর্মাকে নিয়ে এক লম্বা লড়াই চলছে অভিনেতা সব্যসাচী চৌধুরীর। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হঠাৎই খবর আসে মারণরোগ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন ঐন্দ্রিলা। ধারাবাহিকের মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করতেন ঐন্দ্রিলা। আর সকলেই জানেন, ‘মহাপীঠ তারাপীঠ’ ধারাবাহিকের সাধক বামাক্ষ্যাপার চরিত্রে কতখানি সাফল্য অর্জন করেছেন সব্যসাচী। প্রেমিকার পুনরায় ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার পর থেকেই তাঁর পাশে শক্ত হাতে দাঁড়িয়েছিলেন সব্যসাচী। একটিবারের জন্যও ছেড়ে চলে যাননি ভালবাসার মানুষটিকে। বরং মনে করেছেন ঐন্দ্রিলার সঙ্গে এই লড়াই তাঁরও। প্রেমিকার সুস্বাস্থ্যের খবর প্রতিনিয়ত দিয়ে গিয়েছেন ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। এবার জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ সুস্থতার দিকে হাঁটছেন ঐন্দ্রিলা। তিনি বিপদ মুক্ত। ঐন্দ্রিলা নাকি সব্যসাচীকে এও বলেছেন, একেবারে সুস্থ হয়ে পরের বছরই ক্যামেরার সামনে এসে দাঁড়াবেন।
পোস্টে তিনটি ছবি শেয়ার করেছেন সব্যসাচী। প্রথমটি ১৩ই ফেব্রুয়ারি ঐন্দ্রিলার শুটিংয়ে তোলা, দ্বিতীয়টি জুন মাসে অস্ত্রোপচারের পর। তৃতীয়টি গত মাসে সব্যসাচীর জন্মদিনে। সেই সঙ্গে এই পোস্ট, “ঐন্দ্রিলাকে নিয়ে এটাই আমার শেষ লেখা।
আর এটাই হলো ওর চিকিৎসার শেষ মাস।
সেই ফেব্রুয়ারী থেকে দিন গোনা শুরু হয়েছিল আর অবশেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত ডিসেম্বর মাস এলো।
আমি যখন ঐন্দ্রিলাকে নিয়ে প্রথম লিখতে শুরু করেছিলাম, আমার বাবা মা সমেত চেনাজানা অনেকেরই ভ্রু কিঞ্চিৎ কুঞ্চিত হয়েছিল। আর সেটা হওয়াটাই স্বাভাবিক, কারণ এটা আমার স্বভাববিরুদ্ধ বিষয়। ঐন্দ্রিলার সাথে আমার আলাপ চার বছর আগে কিন্তু এর মাঝে আমরা কোনোদিনও সেভাবে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছবি পোস্ট করিনি। কাপল্ ফটোশুট, টিকটক ভিডিও, বুমেরাং ইত্যাদি যা সব হয় আর কি, কখনও করিনি আমরা। আর সত্যি বলতে, আমি এগুলো করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। উনি অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়াতে যথেষ্ট সক্রিয় ছিলেন, তবে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তেমন নয়।
সিনেমার গল্প ভালোবাসো নিশ্চয়, তাহলে বাস্তবের গল্পটাও শোনো। ১৪ই ফেব্রুয়ারী নাকি ভালোবাসার দিবস, আমি বড়ই কাঠখোট্টা মানুষ, এসব বিশেষ দিনে কিছুই করি না কখনও। কিন্তু এই বছর, এই প্রথমবার তিনি বায়না করেছিলেন যে দিনটি মাসের দ্বিতীয় রবিবার, তাই দুজনেরই ছুটি, অতএব রাতে রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে হবে। ভালো কথা, টেবিল বুক করা হলো, বললো দুপুরে একটু ঘুমাচ্ছি, উঠে তৈরী হবো। ঘুমালো কিন্তু আর উঠতে পারলো না। পিঠের যন্ত্রনায় পরিত্রাহি চিৎকার করছে, এদিকে আমি বুঝতেই পারছি না যে কি হয়েছে। অগত্যা খেতে যাওয়া বাতিল করে আমি নিজেই রান্না করে খাওয়ালাম, তখনও আমরা ভাবছি যে পিঠের মাংসপেশিতে টান লেগেছে বোধহয়। পরের দিন জানা গেলো ছয় বছর আগের সেই কালসদৃশ অসুখ আবার ফিরে এসেছে এবং ফুসফুসে এক লিটার রক্ত জমেছিলো, আমরা কেউ তা বুঝিনি। এর পর থেকে, আমাদের জীবনে আর কোনও নির্দিষ্ট ভালোবাসার দিন নেই। জীবনেও তা পালন করবো না।
দিল্লিতে ওর চিকিৎসা শুরু হওয়ার পরে, আমি ভালো করে খুঁটিয়ে দেখি যে ও ক্রমশ হতাশায় তলিয়ে যাচ্ছে। সারা দিন কাঁদতো, চিকিৎসা করাতে চাইতো না, ওষুধপত্র ফেলে দিতো। আসলে মন থেকে মেনে নিতে পারছিলো না যে ছয় বছর আগের সেই বীভৎসতা আবার ফিরে এসেছে জীবনে এবং আরও বড় আকারে। সত্যি বলতে, এই একই অসুখে অনেক অভিনেতা ভুগেছেন, আবার অনেকে কাজের মধ্যে ফিরেও এসেছেন। কিন্তু আমি বুঝি যে ওর বিষয়টা আলাদা, কারণ যখন প্রথমবার ও আক্রান্ত হয়, তখন ও ছিল উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী মাত্র। সেখান থেকে নিজের স্বপ্নপূরণ করাটাই দুঃসাধ্য বিষয় ছিল তার কাছে। আমি এইটুকু জানি যে অনেক কষ্টে কোনও কিছু অর্জন করার পর সেটা হারানোর ভয় থাকে বেশি, সেই ভয়টা ছয় বছর আগে ছিল না, এখন আছে।
একটা মেয়ে অনন্ত নিশি থেকে ধূমকেতুর মতন ছুটে এসে ফের নিকষ অন্ধকারে হারিয়ে যাবে, সেটা আমিও ঠিক মেনে নিতে পারিনি। আজ আমি অকপটে স্বীকার করতেই পারি যে আমি বড়ই স্বার্থপর, তোমাদের আপডেট দেওয়ার একটাই উদ্দেশ্য ছিল আমার। আমি চেয়েছিলাম তোমাদের মনে ওকে বাঁচিয়ে রাখতে, ওকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে যে তোমায় কেউ ভোলেনি, কয়েক হাজার মানুষ স্বার্থহীন ভাবে অপেক্ষা করছে, ভালোবাসছে, প্রার্থনা করছে তোমার জন্য। তাই লজ্জার মাথা খেয়ে আমি প্রতি মাসেই কলম ধরেছি। তবে তোমরা ভাবতেও পারবে না যে তোমাদের অফুরন্ত ভালোবাসা কিভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ওর জীবনে। অনেক অচেনা মানুষ নিঃস্বার্থভাবে পুজো দিয়েছেন, প্রসাদী ফুল পাঠিয়েছেন, শুভেচ্ছাবার্তা এবং উপহার পাঠিয়েছেন। ওর কাছে অতি যত্নে সব কিছু রাখা আছে। আমি ধন্যবাদ জানিয়ে তোমাদের কাউকে ছোট করবো না।
এবার ভালো খবরটা বলি। বেশ কয়েক বছর আগে, ইংমার বার্গম্যানের একটা বহু পুরোনো সিনেমা দেখেছিলাম, যেখানে মৃত্যু এসেছে নায়কের প্রাণ নিতে আর এক ধূসর প্রান্তরে বসে, নায়ক মৃত্যুর সাথে দাবা খেলছে। খুব সামনে থেকে এই অসুখটাকে পর্যবেক্ষণ করে, বারবার ওই সিনেমাটার কথা মনে পরে যায় আমার। একটা গুটিকে রক্ষা করতে পনেরোটা গুটি ছুটোছুটি করছে। নিয়ম মেনে, মাপ মেনে নড়াচড়া করে প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। সারাটা বছর ধরে ডাক্তাররা এবং ওর পরিবার মিলে সেটাই করে এসেছে, এক মুহূর্তের জন্যও কেউ হাল ছাড়েনি। জীবন সংশয় আছে জেনেও ঝুঁকি নিয়ে অস্ত্রোপচার করা হয় মে মাসে। কিছুদিন আগে, অস্ত্রোপচারের ঠিক ছয় মাস পর পুনরায় পরীক্ষা করা হয় ওকে। ডাক্তার জানিয়েছেন যে কোনও বদ কোষ অবশিষ্ট নেই ওর শরীরে। এই মুহূর্তে, ঐন্দ্রিলা সুস্থ এবং বিপদমুক্ত।
তবে নতুন রেজিমেন অনুযায়ী, ডিসেম্বরের শেষ অবধি কেমোথেরাপি চলবে, সেটার কষ্টটা অবশ্য ওকে সহ্য করতেই হবে। সাবধানতা অবলম্বন করে প্রতি তিন মাস অন্তর স্ক্যান করা হবে এবং অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শের অধীনে থাকতে হবে। অস্ত্রোপচারে শরীর থেকে বাদ গেছে অর্ধেক ফুসফুস, হৃদপিণ্ডের ছাল অর্থাৎ পেরিকার্ডিয়াম এবং ডায়াফ্রামের একাংশ। হাই প্রোটিন খাবার আর স্টেরোয়েড এবং বাকি ওষুধপত্রের প্রভাবে ওজন বেড়েছে প্রায় এগারো কেজি, ডাক্তার বলেছেন যে সেটা অবশ্য খুবই ভালো, চিকিৎসা চলাকালীন ওজন কমলেই বরং রক্তের সমস্যা দেখা দেয়। ঐন্দ্রিলা আমায় জানিয়েছে যে ধীরে সুস্থে ওজন কমিয়ে, একেবারে সুস্থ হয়ে পরের বছর পুনরায় ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেই, ফিরবে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে। এক বছরের মধ্যে যে মানুষের জীবন কিরূপে তালগোল পাকিয়ে যেতে পারে তা নিচের তিনটি ছবি দেখলেই বুঝবে। প্রথমটি ১৩ই ফেব্রুয়ারী ওদের শুটিংয়ে তোলা, পরেরটি জুন মাসে, অস্ত্রোপচারের পর আর শেষেরটি গত মাসে আমার জন্মদিনে। কেক কাটতে আমি একদমই পছন্দ করি না, শুধু ওর জেদের জন্য কাটতে হয় ।
গত মাসে আমি ওর মাসির কথা লিখেছিলাম তাই দুই-একজন আমায় বলেছেন যে আমি নাকি নেতিবাচক প্রবন্ধ লিখি যেটা ওর মনোবল ভেঙে দিতে পারে। ধুর মশাই, এই শর্মা ভীতু হতে পারে কিন্তু ঐন্দ্রিলা শর্মা অন্য ধাতুতে গড়া, ওর মনোবল এত ঠুনকো নয়। আর বাস্তবকে নেতিবাচক বলে লাভ নেই, তা মেনে নিতে হয়। আমি বরং একটি ইতিবাচক গল্প বলে এই সুদীর্ঘ লেখাটি শেষ করি।
আমি আরো একজন নারীকে চিনি যার ওভারিয়ান ক্যান্সার ধরা পড়েছিল ২০০৭ সালে, ডাক্তাররা বলেছিলেন লাস্ট স্টেজ, অস্ত্রোপচার করে লাভ নেই, ছয় মাসের সময়সীমায় বেঁধে দিয়েছিলেন তার জীবন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাই সেই অমোঘ নিয়তিকে প্রায় স্বীকার করেই নিয়েছিল। পড়শিরা পাড়ার ক্লাবের সামনে তাকে বলেছিলো একটি গাছ লাগাতে, যাতে উনি না থাকলেও গাছটি ওনার স্মৃতি বহন করে। নিজের হাতে নিজের এপিটাফ লেখার মতনই বৃক্ষরোপণ করেছিলেন তিনি, মানসিক কষ্টটা বুঝতে পারছো? হাল ছাড়েননি কেবল তার স্বামী। কলকাতায় তখন অত ভালো পরিকাঠামো ছিল না, বিভিন্ন রাজ্যে দৌড়ে, বিভিন্ন ডাক্তারের কাছে হত্যে দিয়ে অবশেষে দিল্লিতে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয় তার। পরের বছর আবারও একই রোগ থাবা বসায় শরীরে, ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে আরো, আবারও অস্ত্রোপচার হয়, এবার বাদ যায় অর্ধেকের বেশি কোলন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলার পরে, না ফেরার দেশ থেকে সগর্বে ফিরে আসেন তিনি। ওনার নাম শিখা শর্মা, সম্পর্কে তিনি ঐন্দ্রিলার মা। আসলে রোগটা ওর জিনে আছে কিন্তু লড়াইটা আছে রক্তে।
আর অনেকেই দেখি লেখেন যে আজকাল ভালোবাসা লুপ্তপ্রায় এবং বেশিরভাগ ছেলেরাই নাকি সুবিধাবাদী। পারলে কোনও ক্যান্সার হসপিটালে একবার ঘুরে এসো, কয়েক শত পুরুষকে সেখানে অপেক্ষারত দেখতে পাবে। তাদের কেউ পিতা, কেউ স্বামী আর কেউ বা সন্তান। গেলে হয়তো ভালোবাসার নতুন সংজ্ঞা খুঁজে পেতে পারো। আসলে গল্প সবার জীবনেই থাকে কিন্তু সেটা বলার জন্য হয়তো একটা প্ল্যাটফর্ম লাগে।
আমরা চেনা মুখ তাই চর্চিত হই, এইটুকুই যা পার্থক্য।
পুনশ্চ:

প্রায় চোদ্দো বছর কেটে গেছে, ঐন্দ্রিলার মা এখনও সরকারি চাকরি করেন, সম্পূর্ণ সুস্থ এবং মেয়ের অসুস্থতায় তাকে প্রতিনিয়ত দুই হাতে আগলাচ্ছেন। আর যে গাছটিকে স্মৃতিফলক হিসেবে ওনাকে দিয়ে রোপণ করা হয়েছিল, সেটি তার পরের বছরই মারা যায়।

আরও পড়ুন: Ambarish Bhattacharya: চোখে কালো রোদ চশমা, নায়িকাদের সঙ্গে কোমর দুলিয়ে নাচ অম্বরিশের

Click on your DTH Provider to Add TV9 Bangla