Motorcycle Ride: মোটরসাইকেল ডায়েরিজ: পর্ব ৩০–বাইক স্টার্ট হবে তো? হঠাৎ এ কথা মাথায় এল কাঞ্চনজঙ্ঘার রেঞ্জ দেখতে-দেখতে
Sandakphu: সোজা ভারত-নেপাল সীমান্ত দিয়ে পৌঁছে গেলাম একটা ছোট্ট গ্রাম যৌবারিতে। এখান থেকেই ২টি রাস্তা ভাগ হয়, বাঁদিকে গেলে সিঙ্গলিলা ন্যাশনাল পার্ক হয়ে মানেভঞ্জন এবং ডান দিকের রাস্তা ধরে নয়াবাজার-যৌবারি রাস্তা দিয়ে থুমকে পিক ভিউ পয়েন্ট দিয়ে নয়াবাজার, তারপর পশুপতিনগর।

রাতে দু’বার উঠে দেখেছি কাঞ্চনজঙ্ঘার রেঞ্জ। চাঁদের আলোয় সে এক অপূর্ব দৃশ্য। তারপর আবার নিজেকে দু’টো কম্বলের মধ্যে গুটিয়ে দাঁতে-দাঁত রেখে ভোরের জন্য অপেক্ষা করা… কখন সকাল হবে। হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা এবং জানালা-দরজা দিয়ে বয়ে যাওয়া হওয়ার শোঁ-শোঁ শব্দে এক ফোঁটা ঘুম তো হলই না, শুধু হল চোখ বুজে থাকা। সকালে কিছু মানুষের চিৎকারে আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারলাম না। শেষে ইচ্ছে না-থাকা সত্ত্বেও উঠে পড়লাম ভোরের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘার রেঞ্জ দেখতে। দরজা দিয়েই বেরিয়ে দেখি, সারা রাত স্নো ফল হওয়ার ফলে চারিদিক সাদা বরফে ঢাকা। কাঞ্চনজঙ্ঘার দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসার ফলে সে দিকের গাছপালা এক ইঞ্চি পুরু বরফে ঢেকে গিয়েছে। অন্য দিকে, তাদের নিজস্ব রঙ ধরে রেখেছে… সে এক অপূর্ব দৃশ্য। পাহাড়ের ডান দিক থেকে আস্তে-আস্তে সূর্য উঠছে এবং বাঁ দিকে পুরো রেঞ্জ সোনালি আভায় ঢেকে যাচ্ছে এবং মেঘ ক্রমে নীচের পাহাড়গুলোকে ঢেকে দিচ্ছে তার সাদা রঙে। এই প্রকৃতির শোভা আগে কখনও দেখিনি, দেখিনি তার এরকম রূপ। প্রচন্ড ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত চেপে প্রথম সূর্যের আলো গায়ে নিয়ে বেশ ভালই লাগল।
অনেকটা সময় কাটানোর পর এবার ফেরার পালা। সকালের কাজকর্ম কিছুই করা হয়নি, তার কারণ বাথরুমে ঢুকে দেখি বড় জলের রিজারভারের মধ্যে জল পুরো বরফ হয়ে আছে। বরফ সরালেই নীচে জলের অবস্থান। তাই এক বালতি গরম জল নিয়ে গা হাত-পা একটু মুছে নিলাম। এরপর মাথায় এল আর একটা কথা: বাইক স্টার্ট হবে তো? বেশ কিছুটা গরম জল নিয়ে ইঞ্জিন এবং ক্লাচপ্লেটে ভাল করে ছড়িয়ে দিলাম। তারপর ইঞ্জিন অন করে দশ-বারোটা কিক দিতেই ইঞ্জিন স্টার্ট হয়ে গেল। আস্তে-আস্তে রেইজ দিয়ে গাড়ি স্বাভাবিক হতেই আরও ১৫-২০ মিনিট সময় লেগে গেল। এরপর ধীরে-ধীরে নীচে নামার পালা। রাস্তা বরফে ঢেকে থাকার দরুন গ্রিপের একটু সমস্যা হওয়ায় ক্ল্যাচ্ এবং ব্রেকের সাহায্যে ধীরে-ধীরে নামতে বাধ্য হলাম। কিছুটা নামার পর রাস্তার ঠিক বাঁপাশেই একটা ছোট্ট লেক, কালা-পখরি লেক।
তারপর সোজা ভারত-নেপাল সীমান্ত দিয়ে পৌঁছে গেলাম একটা ছোট্ট গ্রাম যৌবারিতে। এখান থেকেই ২টি রাস্তা ভাগ হয়, বাঁদিকে গেলে সিঙ্গলিলা ন্যাশনাল পার্ক হয়ে মানেভঞ্জন এবং ডান দিকের রাস্তা ধরে নয়াবাজার-যৌবারি রাস্তা দিয়ে থুমকে পিক ভিউ পয়েন্ট দিয়ে নয়াবাজার, তারপর পশুপতিনগর। এই দ্বিতীয় রাস্তাটাই নিলাম। তার কারণ পশুপতিনগরের বর্ডারে গিয়ে চেক আউট করতে হবে। এরপর পশুপতিনগরের বর্ডার ক্রস করে বাঁ দিক নিয়ে সোজা পৌঁছে গেলাম মানেভঞ্জন। এখান থেকে ২টি রাস্তা ভাগ হয়ে গিয়েছে। যে রাস্তাটি উপরের দিকে উঠছে, সেটি সান্দাকফু। এবং যে রাস্তাটি নীচের দিকে চলে গিয়েছে, সেটি গুরদুম হয়ে ধোত্রে। এই দূরত্ব আনুমানিক ৮৫ কিলোমিটারের। রাস্তা খারাপ এবং নীচের দিকে নামার ফলে গাড়ির গতিবেগ খুব কম (বরফের কারণে) থাকায় এবং পথে তিনটে ভিউ পয়েন্ট দেখার ফলে আপনার সাত ঘণ্টা সময় লেগে যাবে। মানে আপনি বিকেলের দিকে এই ধোত্রে গ্রামে পৌঁছবেন।
এই গ্রামটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই ভাল যে, কখন এই গ্রামটিতে একটি দিন কাটিয়ে ফেলবেন, তা বুঝতেও পারবেন না। এই গ্রামটির আশেপাশে বাইক নিয়ে কিংবা পাইন গাছের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা এক কথায় অসাধারণ। নাম না-জানা পাখির আওয়াজ, জঙ্গল, এই গ্রাম এবং তার খেলার মাঠ। এছাড়াও ধোত্রে কমিউনিটি হলের পাশ থেকে কিছুটা জঙ্গলে যাওয়ার পর ধত্রে ভিউ পয়েন্ট এবং এখানকার হোম-স্টের মানুষের ভালবাসা আপনাকে একদিন তো থাকতে বাধ্য করবেই করবে। এখানে অনেক হোম-স্টে থাকার কারণে আগে থেকে বুকিং করার কোনও দরকার নেই, আপনি এখানে দেখে-বুঝে, পাহাড়ের একদম শেষ প্রান্তে একটি হোম-স্টে বেছে নিন। তাতে সকালে চায়ের সঙ্গে পাহাড়ের দৃশ্য আপনার মন ভরিয়ে দেবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে প্রকৃতির রূপের পরিবর্তন আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে।
পরের দিন আরও প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যেতে চলে আসুন লোধমা নদীর পাশে, যেখানে দু’টি পাহাড় নদীতে এসে মিশেছে। এরই পাশে থাকা ফেঞ্চায়টার পার্ক হয়ে নামলা, গুম্বা-দারা, রিমবিক গ্রাম হয়ে শ্রিখলা গ্রাম। এই ৩০ কিলোমিটারের রাস্তা আপনাকে আরও প্রকৃতির মাঝে নিয়ে আসবে। এখানে রয়েছে মেমোরিয়াল হল, শ্রিখলা গুম্পা এছাড়াও নদীর পাশে টেন্টিং গ্রাউন্ড। এখানে আপনি একটা রাত কাটাতে পারেন। সময় কম থাকলে আপনি মিরিক হয়ে শিলিগুড়িতে রাত কাটান এবং পরের দিন কলকাতার দিকে রওনা দিন।





