বিশ্লেষণ: এক সারণিতে গান্ধী-কানহাইয়া! সত্যিই কি দেশদ্রোহ আইন ‘রেপ অব দ্য ল’?

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরও কি এই আইনের প্রয়োজন আছে দেশের? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা? আর এই 'দেশদ্রোহ' আইনই বা কী?

বিশ্লেষণ: এক সারণিতে গান্ধী-কানহাইয়া! সত্যিই কি দেশদ্রোহ আইন 'রেপ অব দ্য ল'?
সত্যিই কি দেশদ্রোহ আইন 'রেপ অব দ্য ল'?

হরিজন পত্রিকায় সরকার বিরোধী নিবন্ধ লিখেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে ১২৪ (এ) ধারায় দেশদ্রোহিতার (Sedition) অভিযোগ আনে সরকার। এই আইনকে মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, “রেপ অব দ্য ল।” কাউকে ভাল না লাগলেও, তাঁর সম্পূর্ণ বাকপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকা উচিত বলে মনে করেন ‘ফাদার অব দ্য নেশন’। স্বাধীনতার পর বাক স্বাধীনতার হস্তক্ষেপ করে দেশদ্রোহিতার মামলার ভূরি ভূরি নজির রয়েছে। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টকে বলতে বাধ্য হয়েছে, স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরও কি এই আইনের প্রয়োজন আছে দেশের? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা? আর এই ‘দেশদ্রোহ’ আইনই বা কী?

দেশদ্রোহ আইনের উৎপত্তি:

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারত। এখানে বাকস্বাধীনতা, অভিব্যক্তি প্রকাশের স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই ভারতে দেশদ্রোহ আইন তৈরি হয়েছিল ১৮৩৭ সালে। যার খসড়া করেছিলেন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ থমাস ম্যাকালে। ১৮৭০ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধিতে ১২৪ (এ) ধারা নিয়ে আসেন জেমস স্টিফেন। তারপর থেকে ব্রিটিশ বিরোধী কণ্ঠস্বর মৌন করতে বারবার এই আইন হাতিয়ার হয়েছে।

দেশদ্রোহের ফাঁসে

দেশদ্রোহ আইনে প্রথম গ্রেফতার হন যোগেন্দ্র চন্দ্র বোস। ১৮৯১ সালের ৭ অগস্ট বঙ্গবাসী পত্রিকার সম্পাদক যোগেন্দ্র চন্দ্রকে গ্রেফতার করে ব্রিটিশরা। এরপর ১৮৯৭, ১৯০৯ ও ১৯১৬ সাল মিটিয়ে মোট ৩ বার দেশদ্রোহের অভিযোগে জেল খেটেছেল বাল গঙ্গাধর তিলক। শ্রী অরবিন্দও এই আইনে অভিযুক্ত হয়েছেন। ১৯২২ সালে মহাত্মা গান্ধীও এই আইনে গ্রেফতার হন। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে কানহাইয়া কুমার, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, উমর খলিদ, বিনায়ক সেন, অসীম ত্রিবেদী-সহ আরও অনেকে এই আইনে অভিযুক্ত হয়েছেন।

সেডিশেনের সাজা

ধারা ১২৪ (এ) জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু হয়। সর্বনিম্ন ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন জেল হতে পারে এই মামলায়। কারোর নামে দেশদ্রোহের মামলা রুজু হলে ওই ব্যক্তি কখনও সরকারি চাকরি করতে পারবেন না। তাঁকে আজীবন পাসপোর্ট ছাড়া থাকতে হবে। আদালতের নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট সময়ে হাজিরা দিতে হবে।

দেশদ্রোহ আইনের পক্ষে সওয়াল

১. এই আইনের মাধ্যমে সরকার দেশদ্রোহ, নাশকতা রোখার কাজ করছে।
২. আইনের শাসন বজায় রাখতে ও হিংসা রুখতে এই আইন জরুরি।
৩. আদালতের যদি অবমাননায় শাস্তি হয়, তাহলে দেশেরও অবমাননায় শাস্তি হওয়া উচিত।
৪. বিভিন্ন রাজ্যে মাওবাদী ও বিদ্রোহী দল যারা অশান্তি করতে চায়, তাদের রুখতে এই আইন প্রয়োজনীয়।

(মতামত বিশেষজ্ঞদের)

দেশদ্রোহ আইনের বিপক্ষে সওয়াল

১. বাকস্বাধীনতা ও অভিব্যক্তি প্রকাশের অধিকারের বিরোধী ধারা ১২৪ (এ)।
২. প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। এখানে এই ধরনের আইন পরিপন্থী।
৩. যে ব্রিটিশরা এই আইন প্রণয়ন করেছিল, তাদের দেশে তারা তা বিলুপ্ত করে দিয়েছে। কেন এ দেশে হবে না?
৪. সেডিশন আইনের যথেচ্ছ অপব্যবহার হয়, তাই এই আইন থাকা উচিত নয়।

(মতামত বিশেষজ্ঞদের)

পরিসংখ্যানে দেশদ্রোহ

নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর এই আইনের ব্যাবহার বেড়েছে বলে দাবি বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের। গত ১ দশকে প্রায় ১১ হাজার মানুষের বিরুদ্ধে ৮১৬টি দেশদ্রোহের মামলা হয়েছে। কিন্তু দোষী সাব্যস্ত বা চার্জশিট পেশ হয়েছে একেবারে কম সংখ্যক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে। ২০১৬ সালে মোট দেশদ্রোহের মামলা হয়েছে ৩৫টি। এর মধ্যে ট্রায়ালের জন্য গিয়েছে ১৬টি। আর দোষী সাব্যস্ত হয়েছে স্রেফ ১ জন। ২০১৭ সালে মোট দেশদ্রোহের মামলা হয়েছে ৫১টি। এর মধ্যে ট্রায়ালের জন্য গিয়েছে ২৭টি। আর দোষী সাব্যস্ত হয়েছে স্রেফ ১ জন। ২০১৮ সালে দেশদ্রোহের মামলা হয়েছে ৭০টি। এর মধ্যে ট্রায়ালের জন্য গিয়েছে ৩৮টি। আর দোষী সাব্যস্ত হয়েছে স্রেফ ২ জন। ২০১৮ সালের এনসিআরবি তথ্য অনুযায়ী, তখন তদন্তের জন্য বাকি ছিল ১৯০টি মামলা।

রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া

সুপ্রিম কোর্ট বৃহস্পতিবার পর্যবেক্ষণ দেওয়ার পর প্রকাশ্যে আসে হরিয়ানায় ১০০ কৃষকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলার কথা। হরিয়ানার ডেপুটি স্পিকার তথা বিজেপি নেতা রণবীর গাঙ্গোয়ারের গাড়ি ভাঙচুর করার অভিযোগে দায়ের হয়েছে এই মামলা। ২ জন কৃষক নেতার বিরুদ্ধে রণবীরকে খুনের চেষ্টারও অভিযোগ রয়েছে। একই দিনে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও কৃষকদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের খবর রাজনৈতিক মহলে শোরগোল ফেলেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী টুইট করে সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণকে স্বাগত জানিয়েছেন। কংগ্রেস নেতা জয়বীর শেরগিল টুইটে লিখেছেন, “২০১৪ সাল থেকে প্রতি বছর ২৮ শতাংশ করে বাড়ছে দেশদ্রোহের মামলা। এর মাধ্যমে বাকস্বাধীনতাকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হচ্ছে।” তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্র টুইট করে লিখেছেন, “সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে নোটিস দিয়েছে। আশা করছি যে প্রাচীন আইন কেন্দ্র অপব্যাবহার করেছে তা এ বার ছুড়ে ফেলবে।”

জেএনইউ ছাত্রসংসদের সভানেত্রী ঐশী ঘোষ এ বিষয়ে বলেন, “এটা জেএনইউর সঙ্গে জড়িয়ে ২০১৬ সাল থেকে। কিন্তু এ নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে। আমরা বারবার এই আইনের বিলুপ্তির দাবি করেছি। কেউ যদি সরকারের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে, তাহলেই তাঁকে দেশদ্রোহী বলে দেওয়া হচ্ছে।” রাজ্য বিজেপির পক্ষ থেকে শমীক ভট্টাচার্য এ বিষয়ে বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কাছে মোটেই অস্বস্তির নয়। বিজেপি এককভাবে ভারতে ক্ষমতায় এসেছে ২০১৪ সালে। এই রাষ্ট্রদ্রোহ আইন দীর্ঘদিন ধরে আছে। তৃণমূল সমর্থিত সরকারের সময়েও এই রাষ্ট্রদ্রোহ আইন ছিল আবার কংগ্রেসের সময়েও ছিল। কংগ্রেস এই দেশে জরুরি অবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। ৪০ বারের বেশি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেছে। তাদের এই বিষয়ে বলার কোনও নৈতিক বা রাজনৈতিক অধিকার নেই। এটা বিজেপি সরকারের পাপ নয়। বিজেপি সরকারের আইন নয়। এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হবে।” আরও পড়ুন: বিশ্লেষণ: ব্যানড মাস্টারকার্ড, আপনার ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড কি অসুবিধায় পড়বে?

Click on your DTH Provider to Add TV9 Bangla